জাফর আহমাদ
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ধ্বংস এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে (সামনাসামনি) লোকদের ধিক্কার দেয় এবং (পেছনে) নিন্দা করতে অভ্যস্ত।”(সুরা হুমাযা-১) এখানে পাশাপাশি মূল আরবী শব্দ লুমাযা ও হুমাযা ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থের দিক থেকে অনেক বেশি কাছাকাছি অবস্থান করছে। এমন কি কখনো শব্দ দুটি সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার কখনো দু’য়ের পার্থক্য হয়। কিন্তু সে পার্থক্যটা এমন পর্যায়ের যার ফলে একদল লোক ‘হুমাযা’র যে অর্থ করে অন্য একদল লোক ‘লুমাযা’রও সেই একই অর্থ করে আবার এর বিপরীত পক্ষে কিছু লোক ‘লুমাযা’র যে অর্থ বর্ণনা করে অন্য কিছু লোকের কাছে ‘হুমাযা’র ও অর্থ তাই এখানে যেহেতু দু’টি শব্দ এক সাথে এসেছে এবং ‘হুমাযাহ’ ও ‘লুমাযাহ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তাই উভয় মিলে এখানে যে অর্থ দাঁড়ায় তা হচ্ছে: সে কাউকে লাঞ্জিত ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে।
মহান আল্লাহ ঐ ব্যক্তির কাজ কর্মকে ধ্বংসকর বলেছেন যে ব্যক্তি কারোর প্রতি তাচ্ছিল্য ভরে অংগুলি নির্দেশ করে, চোখের ইশারায় কাউকে ব্যঙ্গ করে, কারো বংশের নিন্দা করে, কারো ব্যক্তি সত্তার বিরূপ সমালোচনা করে, কারোর পেছনে তার দোষ বলে বেড়ায়, কোথাও চোখলখুরী করে এবং এর কথা ওর কানে লাগিয়ে বন্ধুদেরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। কোথাও লোকদেও নাম বিকৃত করে খারাপ নামে অভিহিত করে। কোথাও কথার খোঁচায় কাউকে আহত করে এবং কাউকে দোষারোপ করে। এসব তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই ধরনের ব্যক্তি নিজে ধ্বংস হয় সাথে সাথে সমাজ ও তার পরিবেশকে ধ্বংস করে।
অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা বা হেয় প্রতিপন্ন করা একটি মারাত্মক সামাজিক ও নৈতিক ব্যধি, যা ব্যক্তিকে আখিরাতে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় এবং দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত করে। ইসলামে অহংকারবশত মানুষকে ছোট করে দেখাকে ‘কবীরা গোনাহ’ বা বড় পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। আল্লহ তা’আলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, কোন পুরুষ যেন অন্য পুরুষকে বিদ্রুপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। আর কোন মহিলা যেন অন্য কোন মহিলাকে বিদ্রুপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না। এবং পরস্পরকে খারাপ নামে ডেকো না। ঈমান গ্রহণের পর মন্দ নাম অতিমন্দ। যারা তওবা না করে তারাই জালেম।” (সুরা হুজরাত : ১১)
তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যকারী সম্পর্কে এর চেয়ে মারাত্মক আয়াত আল কুরআনে অন্য কোথাও দেখা যায় না। একটি আয়াতে এদেরকে একই সাথে জঘন্য, জালেম ও ঈমানের পরিপন্থী কাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে। অথচ এই কাজটি আমাদের মুসলিম সমাজে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলের দ্বারাই হয়ে থাকে। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং কাউকে খারাপ নামে ডাকা আজ মামুলী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল কুরআন যাকে জঘন্য ও জুলুমের কাজ বলছে আর মুসলিম সমাজ সেটিকে মামুলী বিষয় মনে করছে। ইসলামী সমাজে এটি এতটাই জঘন্য যে, একটি সমাজ ভাঙনের জন্য একটি অভ্যাসই যতেষ্ট। একে অপরের ইজ্জতের ওপর হামলা করা, একে অপরের মনে কষ্ট দেয়া, একে অপরের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা এবং একে অপরের দোষ-ত্রুটি তালাশ করা পারস্পরিক শত্রুতা সৃষ্টির এগুলোই মূল কারণ। এসব কারণ অন্যান্য কারণের সাথে মিশে বড় বড় ফেতনার সৃষ্টি করে।
ইসলামী আইনে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তার বিরুদ্ধে ইসলামী কোর্টে মানহানি মামলা হতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি মানুষের মৌলিক মানবীয় অধিকারের একটি। অর্থাৎ নিজের ইজ্জত আব্রু নিয়ে স্বাধীনভাবে সম্মানের সাথে বসবাস করা। এ ক্ষেত্রে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ একটি আইন রয়েছে এবং এসব আইনে যথাযথ শাস্তির বিধানও রয়েছে। যদিও সাধারণ আইন এ ক্ষেত্রে অনেকটা অসম্পূর্ণ। এই আইনে এতটাই অসম্পুর্ণ যে, এ আইনের অধীনে কেউ মানহানির অভিযোগ পেশ করে নিজের মর্যাদা আরো কিছু খুইয়ে আসে। পক্ষান্তরে ইসলামী আইন প্রত্যেক ব্যক্তির এমন একটি মৌলিক মর্যাদার স্বীকৃতি দেয় যার ওপর কোন আক্রমণ চালানোর অধিকার কারো নেই। এ ক্ষেত্রে হামলা বাস্তবতা ভিত্তিক হোক বা না হোক এবং যার ওপর আক্রমণ করা হয়, জনসমক্ষে তার কোন সুপরিচিত মর্যাদা থাক বা না থাক তাতে কিছু যায় আসে না। এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে অপমান করেছে শুধু এতটুকু বিষয়ই তাকে অপরাধী প্রমাণ করার জন্য যতেষ্ট।
বিদ্রুপ করার অর্থ কেবল কথার দ্বারা হাসি-তামাসা করাই নয়। বরং কারো কোন কাজের অভিনয় করা, তার প্রতি ইংগিত করা, তার কথা, কাজ, চেহেরা বা পোশাক নিয়ে হাসাহাসি করা অথবা তার কোন ত্রুটি বা দোষের দিকে এমনভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাতে অন্যদের হাসি পায়। এ সবই হাসি-তামাসার অন্তর্ভুক্ত। মূল নিষিদ্ধ বিষয় হলো কেউ যেন কোনভাবেই কাউকে উপহাস ও হাসি-তামাসার লক্ষ্য না বানায়। কারণ, এ ধরনের হাসি-তামাসা ও ঠাট্রাা-বিদ্রুপের পেছনে নিশ্চিতভাবে নিজের বড়ত্ব প্রদর্শন এবং অপরকে অপমানিত করা ও হেয় করে দেখানোর মনোবৃত্তি কার্যকর। যা নৈতিকভাবে অত্যন্ত দোষণীয়। তাছাড়া এভাবে অন্যের মনোকষ্ট হয় তাতে সমাজে বিপর্যয় ও বিশৃংখলা দেখা দেয়। এ করণেই এ কাজকে হারাম করে দেয়া হয়েছে।
এখানেও সুরা হুমাযার মতো ‘লুমাযা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। শব্দটির মধ্যে বিদ্রোপ ও কুৎসা ছাড়াও আরো কিছু সংখ্যক অর্থ এর মধ্যে শামিল। যেমন: উপহাস করা, অপবাদ আরোপ করা, দোষ বের করা এবং খোলাখুলি বা গোপনে অথবা ইশারা-ইংগিত করে কাউকে তিরস্কারের লক্ষ্যস্থল বানানো। এসব কাজও যেহেতু পারস্পরিক সুসম্পর্ক নষ্ট করে এবং সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করে তাই এসব কাজও হারাম করে দেয়া হয়েছে। এখােেন আল্লাহর ভাষায় চমৎকারিত্ব এই যে, “একে অপরকে বিদ্রুপ করো না” এই কথা না বলে “নিজেকে নিজে বিদ্রুপ করো না”। কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর দ্বারা স্বতই এ কথা ইংগিত পাওয়া যায় যে, অন্যদেও বিদ্রুপ ও উপহাসকারী প্রকৃতপক্ষে নিজেকেই বিদ্রুপ ও উপহাস করে।
এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, যতক্ষণ না কারো মনে কুপ্রেরণার লাভা জমে উপচেপড়ার জন্য প্রস্তুত না হবে ততক্ষণ তার মুখ অন্যদের কুৎসা রটনার জন্য খুলবে না। এভাবে এ মানসিকতার লালনকারী অন্যদের আগে নিজেকেই তো কুকর্মের আস্তানা বানিয়ে ফেলে। তারপর যখন সে অন্যদেরকে ওপর আঘাত করে তখন তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, সে তার নিজের ওপর আঘাত করার জন্য অন্যদেরকে আহ্বান করছে। ভদ্রতার কারণে কেউ যদি তার আক্রমণ এড়িয়ে চলে তাহলে তা ভিন্ন কথা। কিন্তু যাকে সে তার বাক্যবাণের লক্ষস্থল বানিয়েছে সে-ও পাল্টা তার ওপর আক্রমণ করুক এ দরজা সে নিজেই খুলে দিয়েছে। প্রতিপক্ষ ব্যক্তি যদি তার মতই আচরণ করে এবং উভয়পক্ষ পেশীশক্তির অধিকারী হয় তাহলে বিশাল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সম্ভবনা প্রবল হয়ে উঠে। বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের রক্তক্ষয়ী প্রচুর ঘটনা দেখা যায়। প্রথমে ব্যক্তি ব্যক্তিতে, পরিবার পরিবারে, প্রতিবেশী প্রতিবেশীতে, গ্রাম গ্রামে এভাবে থানা থানায় ও জেলা জেলায় ও দেশ দেশে এই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সমাজ এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে নিমজ্জিত হয়।
সুরা হুজরাতের ১১ নং আয়াতের নির্দেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে, কোন ব্যক্তিকে এমন নামে ডাকো না হয় অথবা এমন উপাধি না দেয়া হয় যা তার অপছন্দ এবং যা দ্বারা তার অবমাননা ও অমর্যাদা হয়। যেমন কাউকে ফাসেক বা মুনাফিক বলা। কাউকে খোঁড়া, অন্ধ অথবা কানা বলা। কাউকে তার নিজের কিংবা মা বাবার অথবা বংশের কোন দোষ বা ত্রুটির সাথে সম্পর্কিত করে উপাধি দেয়া কোন ব্যক্তি, বংশ, আত্মীয়তা অথবা গোষ্ঠীর এমন নাম দেয়া যার মধ্যে তার নিন্দা ও অপমানের দিকটি বিদ্যমান।
ভালো করে মনে রাখতে হবে, ঈমানদার হওয়ার পরও কটুভাষী বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যকারী অসৎ ও অন্যায় কাজের জন্য বিখ্যাত হবে এটা একজন ঈমাদারের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ব্যাপার। কারণ ঈমানদার যেই কালিমার মাধ্যমে ঈমান নামক সবুজ অরণ্যে প্রবেশ করেছেন, তা একটি পূত-পবিত্র কথা। সুতরাং একজন মূ’মিন কখনো অশ্লীলভাষী, অহংকারী, কাউকে হেয় প্রতিপন্নকারী ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যকারী হতে পারেন না। বরং সেই কালিমার দাবি হলো, তিনি কালিমা তাইয়্যেবার ভিত্তিত্বে নিজের জীবন ব্যবস্থাকে গড়ে তুলবেন, তার চিন্তাধারায় পরিচ্ছন্নতা, স্বভাবে প্রশান্তি, মেজাজে ভারসাম্য, চরিত্রে পবিত্রতা, আচরণে মাধুর্যতা, ব্যবহারে নম্রতা, লেনদেনে সততা, কথাবার্তায় সত্যবাদিতা, ওয়াদা ও অংগীকারে দৃঢ়তা, সামাজিক জীবন যাপনে সদাচার, কথা-বার্তায় চিন্তার ছাপ, চেহেরায় পবিত্রতার ভাব ফুটে উঠবে। কোন কাফের যদি মানুষকে ঠাট্রা-বিদ্রুপ ও উপহাস করে কিংবা বেছেবেছে বিদ্রুপাত্মক নাম দেয়ার ব্যাপারে খ্যাতি লাভ করে তাহলে তা মনুষত্বের বিচারে যদিও সুখ্যাতি নয় তবুও অন্তত তার কুফুরীর বিচারে তা মানায়। কিন্তু কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসুল সা: এবং আখেরাত বিশ্বাস করা সত্ত্বেও যদি এরূপ হীন বিশেষণে ভূষিত হয় তার জন্য পানিতে ডুবে মরার শামিল।
তাই কোন মুমিন এমন কথা বলা উচিত নয়, যা একটি মারাত্মক বোমার চেয়েও ক্ষতিকর। একটি বোমা নির্দিষ্ট কিছু লোকের জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি করে থাকে। কিন্তু একটি খারাপ কথা সমাজ ভাঙনের কার্যকরী হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে থাকে। সমাজকে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখী করে। সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধের স্থান দখল করে নেয় হিংসা-হানাহানি, বিদ্বেষ আর অহংবোধ। আর এর ফলে মানুষ চরম দুঃখ-দুর্দশার সম্মুখীন হয়। অথচ একজন মুমিন কখনো অন্য একজন মু’মিনকে কষ্ট দিতে পারে না। সে কথাটি যদি আবার সঠিক না হয়, কিংবা সেটি লক্ষ লক্ষ মানুষের মনোকষ্টের কারণ হয়, তাহলে ব্যাপারটি আরো মারাত্মক। কারণ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন: “মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমাদের প্রতি মেহেরবাণী করা হবে।” (সুরা হুজরাত : ১০) “মানুষ খারাপ কথা বলে বেড়াক, তা আল্লাহ তা’আলা পছন্দ করেন না। তবে কারো জুলুম করা হলে তার কথা স্বতন্ত্র। আর আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন।” (সুরা নিসা : ১৪৮)
লেখক : ব্যাংকার এবং প্রাবন্ধিক।