২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে জ¦ালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। যার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। ঘটনার পরপরই দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পগুলোতে এক ধরনের অঘোষিত যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে এলেও এর প্রভাব বাজার ব্যবস্থাকে চরমভাবে অস্থির করে তুলছে। বিশেষ করে জ¦ালানি সংকট পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকেই এক প্রকার নড়বড়ে করে দিয়েছে। বিশ্ববাজার বা যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে দেশের একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট চক্র নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ইচ্ছেমতো বাড়িয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনের সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। গ্রাম থেকে রাজধানী-সবখানেই একই হাহাকার। কান পাতলেই শোনা যায়। বাজারে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই। অথচ মূল্যস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজন আয় করেও সংসারের ন্যূনতম ব্যয়টুকু সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। কোন পণ্যটি রেখে কোনটি কিনবেন- সেই হিসাব মেলানোই এখন সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। মাছ-গোশতের মতো পুষ্টিকর খাবার অনেক আগ থেকেই খাবারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। চাল, ডাল, আটা, তেল, সবজি ও মুরগির দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। ফলে কিছু মানুষের ডাল-ডিম দিয়েও দিন পার করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবকিছুর দাম যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, ঠিক তখনই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির নতুন ঘোষণা জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনিতেই সাধারণ ক্রেতা বাজারের আগুনে নাজেহাল অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। অথচ গণআকাক্সক্ষার মুখে আসা নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল, ক্ষমতা গ্রহণের পর তারা দ্রুত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু বাস্তবে দাম কমার কোনো লক্ষণ তো নেই-ই, বরং তা লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবর্তীণ হয়েছে। সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এক অঘোষিত বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দৈনন্দিন সাংসারিক ব্যয়ের ভার বহন করতে গিয়ে ফতুর হয়ে যাচ্ছে । কেউ জমানো অর্থ ভেঙে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন, আবার কেউ খরচের খাত ছোট করতে বাজার তালিকা থেকে মাছ, গোশত ও ফলমূল পুরোপুরি বাদ দিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। কারণ খাদ্যপণ্যের খরচ কোনোমতে কাটছাঁট করা গেলেও বাসাভাড়া, সন্তানদের শিক্ষাব্যয় কিংবা চিকিৎসা খরচের ব্যয়গুলো কমানো যাচ্ছে না। হুহু করে বাড়তে থাকা খরচের বিপরীতে সাধারণ মানুষের আয় তেমন বাড়ছে না। এই ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সামাজিক মর্যাদার কারণে না পারছে কারও কাছে হাত পাততে, না পারছে নিজেদের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে। ফলে লোকচক্ষুর অন্তরালে নীরবে চোখের পানি ফেলা ছাড়া মধ্যবিত্তের আর কোনো পথ খোলা নেই।
জনগণের এ দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের ইতিহাস অবশ্য নতুন কিছু নয়। বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময় জনগণের দুর্ভোগ নিয়ে খোদ শীর্ষ পর্যায় থেকে নানা বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছিল, যা দেশের মানুষ আজও ভুলে যায়নি। সাধারণ মানুষ যখন বাজারদরের চাপে দিশেহারা, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে টেকসই বাজার ব্যবস্থাপনার দিকে নজর না দিয়ে উল্টো বিকল্প খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেন। ২০২২ সালের রমযানে বেগুনের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে তিনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘বেগুন ছাড়া অন্য সবজি দিয়েও বেগুনি খাওয়া যায়। মিষ্টি কুমড়া দিয়েও ভালো বেগুনি হয়। একইভাবে গরু ও মুরগির মাংস সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেলে মন্তব্য করেছিলেন, উন্নত বিশ্বের মানুষ এখন আর বেশি মাংস খায় না এবং কাঁচা কাঁঠাল দিয়েও বার্গার ও কাবাব তৈরি করা যায়। এর আগে ২০১৯ ও ২০২০ সালে পেঁয়াজের বাজারে রেকর্ড অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তিনি বলেছিলেন ‘‘ পেঁয়াজ ছাড়াও তরকারি রান্না করা সম্ভব। এমনকি কাঁচা মরিচের দাম হাজার টাকা কেজিতে পৌঁছালেও সংকট সমাধানের চেয়ে মরিচ শুকিয়ে সংরক্ষণ বা আচার বানিয়ে রাখার পরামর্শ দিতে দেখা গেছে তাঁকে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধানের যেখানে জনদুর্ভোগ লাঘবে নির্ঘুম তৎপরতা চালানোর কথা, সেখানে তিনি সাধারণ মানুষের কষ্ট নিয়ে উপহাস করেছিলেন। জনগণ আজও সেই কথাগুলো ভুলে যায়নি।
হাসিনা সরকারের আমলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও দুর্নীতি। দলীয় আশীর্বাদপুষ্ট ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সে সময় আমদানিনির্ভর বাজারের প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণই নিজেদের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছিল। ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ ও চালের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল পণ্যের বাজার ছিল মুলত কিছু প্রভাবশালী করপোরেট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে তাদের এই একচেটিয়া দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার বা ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস দেখায়নি কেউ। এই অসাধু চক্রটি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ ভোক্তার পকেট কেটেছে এবং সেই লুন্ঠিত অর্থ বিদেশে পাচার করেছে বলে জনমনে প্রবল ক্ষোভ রয়েছে। অন্যদিকে,বর্তমান সরকার তরুণদের এক অভূতপূর্ভ আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। যদিও এই সরকারের মেয়াদ খুব বেশি দিন হয়নি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের নানা আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে, তবে বাস্তবে এখনো বাজার স্থিতিশীলতার দেখা মেলেনি। এমনকি সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারব্যবস্থার দৃশ্যমান কোনো বড় উদাহরণও তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে চরম হিমশিম খাচ্ছে। অবিলম্বে একটি জবাবদিহিমূলক ও সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়বে এবং জনআকাক্সক্ষার এ সরকারের ভাবমর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দেশের চলমান জ¦ালানি সংকট সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের আঘাত হানছে। একদিকে মানুষের আয় কমছে, অন্যদিকে লাগামহীন ব্যয়ের চাপে মানুষ দিশেহারা। খরচ, খরচ আর খরচ- এই বৃত্তেই যেন আটকে গেছে কোটি মানুষের জীবন। বাজারে ঢুকলেই পণ্যের অগ্নিমূল্য শুনে সাধারণ ক্রেতাদের মাথায় হাত পড়ে যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হুহু করে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, স্কুল-কলেজের ফি, যাতায়াত ভাড়া ও বাসাভাড়া। কিন্তু সেই তুলনায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ছে না। শাকসবজি থেকে শুরু করে ডিম, মুরগি, মাছ ও মাংসের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ডাঁটাশাক ছাড়া অধিকাংশ সবজিই বাজারে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর-সবখানেই দ্রব্যমূল্যের তীব্র উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেকে বাজারে গিয়ে বাধ্য হয়ে প্রয়োজনের তালিকায় কাটছাঁট করে ঘরে ফিরছেন। তবে খাবারের খরচের চেয়েও বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসা ব্যয়। বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও গবেষণা বলছে, দেশে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ কেবল চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে নতুন করে দারিদ্র্য সীমার নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। সংকটের সময়ে অনেকেই ‘করজে হাসানা’র মতো মানবিক বা সুদমুক্ত আর্থিক সহায়তা না পেয়ে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের জীবন বাঁচাতে পৈতৃক জমিজমা বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রেও একই সংকট তীব্রভাবে বিরাজ করছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলের বেতন, কোচিং ফি, বই-খাতা ও কলমের খরচ জোগাতে পারছে না। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার পড়াশোনার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বহন করতে না পেরে বাধ্য হয়ে সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ করে দিচ্ছে। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাব্যয় প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। দেশের প্রায় ৭ শতাংশ পরিবারকে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে ঋণ নিতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, খরচের এই নির্মম চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক পরিবার ফ্ল্যাট ছেড়ে তুলনামূলক ছোট বাসা কিংবা সাবলেটে উঠতে বাধ্য হচ্ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে পণ্য গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির খবর খুব কমই পাওয়া যায়। প্রশ্ন জাগে -সিন্ডিকেটের সদস্যরা কি রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে সরকার কেন তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে বাজার সিন্ডিকেটের পেছনে থাকা কুশীলবদের চিহ্নিত করা মোটেও কঠিন নয়। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিয়ে এই অন্যায্য বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছরই অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজির মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হবে, আর সাধারণ ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অনুপস্থিতির কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে একং ক্রেতারা দিনের পর দিন ঠকছেন। ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থাকলেও তাদের কার্যক্রম যেন কেবল কিছু ‘মৌসুমি অভিযানের’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মাঝেমধ্যে দায়সারা অভিযান পরিচালিত হলেও নিয়মিত বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। সংস্থাটি যদি ধারাবাহিক ও কঠোরভাবে বাজার তদারকি করত, তাহলে ভোক্তাদের এই চরম দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসত। এই সংকট সমাধানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারের নীতিগত ও আন্তরিক সদিচ্ছা। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে, তাহলে বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা মোটেও কঠিন নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট ও কারসাজি বন্ধ করা গেলে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির এই লাগামহীন প্রবণতাও থমকে দাঁড়াবে। তখন মধ্যবিত্ত মানুষকে আর লোকলজ্জা মাথায় নিয়ে টিসিবির ট্রাকের পেছনে ছুটতে হবে না। সাধারণ মানুষের তথা দেশবাসীর এখন একটাই প্রত্যাশা- বর্তমান সরকার বাজার তদারকিতে আরও কার্যকর, সাহসী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে সকলের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।