রাশেদুল হাসান আমিন
কল্পনা করুন, একটি শান্ত ভোরের সূর্যোদয় হঠাৎ করেই এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। আপনি যখন আড়মোড়া ভাঙছেন, ঠিক তখনই বিশ্বজুড়ে রেডিও-টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠছে এক হাড়হিম করা সংবাদ-ইরানের মরুভূমির নিচে থাকা শত শত বাঙ্কারে এখন প্রস্তুত রাখা আছে উত্তর কোরিয়ার বিধ্বংসী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল (আইসিবিএম)। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নাকের ডগা দিয়ে, কয়েক দশক ধরে চলা কঠোর নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পিয়ংইয়ং থেকে তেহরানে পৌঁছে গেছে ৩৫০টি ‘হুয়াসং ১৯’ মিসাইল। এটি কেবল একটি অস্ত্র বিনিময় নয়; এটি আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক ‘ইন্টেলিজেন্স ফেইলর’ও। তেহরান, পিয়ংইয়ং, মস্কো ও বেইজিং-একটি অদৃশ্য সমীকরণ যেন নতুন করে সাজিয়ে তুলেছে বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ড।
আজ বিশ্ব এমন এক খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য রাতারাতি বদলে গেছে। প্রশ্ন হলো, আমাদের চোখের সামনে দিয়ে কীভাবে ঘটল এ অসাধ্য সাধন? আমরা কি তবে কিউবান মিসাইল সংকটের চেয়েও ভয়াবহ কোনো পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছি?
ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিচ্ছে রাশিয়া ও চীন-এমন দাবি আমেরিকার পক্ষ থেকে একাধিকবার উঠলেও এ যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি ওয়াশিংটন বা তেল আবিব। তবে নতুন করে উত্তর কোরিয়ার সম্পৃক্ততার যে তথ্য মনোজগতে ভেসে বেড়াচ্ছে, তা সত্যিই পিলে চমকানোর মত। যদি এসব বিষয় সত্যি সত্যিই ঘটে; ইরানের কাছে যদি সত্যিই উত্তর কোরিয়ার শত শত উন্নত আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল থেকে থাকে? প্রবল ধ্বংস ক্ষমতাসম্পন্ন এ নতুন অস্ত্রগুলো তেল আবিব থেকে শুরু করে আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের বড় বড় শহরগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে যদি সত্যিই এসব ভয়ঙ্কর ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের কাছে পৌঁছে থাকে? তবে এটি যতক্ষণে মার্কিন-জয়নবাদীরা জানতে পারলো, ততক্ষণে মিসাইলগুলো ইরানের মাটির নিচের বাঙ্কারে জ্বালানি ভরে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে, যা মাত্র কয়েক মিনিটের নোটিশে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব! এমনটি ঘটে থাকলে তা কেবল সাধারণ কোনো অস্ত্র বিনিময় চুক্তিই নয়; এটি হবে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং অস্থিতিশীল পরিবর্তন।
ধারণা করে নেই, এ ৩৫০টি ‘হুয়াসং ১৯’ সলিড-ফুয়েল আইসিবিএমগুলো অত্যন্ত গোপনে তেহরানে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে ইরান উত্তর কোরিয়াকে নিয়মিত কম মূল্যে তেল দিচ্ছে-যে জ্বালানি পিয়ংইয়ংয়ের যুদ্ধযন্ত্র সচল রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। দশকব্যাপী নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও, এটি একটি ঠান্ডা এবং সুপরিকল্পিত বিনিময় বটে। উন্নত মিসাইলের বদলে তেলের এই লেনদেন উত্তর কোরিয়ার একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকেও টিকিয়ে রাখছে। একটু ভেবে দেখুন, বর্তমানে আমেরিকার হাতে পুরো দেশের প্রতিরক্ষার জন্য প্রায় ৪০০টি ‘মিনুটম্যান ৩’ আইসিবিএম রয়েছে। অন্য দিকে, ইরান এখন এমন এক মোবাইল আর্সেনাল (ভ্রাম্যমাণ অস্ত্রাগার) অর্জন করেছে যা সংখ্যার দিক দিয়ে প্রায় আমেরিকার সমতুল্য।
আমেরিকার মিসাইলগুলো নির্দিষ্ট সাইলোগুলোতে (মাটির নিচের ঘর) থাকে যা শত্রুপক্ষ বছরের পর বছর ধরে ম্যাপ করে রেখেছে। কিন্তু এই ‘হুয়াসং ১৯’ লঞ্চারগুলো ইরানের বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে যেকোনো জায়গায় চলাচল করতে, লুকিয়ে থাকতে এবং অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। এর ফলে মিসাইল ছোড়ার আগেই সেগুলোকে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
“আমেরিকা-ইসরাইল ও পুরো বিশ্ব এক রাতে ঘুমাতে গিয়েছিল এই বিশ্বাস নিয়ে যে তাদের সামরিক শক্তি অনেক এগিয়ে। কিন্তু পরের দিন সকালে তারা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পৃথিবীতে জেগে উঠল।”
ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সমর্থিত শ্রেষ্ঠত্বের যে দীর্ঘকালীন নিশ্চয়তা ছিল, তা সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দুটি একঘরে এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশ এই অসাধ্য সাধন করেছে। এ নিয়ে ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে আরব উপদ্বীপের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠকে বসছেন। তারা এখন আর এটি জিজ্ঞেস করছেন না যেÑ এই স্থানান্তর আদৌ হয়েছে কি না; বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য নিশ্চিত করছে যে এটি ঘটেছে।
মূলত ব্রিটিশ নাগরিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাইমন ডি গুই সম্প্রতি একটি ভিডিও বক্তব্যে এসব নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া এবং তার নির্দেশে ইরানে হামলার বিষয়ে সাইমনের সফল ভবিষ্যৎবাণী তাকে আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিতি এনে দিয়েছে।
এখন জরুরি প্রশ্ন হলো-এরপর কী হবে?
বাকি বিশ্লেষণের মূলে থাকবে তিনটি প্রশ্ন:
১. উত্তর কোরিয়া ও ইরান কীভাবে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে ৩৫০টি শক্তিশালী মিসাইল সলিড-ফুয়েল আইসিবিএম ইরানে নিয়ে আসতে সক্ষম হলো?
২. ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা আমেরিকান বাহিনীর জন্য এই নতুন উত্তর কোরীয় মিসাইলের প্রকৃত সক্ষমতা বা হুমকি কতটা?
৩. পিয়ংইয়ং থেকে আসা এ মোবাইল আইসিবিএমগুলো এখন ইরানের হাতে থাকার পর আমাদের সামনে আর কী কী বিকল্প পথ খোলা আছে?
পরমাণু যুদ্ধের এমন পরিস্থিতির দিকে আমরা এগোচ্ছি যা কিউবার মিসাইল সংকটের পর আর দেখা যায়নি। এটি এমন এক পরিবর্তন যা রাতারাতি ক্ষমতার মানচিত্র বদলে দিতে পারে। তেহরান, পিয়ংইয়ং, তেল আবিব এবং ওয়াশিংটন থেকে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কী হতে যাচ্ছে-তার একটি বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ দাঁড় করানো যাক। হয়তো আমরা খাদের অনেক কিনারে চলে এসেছি; এটি স্বীকার করতে অনেকেই দ্বিধা করছেন। উত্তর কোরিয়া কীভাবে ইরানকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক আইসিবিএম দিয়ে সশস্ত্র করল, তা খুঁজে বের করতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলোর হস্তক্ষেপের আগেই কীভাবে এই স্থানান্তর সম্পন্ন হলো?
আমাদের দুটি জিনিস একই সাথে বুঝতে হবে: পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ইরান ও উত্তর কোরিয়া এই অপারেশন গোপন রাখতে যে অসাধারণ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এটি রাতারাতি ঘটেছে, বিষয়টি এমন নয়। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার এই সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠেছে এবং ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি বাতিলের পর এটি আরও গতি পায়। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বাহিনীকে উত্তর কোরিয়া বিপুল পরিমাণ কামানের গোলা সরবরাহ করার পর পিয়ংইয়ংয়ের আত্মবিশ্বাস এবং অর্থকড়ি দুই-ই বেড়েছে। ভারী পশ্চিমা নজরদারির মধ্যেও তারা এই গোপন অস্ত্র স্থানান্তর চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলো যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, ঠিক সেই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছে এ দু’দেশ। ইরান এবং উত্তর কোরিয়া তাদের শিপিং রুট এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্ককে এতটাই নিখুঁত করেছে যে, বিশালকার এই আইসিবিএমগুলো পার্টস হিসেবে অথবা কার্গো বিমানের আড়ালে তেহরানে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার এই ‘হুয়াসং ১৯’ মিসাইলগুলো কেন এত ভয়ের কারণ?
প্রথমত, এগুলো সলিড-ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত। এর মানে হলো, এগুলো যেকোনো সময় খুব দ্রুত উৎক্ষেপণ করা যায়। তরল জ্বালানির মিসাইলে জ্বালানি ভরতে অনেক সময় লাগে, যা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সলিড-ফুয়েল মিসাইল আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে। দ্বিতীয়ত, এগুলোর পাল্লা বা রেঞ্জ। এ মিসাইলগুলো অনায়াসেই আমেরিকা বা ইউরোপের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছাতে সক্ষম। ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ বা ‘অ্যারো’ হয়তো ড্রোন বা ছোট রকেট আটকাতে পারে, কিন্তু একসাথে শত শত আইসিবিএমের আক্রমণ ঠেকানোর ক্ষমতা কোনো দেশেরই নেই। এ পরিস্থিতি এখন মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আমেরিকা এখন চাপের মুখে আছে-তারা কি ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা দেবে, নাকি সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের ঝুকি নেবে। কিন্তু সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি এখন অনেক বেশি, কারণ ইরান এখন সেই শক্তিতে বলীয়ান যা সরাসরি আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত করতে পারে। আমরা এখন এক নতুন শীতল যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেখানে উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলো একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছে।
এ ৩৫০টি মিসাইল কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি বার্তা-যে বিশ্বব্যবস্থা একসময় পশ্চিমা দেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করত, তা এখন বদলে গেছে।
লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।