জাফর আহমাদ

“আল্লাহই তো সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রাসুলকে হিদায়াত ও সত্য দীন বা জীবন ব্যবস্থা দিয়ে পাঠিয়েছেন যেন তাকে সমস্ত দীনের ওপর বিজয়ী করে দেন। আর এ বাস্তবতা সম্পর্কে আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট।” (সুরা আল ফাতাহ: ২৮)

দীন মানে জীবন ব্যবস্থা। দীনি হক্ব বা দীনে ইসলাম মানে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা। আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক প্রদর্শিত জীবন ব্যবস্থার নাম ইসলামী জীবন ব্যবস্থা। আর আল্লাহর কাছে এটিই একমাত্র গ্রহণযোগ্য জীবন ব্যবস্থা। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “ইসলাম আল্লাহর নিকট একমাত্র জীবন ব্যবস্থা।” (সুরা আলে ইমরান: ১৯) অর্থাৎ আল্লাহর কাছে মানুষের জন্য একটি মাত্র জীবন ও একটি মাত্র জীবন বিধান সঠিক ও নির্ভুল বলে গৃহীত। সেটি হচ্ছে, মানুষ আল্লাহকে নিজের মালিক ও মাবুদ বলে স্বীকার করে নিবে এবং তাঁর ইবাদাত, বন্দেগী ও দাসতে¦র মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সোপর্দ করে দেবে। আর তাঁর বন্দেগী করার পদ্ধতি নিজে আবিস্কার করবে না। বরং রাসুলুল্লাহ সা.-কে যে হিদায়াত ও বিধান সহকারে পাঠিয়েছেন সেই হিদায়াত ও বিধান যে পদ্ধতিতে প্রদর্শন করে গেছেন তাতে কোন প্রকার কমবেশ না করে তার অনুসরণ করবে। এই চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির নাম ইসলাম আর বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টার ও প্রভুর নিজের সৃষ্টিকূল ও প্রজা সাধারণের জন্য ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কর্মপদ্ধতির বৈধতার স্বীকৃতি না দেয়াও পুরোপুরি ন্যায়সংগত।

এই জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যই মুহাম্মদ সা. কে রাসুল হিসাবে দুনিয়াতে প্রেরণ করা হয়েছে। উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ তা’আলা এ কথাটিই পরিস্কার ভাষায় বলেছেন। শুধু দীনের প্রচার করার জন্য মুহাম্মদ সা. কে পাঠানো উদ্দেশ্য ছিল না বরং উদ্দেশ্য ছিল মানব রচিত বা মানুষের মস্তিস্ক প্রসূত জীবন ব্যবস্থার ওপর আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করা বা বিজয়ী করা। অন্য কথায় জীবনের সমস্ত দিক ও বিভাগের ওপর কোন বাতিল জীবনাদর্শ বিজয়ী হয়ে থাকবে আর ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বাতিল জীবনাদর্শের আধিপত্যাধীনে বেঁচে থাকবে এবং বাতিল জীবন ব্যবস্থা যতটুকু অধিকার দেবে এ দীন সেই চৌহদ্দির মধ্যেই হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবে অথবা দীনের কিছু কিছু অংশ বাতিল জীবন ব্যবস্থার সাথে সমঝোতা করে জীবন পরিচালনা করবে এ উদ্দেশ্যে নবী সা. এ দীন দিয়ে পাঠানো হয়নি। বরং তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছে যে, এখানে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বিজয়ী জীবনাদর্শ হিসাবে থাকবে। অন্য কোন জীবনাদর্শ বেঁচে থাকলেও এ জীবনাদর্শ যে সীমার মধ্য তাকে বেঁচে থাকার অনুমতি দেবে সে সীমার মধ্যেই তা বেঁচে থাকবে।

আল্লাহর পক্ষ থেকে যে হেদায়াত তথা আল কুরআন ও সত্য দীন তিনি পেয়েছেন তা মানুয়ের গোটা জীবন ব্যবস্থার প্রত্যেকটি বিভাগের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেখানে কেবলমাত্র আল্লাহর আনুগত্য ও বিধান বিজয়ী ছিল। সেখানে আল্লাহর আনুগত্য ও বিধানের বিপরীত সকল প্রকার চিন্তা, চেতনা নাম মাত্রও ছিল না। আর এটিই তাঁর কাজ এবং এ কাজ তাঁকে অবশ্যই করতে হয়েছে। কাফের ও মুশরিকরা মেনে লয় তবুও, না মেনে নেয় তবুও এবং বিরোধীতা ও প্রতিরোধের মুখে সমগ্র শক্তির মোকাবেলা করে রাসুল সা. এ ‘মিশন’ অবশ্যই পূর্ণ করতে হয়েছে। পাহাড় সম বাধা আর বিরোধীতা নিয়ে তাবত তাগুতি শক্তির সাথে লড়ে গেছেন। এ জন্য তাঁকে অসংখ্য নির্যাতন, দুঃখ-কষ্ট, কঠিন ষড়যন্ত্রসহ অত্যাধিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানের লোভনীয় অফারের সম্মুখীনও হতে হয়েছে। কিন্তু কোন কিছুই তার মিশনকে সম্মুখে এগিয়ে নেয়ার পথ রোধ করতে পারিনি।

তিনি জীবনের সকল দিক ও বিভাগে আমূল পরিবর্তন করে সমগ্র সমাজ সভ্যতাকে আল্লাহর রং এ রঞ্জিত করে গেছেন। তিনি নিছক এমন কোন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না যে, শুধুমাত্র মসজিদে বসে মানুষদেরকে ধর্মীয় বাণী শুনাতেন অথবা অধিকাংশ সময় ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। অথবা তিনি এমনটিও ছিলেন না যে, শুধু ইমামতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন বা উপরন্ত ধর্মীয় দিকটি দেখা শুনা করতেন। আর সন্তুষ্টি চিত্তে বাইরের পৃথিবীর নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন অসৎ, আল্লাহ বিমুখ তাগুতী শক্তির হাতে। কুরআন হাদীস স্বাক্ষী তিনি এমনটি করার জন্য প্রেরিত হননি। বরং পৃথিবীর অসংখ্য খোদার নাগপাশ থেকে সমাজ ও সভ্যতাকে মুক্ত করে এক আল্লাহর গোলামে পরিণত করার সকল কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমরা দৈনন্দিন কুরআনের সাথে যে ধরনের আচরণ করে যাচ্ছি, আল্লাহর রাসুল সা. এর জীবন চরিতের সাথেও ঠিক সে আচরণই করে যাচ্ছি। প্রত্যেকেই আমরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী কুরআনকে যেমন শতধা ভাগ করেছি। আল্লাহর রাসুল সা. চরিত্রকেও আমরা আমাদের সুবিধা মত ভাগ করে বিশেষ অংশের উপর আমল করে যাচ্ছি। প্রকৃতপক্ষেই আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আল কুরআন ও রাসুল সা. এর চরিত্রের সহজ ও সরল কাজগুলো ঘটা করে পালন করে যাচ্ছি, কিন্তু জীবনের অধিকাংশ সমস্যার সমাধানের জন্য দ্বারস্থ হচ্ছি মানব রচিত মতবাদের কাছে। ফলে পার্থিব জীবনে আমরা বিশ্বময় অপমানিত ও লাঞ্ছিত হচ্ছি। কুরআনের সাথে কি ধরনের আচরণ করা হচ্ছে সে সম্পর্কে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা জিজ্ঞাস করবেন, যারা কুরআনকে টুকরো টুকরো করেছে। সুতরাং তোমার মালিকের শপথ, ওদের সবার কাছে আমি অবশ্যই প্রশ্ন করবো, সে সব বিষয়ে, যা কিছু আচরণ তারা (কুরআনের সাথে) করতো। (সুরা হিজর-৯১-৯৩)

অথচ কুরআন ছিল রাসুল সা. এর এ পথের সার্বক্ষণিক গাইড ও শক্তিশালী মিত্র। দৈনন্দিন এ কুরআনই কঠিণ সংগ্রামে তাঁকে শক্তি যোগাত। সে কুরআন তেলাওয়াত, অধ্যয়নে আমরা আমাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যেমন এর সাথে জড়িত হই না। তেমনি রাসুল সা. এর পুরো জীবন থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করি না। কুরআন থেকে পুরোপুরি ও সত্যিকার হেদায়াত লাভ সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত এর অর্থ অনুধাবন করা না যায়। তেমনি আল্লাহর রাসুল সা. জীবন থেকে সত্যিকার হেদায়াত লাভ যেমন সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তার সমগ্র জিন্দিগীকে একটি জীবন একটি আদর্শ হিসাবে গ্রহণ না করা যায়। কুরআন যেমন শুধু মাত্র সওয়াবের উদ্দেশ্যে তেলাওয়াত করা এবং পবিত্র গ্রন্থ, আধ্যাতিকতার প্রতীক, পবিত্র মুজেজা ইত্যাদি বলে চিত্তকে শান্ত করার জন্য অবতীর্ণ হয়নি। তেমনি রাসুল সা. চরিত্রের বিশেষ কোন দিক বা অধ্যায় আলোচনা করে আবেগ প্রকাশ করলেই তাঁর সঠিক মূল্যায়ন বা দায়িত্ব পালন করা হবে না।

আল্লাহর রাসুল সা. এর চরিত্র ছিল আল কুরআন। তাই আল-কুরআন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাসুল চরিতকে বুঝা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি আল-কুরআনের শিক্ষাকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে রাসুল সা. এর ২৩ বৎসরের জীবনের আলোকেই বুঝতে হবে। কারণ বিশ্বনেতা হযরত মুহাম্মাদ সা. যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ঐ আন্দোলনের চাহিদা অনুযায়ী যখন যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই অবতীর্ণ করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন “যারা কুরআনকে অস্বীকার করে তারা বলে আচ্ছা পুরো কুরআনটা তার উপর একেবারেই নাযিল হল না কেন? আসলে কুরআন তো এভাবেই নাযিল হওয়া উচিৎ ছিলো যাতে করে এই ওহি দ্বারা আমি তোমার অন্তরকে মযবুত করে দিতে পারি, এ কারণেই আমি একে থেমে থেমে নাযিল করেছি।” (সুরা-ফোরকান-৩২)

হযরত মুহাম্মদ সা. সর্বশেষ বিশ্বমানবতার একমাত্র মুক্তির দূত। এ মহামানবের আদর্শ ছাড়া মানুষের মুক্তির চিন্তা করা একটি বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই নহে। বর্তমান এ বিপর্যস্ত পৃথিবীটাই প্রধান সাক্ষী। সারা পৃথিবীজুড়ে মানব রচিত বা মানুষের মস্তিষ্ক তৈরি আইন ও কানুন দিয়ে শান্তি আনয়নের চেষ্টা সাধনা করা হচ্ছে। কিন্তু শান্তি তো দূরের কথা, বরং মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আমরা কুরআনের হুকুম অনুযায়ী নামায, রোযা, হজ্জ পালণ করছি কিন্তু আল কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছি না। এমনিভাবে আমরা কেউ কেউ রাসুল সা. এর মক্কী জীবনের উপর আমল করে যাচ্ছি, মনে হবে যেন রাসুলের মাদানী জীবনের অনুসরণ অতিমানবীয় কাজ অথবা এ মাক্কী জীবনের কাজ শেষ করতে পারলেই মাদানী জীবন এমনি এমনি তৈয়ার হয়ে যাবে। কেউবা আবার রাসুলের মিষ্টি মিষ্টি সুন্নতগুলোর অনুসরণ নিয়ে ব্যস্ত। একদল এমন রয়েছেন যারা রাসুল সা. মাটির তৈরি নাকি নুরের তৈরি, গোল টুপি পড়েছেন নাকি কিস্তি টুপি ও দাড়িয়ে দুরুদ পড়ব নাকি বসে ইত্যাদি অপ্রাসঙ্গিক তর্কে লিপ্ত আছেন। অনেকটা রসনাভোজি প্রিয় ব্যক্তিদের ন্যয় কিছু ভাই তো সারাক্ষণ রাসুল সা. আলৌকিক দিকগুলো মজা করে উপভোগ করে থাকেন। কিন্তু এতসব ভাই রাসুল সা. ইসলামী সমাজ গড়ার কথা একবারও মুখে আনেন না। ফলে আমাদের জন্য পৃথিবীটা আজ ছোট হয়ে আসছে। এ করুণ পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে দ্রুত আমাদেরকে রাসুল সা. এর পূর্ণাঙ্গ জীবনের কাছে ফিরে আসতে হবে এবং রাসুল সা. গড়ে যাওয়া হৃত আল কুরআনের সমাজব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার সংগ্রামকে অবশ্যই জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য বানাতে হবে। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমীন।