মো. হাবিবুল্লাহ বাহার

রাজনীতি শব্দের আদি ও অকৃত্রিম অর্থ হলো রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন এবং জনমানুষের অধিকার আদায়ের এক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা। কিন্তু বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এই পবিত্র শব্দটি যেন তার মৌলিক চরিত্র হারিয়ে এক ভীতিকর ও লাভজনক ‘পেশা’য় পরিণত হয়েছে। এ দেশে রাজনীতি ও অপরাজনীতির মধ্যকার পার্থক্যটি এখন এতটাই অস্পষ্ট যে, সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতি মানেই হলো ক্ষমতা দখল, পেশিশক্তির নগ্ন মহড়া এবং ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের এক নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা।

সময়ের পরিক্রমায় ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক এক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ক্ষমতার অভাবনীয় পালাবদল ঘটেছে। পরিবর্তনের এই নতুন হাওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে পাহাড়সম প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। মানুষ চেয়েছিল এক দমবন্ধ করা ভয়ের সংস্কৃতির চিরস্থায়ী অবসান। এটি নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির বিষয় যে, বিগত শাসনামলের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায় ‘গুম’ বা ‘আয়নাঘর’-এর মতো অমানবিক প্রথার অবসান ঘটেছে। ভিন্নমতের কারণে রাতের অন্ধকারে কাউকে চিরতরে গায়েব করে দেওয়ার যে নির্দয় চর্চা এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, রাষ্ট্রযন্ত্র দৃশ্যত সেই কলঙ্কজনক পথ থেকে সরে এসেছে।

তবে গুম-খুনের মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অধ্যায় শেষ হলেও, একটি গভীর শঙ্কা জনমনে এখনো রয়ে গেছে যে অপরাজনীতির কি সত্যিই শেকড়সহ অবসান হয়েছে, নাকি তা কেবল খোলস পাল্টে নতুন রূপে আমাদের সমাজে টিকে আছে?

প্রথমত, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের প্রশ্নে আমরা এক রূপান্তরকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বিগত দিনের অপরাধের বিচার ও গ্রেফতার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও সর্বজনীন রাখা। অতীত শাসনামলের মতো আইনি ব্যবস্থাকে যদি প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সামান্যতম সুযোগও তৈরি হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আস্থার সংকট জন্ম দেবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, বিচার হতে হবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে; কোনোভাবেই প্রতিহিংসা বা হয়রানির বশবর্তী হয়ে নয়। প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে অপরাজনীতির ভূত কখনোই আমাদের সমাজ থেকে বিদায় নেবে না।

দ্বিতীয়ত, রাজনীতিকে পুঁজি করে সম্পদের পাহাড় গড়ার এবং আধিপত্য বিস্তারের যে মজ্জাগত সংস্কৃতি, তাতে দৃশ্যত কেবল মুখেরই পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্রের কোনো বদল হয়নি। ক্ষমতার পালাবদলের পরপরই আমরা দেখেছি কীভাবে দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির কেবল ‘হাতবদল’ হয়েছে। আগের সুবিধাভোগীরা যখন সরে গেছে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই নতুন বা পুরনো অন্য কোনো গোষ্ঠী ফুটপাত, পরিবহন সেক্টর, হাটবাজার এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করছে। টেন্ডারবাজি এবং সংখ্যালঘুদের বা অসহায় মানুষের জমি দখলের মতো নগ্ন অপরাজনীতি এখনো পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ মানুষের কাছে চাঁদাবাজ বা দখলদারের কোনো দলীয় পরিচয় নেই; তাদের কাছে নিপীড়ক সব সময়ই নিপীড়ক।

শিক্ষাঙ্গনের চিত্রও পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির বিষবাষ্প এবং হল দখলের মানসিকতা এখনো সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তার পথে বড় বাধা। আধিপত্য বিস্তারের পুরনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাঙ্গনে মেধাভিত্তিক ও সুস্থ সহাবস্থানের রাজনীতি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যে ছাত্র রাজনীতি দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথপ্রদর্শক, তাকে অবশ্যই দখলদারিত্বের কলুষতা থেকে মুক্ত হতে হবে।

এর পাশাপাশি বর্তমান সমাজ ও রাজনীতিতে আরেকটি বড় শঙ্কার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মব জাস্টিস’ বা সংঘবদ্ধ জনতার বিচারহীনতার উন্মাদনা এবং চরম অসহনশীলতা। ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের সময়ে মতপ্রকাশের ওপর যে ভয়াবহ খড়গ নেমে এসেছিল, তা থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে ঠিকই; কিন্তু আমরা এখন দেখছি ভিন্নমত বা অসংগতির গঠনমূলক সমালোচনা করলেই অনেক ক্ষেত্রে সমালোচকদের ওপর এক ধরনের আক্রমণ বা ট্যাগিংয়ের সংস্কৃতি শুরু হচ্ছে। রাস্তায় নেমে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য চরম অশনিসংকেত।

পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের দীর্ঘদিনের বিকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতি রাতারাতি বদলায় না। গুমের মতো ভয়াবহ অন্ধকার থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি, কিন্তু অপরাজনীতির যে বিশাল বৃক্ষ ডালপালা মেলে আছে, তার বিষাক্ত শেকড় উপড়ে ফেলা এখনো বাকি। এক দলের চাঁদাবাজির বদলে অন্য দলের চাঁদাবাজির এই দুষ্টচক্র কোনোভাবেই ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত বিপ্লবের কাক্সিক্ষত সংস্কার হতে পারে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতার আমূল পরিবর্তন। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে, আইন কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয় এবং রাজনৈতিক পরিচয় কোনো অপরাধ বা দুর্নীতির ঢাল হতে পারে না। সত্যিকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমেই কেবল এই খোলস বদলের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গঠন সম্ভব।

লেখক : নির্বাহী সদস্য, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদ, রাকসু।