ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। হুমায়ুন কবির আরও বলেন, অনুকূল পরিবেশ হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরে যাবেন। এদিকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরনার্থীদের নিজ দেশে ফেরাতে প্রায় এক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এখনো সফল হয়নি বাংলাদেশ। এরই মধ্যে মালয়েশিয়া কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ যেখানে পারছে না, সেখানে মালয়েশিয়া কীভাবে পারছে— একই অনুষ্ঠানে এই প্রশ্নটি করা হয়েছিল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে। উত্তরে তিনি দেশে এতদিন অগণতান্ত্রিক সরকার থাকাটাকেই কারণ হিসেবে দেখালেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘প্রোট্র্যাক্টেড রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: দ্য সার্চ ফর এ কমপ্রিহেনসিভ অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বের সেমিনারের ফাঁকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। পরে বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ কথা জানানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের যৌথ আয়োজনে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফরেন সার্ভিস একাডেমি ও ইউএনএইচসিআরের সহযোগিতায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কূটনৈতিক প্রতিনিধি, শিক্ষক-গবেষক, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের এ সম্মেলন থেকে প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতে একটি ‘পলিসি ব্রিফ’ তৈরি করা হবে, যা সরকারের নীতি-নির্ধারণে সহায়তা করবে বলে আয়োজকদের ভাষ্য। সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, সম্মেলনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এএসএম আলী আশরাফ, প্রতিনিধিদল, শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী, ফরেন সার্ভিস একাডেমির প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তা এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর হবে কিনা—সেটা নিয়ে কিছুদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল। আগামী শনিবার ও রোববার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আসর বসছে। এ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে যোগ দিতে বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তাঁকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানায় ভারত। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যেই গত ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক প্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে সরাসরি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ে। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চললেও দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির কয়েক দিন আগে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতার সময় ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে হুমায়ুন কবির বলেছেন, মিয়ানমার সরকার শেখ হাসিনা সরকারের দুর্বলতা জানত। তাই তাদের সঙ্গে আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারেনি তৎকালীন সরকার। বছরের পর বছর ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এই অবস্থাকে গ্রহণযোগ্য বা স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করার কোনো সুযোগ নেই। এটি একটি দীর্ঘায়িত জাতীয় চাপ। বাংলাদেশ এই সংকট তৈরি করেনি এবং একা এর সমাধান করাও সম্ভব নয়।
মিয়ানমারকেই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের তাগিদ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন বলেন, মানবিক দায়িত্বশীলতাকে যেন কোনোভাবেই অসীম বা অনির্দিষ্টকালের দায়িত্ব হিসেবে ভুল বোঝা না হয়। সংকট কাটাতে কেবল ত্রাণ সাহায্য যথেষ্ট নয়, বরং মিয়ানমারকেই এর স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে গঠিত জাতীয় রোহিঙ্গা কৌশল প্রণয়ণ কমিটির মাধ্যমে সরকারের নীতি-নির্ধারণী ক্ষেত্রে একটি বড় ও নির্ণায়ক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটি কেবল সাধারণ কোনো কমিটি নয়; বরং এটি প্রথমবারের মতো দেশের কূটনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত কাঠামোর অধীনে নিয়ে এসেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করায় রোহিঙ্গা সংকটকে বিশ্ব বহুপক্ষীয় প্লাটফর্মের শীর্ষ এজেন্ডায় নিয়ে আসতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে।চীনসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় অংশীদারদের সহায়তায় মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে একটি টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের সমাধান খুঁজতে প্রয়োজনীয় ধৈর্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অধীনে ১৯৭৮ সালে এবং আবার বেগম খালেদা জিয়ার অধীনে ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতিহাস ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে, প্রত্যাবাসন সম্ভব। তিনি বলেন, এটি ‘যদি’র প্রশ্ন নয়। এটি ‘কীভাবে’ এবং ‘কত দ্রুত’- সেটির প্রশ্ন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় কৌশল প্রণয়ন কমিটি গঠনের মাধ্যমে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে দেশের কূটনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা যায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একই সঙ্গে একটি মানবিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের উপস্থিতির ফলে মানবিক উদ্বেগের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়ছে।
মানবিক সাড়া ও দায়ভার ভাগাভাগির বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, অর্থায়নের ঘাটতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে কাঠামোবদ্ধ ও পূর্বানুমানযোগ্য আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগির জন্য চাপ অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, বাস্তবে যা একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব, তার ভার কোনো একক দেশের বহন করা উচিত নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের আওতায় কঠোরভাবে রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই দ্রুত সম্পন্ন করতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিতে চায় বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, বহুপাক্ষিক প্রচেষ্টার পরিপূরক হিসেবে ঢাকা আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা চায় এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক, মানবিক এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত সব বিকল্প উন্মুক্ত রাখতে চায়, যাতে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়ার জন্য দেশ প্রস্তুত থাকে।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হতাশার পরিবর্তে নতুন দৃঢ় সংকল্প নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানান এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের অতীত সাফল্যের কথা স্মরণ করেন। সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম রাখাইন রাজ্যের বর্তমান অনিশ্চিত ও পরিবর্তিত মাঠপর্যায়ের জটিল পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন।