সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারসহ বৃহত্তর সিলেট, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার বিস্তৃত এলাকা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়েছে বলে জানা গেছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরানুযায়ী এ জেলাসমূহে প্রায় ৭৫ হাজার একর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়িঘর ডুবে যাওয়ায় গবাদিপশু এবং হাঁস-মুরগি নিয়েও কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। সম্প্রতি সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশিত জামায়াত নেতা ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট জনাব শিশির মনিরের একটি ছবি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ছবিতে দেখা যায় যে, তিনি তার এলাকা সুনামগঞ্জে বন্যা উপদ্রুত এলাকার কৃষকদের সমস্যার সাথে একাত্মতা দেখাতে গিয়ে বুক সমান পানিতে নেমে তাদের বাড়িঘর ও ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধিÑ স্থানীয় এমপি বার্ধক্যজনিত শারীরিক অক্ষমতার দরুন এলাকা সফরে অক্ষম। আবার সরকারি প্রশাসনের প্রতিনিধিরাও এখন পর্যন্ত দুর্গত এলাকা সফর করেননি। এ অবস্থায় এলাকাবাসী জনাব শিশির মনিরকে পেয়ে আবেগাপ্লুত।
বলাবাহুল্য, বৃষ্টির পানি ও ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে ঘরবাড়ি ও হাজার হাজার একর জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ায় হঠাৎ করেই কৃষকদের মাথায় আকাশ ভেঙে পাড়েছে। মাঠে তলিয়ে যাওয়া ধান আর উঠানে শুকাতে না পারা ভেজা শস্য দুই সংকটের চাপে। কৃষকদের সামনে এখন একটাই প্রশ্ন : এই ক্ষতি পুষিয়ে বছর চলবে কিভাবে? আবার হাওরগুলো বাংলাদেশের বৃহত্তর এলাকায় খাদ্য সরবরাহ করতো। ফসলহানির ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বলাবাহুল্য, এমন বন্যা বাংলাদেশে নতুন নয়। আকস্মিক বা ফ্ল্যাশ বন্যা (Flash flood) মূলত পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা বিশেষ করে হাওর ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রায় প্রতিবছরই ব্যাপকভাবে ক্ষতি করে। এটি পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব না হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে এর ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ দেশের এই উপদ্রুত এলাকাগুলো ব্যাপকভাবে সফর করে বিশেষজ্ঞ ও এলাকাবাসীদের সাথে আলোচনা ও পরামর্শ করে এর প্রতীকার সম্পর্কে নিম্নোক্ত উপায়সমূহকে উপযুক্ত বলে আমার মনে হয়েছে :
১। কাঠামোগত ও প্রকৌশলগত সমাধান (ক) টেকসই বাঁধ নির্মাণ : হাওর ও নদী তীরবর্তী এলাকায় বালু ও সিমেন্ট ব্লক ব্যবহার করে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। (খ) নদী ও খাল খনন : নদীর নাব্য বাড়ানোর জন্য নিয়মিত ড্রেজিং বা খনন অপারিহার্য। এতে পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
(গ) হাওর এলাকায় অবকাঠামো : হাওরের ফসলি জমি রক্ষায় সময়মতো বেড়ি বাঁধ নির্মাণ এবং ভাঙনপ্রবণ এলাকায় কনক্রিটের রিভেন্টমেন্ট ব্যবহার করা। (ঘ) ওয়াটার রিটেনশন পণ্ড : অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার জন্য ছোট ও মাঝারি পুকুর ও জলাধার খনন।
২। পূর্ব সতর্কতা ও ব্যবস্থাপনা
(ক) Early warning : আবহাওয়া অধিদফতর ও বন্যা পূর্র্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (FFWC) মাধ্যমে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির তথ্য দ্রুত স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া।
(খ) স্থানীয় বাসিন্দাদের বন্যার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং আশ্রয়কেন্দ্রে যাবার জন্য প্রস্তুত রাখা।
৩। পরিবেশগত টেকসই পদক্ষেপ
(ক) নদীর পাড়ে বেড়িবাঁধের ধারে পাহাড়ি ঢলের পথে প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগানো। যা পারি গতি কমিয়ে দেয়।
(খ) জলাভূমি সংরক্ষণ : হাওর ও জলাভূমি ভরাট না করে সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। যাতে তা প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করে।
৪। ব্যক্তিগত ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি
উঁচু ভিটা, বাড়িঘর, নলকূপ ও টয়লেট বন্যার পানির উচ্চতার (Flood level) চেয়ে উপরে নির্মাণ করা।
শস্যের সময় (Croffing Pattern) পরিবর্তন : আগাম বন্যার ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত বর্ধনশীল আগাম পাকে এ ধরনের ধান চাষ করা।
উপরোক্ত সুপারিশসমূহ আগে যে মোটেই বাস্তবায়িত হয়নি তা নয়। স্বাধীনতা-পূর্বকাল থেকেই বাস্তবায়িত হয়ে আসছে। কিন্তু এই উদ্দেশ্যে যে তার কাঠামো সৃষ্টি করা হয়েছিল সেগুলোর মেরামত, সংরক্ষণ ও সংস্কার না করার ফলে এবং নিষ্কাশন খাল ও নদীসমূহের খনন কাজ না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকার বন্যা সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আবার ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে এলাকার চাহিদা বহির্ভূত অনুৎপাদনশীল মেঘা প্রকল্পের প্রতি সরকারের ঝোঁকপ্রবণতা বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের চাহিদা উপেক্ষিত হয়েছে।
পাঠকদের অনেকেই নিশ্চয়ই জানেন যে, নদীমাতৃক ও বৃষ্টিবহুল বাংলাদেশ শুরু থেকেই বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় এ দেশের নিত্যসঙ্গী, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধানের পথে না গিয়ে আমাদের শাসকরা এগুলোকে সর্বদা রাজনীতির বিষয়বস্তু হিসেবেই ব্যবহার করেছেন। ষাটের দশকে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বাঙালি মনকে বিষিয়ে তোলার জন্য যে দুটি স্লোগান ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতো তার একটি হচ্ছে দ্রব্যমূল্য আরেকটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ। ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ ‘বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ওরা আসেনি।’ সরল বাঙালি মন সহজেই তাদের অর্থাৎ আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে এবং তাদের সমর্থন দেয়। দুর্ভাগ্য আমাদের, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই দুটি সমস্যার সমাধান না করে তা আরো জটিল করে তুলেছিল। আওয়ামী লীগের প্রথম সরকার থেকে শুরু করে শেষ সরকার পর্যন্ত মজুতদারী, চোরাচালন, মুনাফাখোরী ও সিনডিকেশনের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্যকে আকাশচুম্বি করে তোলা হয়। মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সুযোগ নেয় সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতারা। ফলে দেশে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ডাস্টবিনের এঁটো খাবার কুড়াতে কুকুরের সাথে বুভুক্ষু মানুষের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কাপড়ের অভাবে বাসন্তিরা জাল দিয়ে লজ্জা নিবারণ করে। মরেও তারা দাফনের কাপড় পায়নি; কলাপাতা দিয়ে তাদের কবর দেয়া হয়েছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। বৃটিশ আমলে ছিয়াত্তরের মন্নন্তরে বাংলায় দুই লক্ষ লোক মারা গিয়েছিল। পাকিস্তান আমলে ২৪ বছরে কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের এই দুর্ভিক্ষে দশ লাখ লোক প্রাণ হারিয়েছিল।
একইভাবে শুধু আওয়ামী লীগ নয় বন্যা নিয়ন্ত্রণের বেলায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী প্রত্যেকটি সরকারই চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল। ১৯৫৭ সালে পাকিস্তান আমলে জাতিসংঘের সহযোগিতায় বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সমীক্ষা পরিচালনা ও সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পানি বিজ্ঞানী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন অবসরপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (Secretary of Interior Affairs) মি. ক্রগের (Krug Missin) নেতৃত্বে একটি মিশন গঠন করা হয়। মিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৫৯ সালে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানিসেচ, নিষ্কাশন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের দায়িত্ব দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ওয়াপদা গঠন করা হয়। ( (EPWAPDA), East Pakistan Water and Power Development Authority নামক এ সংস্থাটি বন্যা নিয়ন্ত্রণের পথে অনেক দূর এগিয়ে যায়। বাংলাদেশ হবার পর এ প্রতিষ্ঠানটিকে দুভাগে বিভক্ত করে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সৃষ্টি করা হয়। ইপি ওয়াপদা কর্তৃক গৃহীত বন্যা নিয়ন্ত্রণমূলক অনেকগুলো প্রকল্প স্বাধীনতা পরবর্তীকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বাস্তবায়িত হয়। তবে শাসকগোষ্ঠী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পাল্টিয়ে ফেলেন। তারা ধরে নেন যে, বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, এটি প্রকৃতির অবদান। এর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে উপকারী অবদান অনেক বেশি; প্রতি বছর বন্যার ফলে বাংলাদেশের নদীগুলো দিয়ে ২.৪ বিলিয়ন টন পলি বাহিত হয়; এ পরিমাণ হলো সব নদী দিয়ে পলিবাহিত মোট পলির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। বন্যা নিয়ন্ত্রণ হলে বাংলাদেশের মাটি উর্বরতা হারাবে। সোজা বাঙালি আমরা সবই মেনে নেই। ফলে এখন প্রতি বছরই আমাদের প্রলয়ংকরী বন্যার কবলে পড়তে হচ্ছে। এই বন্যাকে আমরা এখন সুপারলেটিভ ডিগ্রিতে বর্ণনা করি।