কাজী এম কে বাসার

রানা প্লাজা ভবন ধসের বহু বছর চলে গেছে। কিন্তু আমাদের শ্রমিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত, কোন পদক্ষেপ দৃশমান সুফল সাধারণ শ্রমিক ন্যায়সংগতভাবে পাচ্ছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যত দুর্ঘটনা ঘটেছে, ঐ দুর্ঘটনা কবলিত দেশ তা উত্তরণের জন্য বাস্তব সময়োপযোগী দীর্ঘ মেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যাতে এ ধরনের কোন দুর্ঘটনা ভবিষতে আর না ঘটে। আমাদের দেশে ভবন ধস একটি ব্যধির মত গার্মেন্টস শিল্পকে চেপে ধরেছে। আমাদের শ্রমশক্তিকে দুর্বল করছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন শর্ত দুচিন্তার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই ঘটনায় সমস্ত বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে, আমরা সাধারণ নাগরিক সংকিত ব্যথিত চিন্তিত অবস্থায় থাকিÑ যেকোন সময় নিকট আত্নীয় বা পরিচিত প্রতিবেশী বা গোল্ডেন কন্যাদের দুর্ঘটনার খবর বিভিন্ন মিডিয়াতে ভেসে উঠতে পারে। গ্রামে যে সকল সাধারণ পরিবারের তরুণ-তরুণীরা কর্মস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল, তারাই গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রধান ভুমিকা পালন করছে। সকল মেহনতি মানুষের কর্মসংস্থানে, সকল ধরনের নিরাপত্তা দায়িত্ব আমাদের, সমাজের, রাষ্ট্রের। এখন সময় এসেছে, একজন সাধারণ মানুষের সকল নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার। তবেই একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে মানুষের কল্যাণকর দায়িত্ব পালনে, প্রকৃত মানুষ মনে করতে পারবে। সময়োপযোগী নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা ও বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কর্মজীবী মানুষের বর্তমান সময়ে প্রথম প্রয়োজন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। একজন শ্রমিক মাসে কত টাকা আয় করে, বছর শেষে কত টাকা সঞ্চয় থাকে, যেখানে চাকরি করেন সেখানে নিরাপত্তা তহবিলে টাকা জমা হয় কিনা, কর্মক্ষেত্রে ইনসুরেন্স করা আছে কিনা। প্রতি মাস/বছরে তার পরিবারের নিরাপত্তার জন্য কিছু সঞ্চয় করতে পারে কিনা। এ সব মাথায় নিয়ে শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করা উচিত বলে মনে করেন শ্রমিক ভাইবোনেরা। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সাধারণ মানুষের প্রথম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, অবশ্যই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রানা প্লাজা ভবন ধসের ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো সময়োপযোগী ক্ষতিপূরণ পায়নি। আহত ও নিহত শ্রমিকদের স্বজনগণ এখনো ক্ষতিপূরণের দাবিতে আক্ষেপা করছে। তারা বলেছেন, নিহত ও আহত পরিবারের ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও অকাক্সিক্ষত ঘটনা রয়েছে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, পূুনর্বাসন নিয়ে দুনীতি, ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে নানা ধরনের অনিয়মের নাটক সাজিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। সাধারণভাবে প্রতিটি মানুষ কাজ করে তার পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে মাথায় রেখে, কিন্তু আরএমজি সেক্টরের শ্রমিকদের এই নিরাপত্তার সামর্থ্য কতটুকু আছে তা সবাই জানেন। তাই এই আরএমজি সেক্টরের সকল উন্নয়ন পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, অবশ্যই সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ টীমের মতামত নেয়া। একজন শ্রমিক ও তার পরিবারই বলতে পারবে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

খাদ্য নিরাপত্তা : নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর বর্তমান মূল্য একজন শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতার আওতায় আছে কিনা তা ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল জানেন। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী চাল, ডাল, তেল, আটা, ডিম, মাছ, গোস্তসহ অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী আরএমজি সেক্টরের শ্রমিকদের ঘরে সাত দিনের জন্য অগ্রিম সংরক্ষিত করতে পারে কিনা তা আমরা সবাই কমবেশী জানি। সুস্থ থাকার জন্য প্রতিটি মানুষ কমবেশী সচেতন থাকেন। বর্তমান সময়ের শ্রমিক সুস্থ থাকলেই তার পরিবারের সদস্যদের মুখে খাদ্য জোটে। আধুনিক সময়ে শ্রমিদের সুস্থ থাকা তার পরিবারের সুস্পষ্ট স্বচ্ছ জীবনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে একজন শ্রমিককে ভেজালমুক্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করার সামর্থ্য অর্জন জরুরী। প্রতিদিন বাজারের নিত্যপণ্য চড়া দামে ক্রয়ে শ্রমিকদের অক্ষমতা, যন্ত্রণা, অসহাত্ত প্রকাশ পায়। কর্মক্ষেত্রে কেতাদুরস্ত চালচলনে, কথাবার্তায় সব ঠিক থাকে। কিন্তু কর্মস্থলে বিশুদ্ধ পানি পানের সুযোগপর্যন্ত নেই। আবাসিক এলাকায়ও বিশুদ্ধ পানি পানের সুযোগ পাচ্ছে না। কাঁচাবাজারে ভেজালমুক্ত সবজি কিনতে পারছে না।

কর্মস্থানে নিরাপত্তা : প্রতিটি শ্রমিকের অধিকার আছে তার কর্মস্থানে নিরাপত্তা পাওয়ার। এই নিরাপত্তা বর্তমান সময়ে কত ঝুঁকিপূর্ণ তার বাস্তব নৃসংশ উদাহরণ রানা প্লাজা ভবন ধসের ঘটনা। একজন শ্রমিক জানতে চায়, তার কর্মস্থল ও চার পাশের পরিবেশ ঝুঁকিমুক্ত অবস্থায় আছে কিনা। বাড়ি ভাড়া ভাতা দিয়ে ঝুঁকি মুক্ত ঘরে বাস করতে পারবে কিনা, কোম্পানরি নিজস্ব তত্তাবধানে আবাসন ব্যবস্থা করবে কিনা। শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে এখনই কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এছাড়া কর্মস্থলে যাতায়াতের সুব্যবস্থা আছে কিনা।

একজন শ্রমিক তার কর্মস্থলে যান, পায়ে হেঁটে, ভ্যানে চড়ে, বাসে চড়ে। খুব কম সংখ্যক শ্রমিক যান রিকসায়। এই ব্যস্ত নগরীতে যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যদি কর্মস্থলে যাতায়াতে কোম্পানি থেকে বাসের ব্যবস্থা থাকে তাহলে এই ঝুঁকি অনেক কমে যাবে (কিছু কোম্পানির নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা আছে)। একজন শ্রমিক যে পরিমাণ যাতায়াত ভাতা পান, তা খুবই অসংগতিপূর্ণ। যাতায়াত ব্যবস্থা অর্থাৎ যাতায়াত নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার সময় এখনই, তা না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কর্মস্থলে চিকিৎসা নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে, কর্মস্থলে সেনিট্যাসন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে, চাকরির নিরাপত্তা থাকতে হবে, কর্মস্থলে মানসিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, কর্মস্থলে শারীরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সময় উপযোগী করতে হবে, কর্মস্থলে শারীরিক হয়রানির শিকার রোধ করতে হবে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ে। সেই সময় এত বড় বিপর্যয় নিয়ে রাজনৈতিক রং মাখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিরোধী দলের সমর্থকদের ধাক্কায় এই ভবনে ধস ঘটেছে , যা খুবই দুঃখজনক ছিল।

আমরা সকলেই দেশকে ভালবাসি, স্বাধীন দেশের মানুষ সবাই, স্বাধীন দেশে জন্ম গ্রহণকারী মুক্ত চিন্তার মানুষ সবাই। সময় উপযোগী ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, পুনর্বাসনের মত বড় চ্যালেঞ্জকে টেকসই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সঠিক উপায়ে সমাধান করতে হবে। এগুলো সমাধান করতে হলে, আরএমজি সেক্টরের সকলের মতামত বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সকল শ্রমিককে আরএমজি সেক্টরের উন্নয়নে রাজনৈতিক দলবাজির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করা উচিত। আরএমজি সেক্টরের উন্নয়নে সময় উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে দেশের উন্নয়ন হবেই ইনশাআল্লাহ।

লেখক : গবেষক, শিক্ষক ও সাংবাদিক।