ড. মো: মুনিরুল ইসলাম
নির্মূল শব্দটি বাংলা ভাষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষণ/ক্রিয়া বিশেষণধর্মী শব্দ। যার অর্থ-সম্পূর্ণভাবে দূর করা, একেবারে উচ্ছেদ করা, মূলসহ নষ্ট করে ফেলা (root out) যেমন বলা হয়ে থাকে সমাজ থেকে দারিদ্র্য নির্মূল করা দরকার, দুর্নীতি নির্মূল না হলে উন্নয়ন সম্ভব নয় ইত্যাদি। নির্মূল শব্দটি বিশ্লেষণ করলে যা প্রতিভাত হয়-নির্মূল শব্দাট নির+মূল যোগে গঠিত। “নির” মানে বিহীন, ছাড়া, দূর; আর “মূল” মানে শিকড়, ভিত্তি। অর্থাৎ-“মূলসহ দূর করা”-এই ধারণা থেকেই “নির্মূল” শব্দের উৎপত্তি। ব্যাকরণগত দিক দিয়ে শব্দটি বিশেষণ (adjective) কখনও ক্রিয়া বিশেষণ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এর সমার্থক শব্দ হলো-উচ্ছেদ, বিনাশ, সম্পূর্ণ অপসারণ, নিশ্চিহ্ন করা। বিপরীত শব্দ-স্থাপন, প্রতিষ্ঠা, সংরক্ষণ ইত্যাদি ।
সম্প্রতি মাননীয় মন্ত্রী জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-এর পক্ষ থেকে “জামায়াতের রাজনীতি নির্মূল” সংক্রান্ত হুমকির মতো বক্তব্য মিড়িয়ায় ভাইরাল হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক মতভেদ একটি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বাস্তবতা হলেও, তা মোকাবিলার উপায় কখনোই হুমকি, সহিংসতার ইঙ্গিত বা প্রতিহিংসামূলক ভাষা হতে পারে না। এ ধরনের বক্তব্য সমাজে ভীতি সৃষ্টি করে, রাজনৈতিক সহনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং গণতান্ত্রিক সংলাপের পথকে সংকুচিত করে। একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে প্রত্যাশা থাকে সংযত ভাষা, যুক্তিনির্ভর সমালোচনা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি অঙ্গীকার। তাই এই ধরনের হুমকিমূলক রাজনীতির প্রবণতা পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই সময়ের দাবি। রাজনীতিতে কোনো দলকে নির্মূল করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা মূলত: ফ্যাসিবাদের ভাষা, এই ভাষা এমন একজন ব্যক্ত করলেন যিনি প্রবীণ ও বিচক্ষণ ধৈর্যশীল রাজনীতিবিধ এবং পরিশীলিত ভাষা ব্যবহার করে অভ্যস্ত। যার শব্দচয়ন, উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি ও ভাষাজ্ঞান তাকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। এহেন একজন বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদের এই বক্তব্য আগামীর রাজনীতির মেরুকরণে কী ধরনের ভূমিকা রাখবে তা অনুমান করা জটিল নয়।
রাজনীতিতে “নির্মূল তত্ত্ব” বলতে সাধারণত বোঝানো হয় এমন একটি চিন্তাধারা, যেখানে প্রতিপক্ষকে শুধু পরাজিত করাই নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর বা অদৃশ্য করে দেওয়ার প্রবণতা কাজ করে। এটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি কৌশল নয়; বরং ক্ষমতা, ভয়, এবং আধিপত্যের এক জটিল মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। ইতিহাসের দিকচক্রবালে দেখা যায়, নির্মূল তত্ত্ব নতুন কিছু নয়। প্রাচীন সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা-অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনরা নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে বিরোধীদের দমন, নির্বাসন, কিংবা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার পথ বেছে নিয়েছে। কালের স্বাক্ষী ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক একটি ঐতিহাসিক স্থান, যেখানে ১৮৫৭-এর স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত দেশপ্রেমিকদের বিদ্রোহ দমনের নামে ব্রিটিশরা অনেক স্বাধীনতাকামী সৈন্য ও সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করে এনে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া দেয়। গাছের ডালে ঝুলিয়ে অস্থায়ী ফাঁসির মঞ্চ বানিয়ে প্রকাশ্যে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এবং তাদের লাশ অনেক দিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে অন্যরা ভয়ে আর স্বাধীনতার স্বপ্নও না দেখে। এই কারণে বাহাদুর শাহ পার্ক শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান হিসেবে পরিচিত। এটি শুধু একটি পার্ক নয়, বরং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক নীরব সাক্ষী। ব্রিটিশরা ভয় দেখিয়ে, জাতিগত নির্মূলের অভিলাস নিয়ে শাসন করলেও তারা আদর্শকে নির্মূল করতে পারেনি। ১৮৫৭ হতে ২০২৪ সাল, দীর্ঘ রক্তদান আর জীবনদানের পর আজকের বাস্তবতায় যদি উপনিবেশবাদীর মতোই নির্মূলের হুমকি জাতিকে শুনতে হয়, তাহলে আমাদের স্বাধীনতাটা আসলে কোথায়? গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এখানে মতভেদ ও বহুমতই হওয়ার কথা শক্তির উৎস।
নির্মূল তত্ত্বের মূল সমস্যা হলো এটি রাজনীতিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে শত্রুতায় রূপান্তরিত করে। যখন প্রতিপক্ষকে “ভিন্নমতাবলম্বী” হিসেবে না দেখে “শত্রু” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন সংলাপের পথ সংকুচিত হয়। ফলস্বরূপ, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা কমে যায় এবং প্রতিশোধপরায়ণতা বেড়ে ওঠে। এ ধরনের পরিবেশে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ সিদ্ধান্তগুলো আর জনস্বার্থে নয়, বরং প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়। বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল গণতন্ত্রে এই তত্ত্বের প্রতিফলন বিভিন্নভাবে দেখা যায়। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বা আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিপক্ষকে প্রশাসনিক, আইনি কিংবা সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে। এতে স্বল্পমেয়াদে লাভ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। নির্মূল তত্ত্বের আরেকটি দিক হলো-এটি কখনো কখনো জনমনে নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের রাজনীতি তৈরি করে। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী যদি বারবার এই বার্তা দেয় যে “আমরা না থাকলে বিশৃঙ্খলা হবে”, “অমুকের রাজনীতি নির্মূল করতে হবে”, তাহলে সাধারণ মানুষ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করবে। ফলে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ, নতুন রাজনীতি, নতুনদের রাজনীতি, নতুন চিন্তার উন্মেষ ব্যাহত হবে।
এ অবস্থার উত্তরণ সম্ভব কেবল রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের মাধ্যমে। সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সংলাপের চর্চা অব্যাহত রাখা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার পরিবর্তে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরাজিত করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নির্মূল তত্ত্ব সাময়িকভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটি হাতিয়ার হলেও এটি কখনোই একটি সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে না। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক বিভাজন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ডেকে আনে। তাই রাজনীতিতে টিকে থাকতে চাইলে নির্মূল নয়, সহাবস্থানের দর্শনই হওয়া উচিত মূল পথ।
লেখক : গবেষক, শিক্ষাবিদ।