রোহিঙ্গারা এক ভাগ্যাহত জাতিগোষ্ঠী। রোহিঙ্গারা ঐতিহাসিকভাবে আরাকানী হিসেবেও ব্যাপক পরিচিত রোহিঙ্গা হলো পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি রাষ্ট্রবিহীন ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী ও বাংলা ভাষা বলয়ের উপভাষা রোহিঙ্গা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী। ২০১৬-১৭ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের পূর্বে ১ মিলিয়নের অধিক রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বসবাস করত। অধিকাংশ রোহিঙ্গা ইসলাম ধর্মের অনুসারী; যদিও কিছু সংখ্যক হিন্দুধর্মের অনুসারীও রয়েছে। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করেছে। ১৯৮২ সালের বার্মিজ নাগরিকত্ব আইন অনুসারে তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, ১৯৮২ সালের আইনে রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা অর্জনের সম্ভাবনা কার্যকরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া সত্ত্বেও, বার্মার আইন এ সংখ্যালঘু নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে তাদের জাতীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করছে। এছাড়াও তাদের আন্দোলনের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা ১৯৭৮, ১৯৯১-১৯৯২, ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬-২০১৭ সালে সামরিক নির্যাতন এবং দমনের সম্মুখীন হয়েছে। জাতিসংঘ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর চালানো দমন ও নির্যাতনকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মিয়ানমারের বিশেষ তদন্তকারী ইয়ংহি লি, বিশ্বাস করেন, মিয়ানমার পুরোপুরি তাদের দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের বিতড়িত করতে চায়। ২০০৮ সালের সংবিধান অনুসারে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এখনো সরকারের অধিকাংশ বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে থাকে যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেনাবাহিনীর জন্য সংসদে ২৫% আসন বরাদ্দ রয়েছে এবং তাদের মধ্য থেকে একজন উপ-রাষ্ট্রপতি থাকারও বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

একথা কারো অজানা নয় যে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বিশ্ব মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সৃষ্ট বিশাল এক মানবিক সঙ্কট প্রত্যক্ষ করে। সহিংস হামলার শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসে। তাদের গ্রামগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এটি সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে প্রবেশ করা মানুষের নজিরবিহীন এক ঢলের সূচনা করেছিল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের খোঁজে লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। স্থানীয় বাংলাদেশীদের উদার সমর্থন এবং বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে বহুজাতিক সহায়তা প্রচেষ্টার কারণে একটি মারাত্মক মানবিক সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। ইউনিসেফ এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশীদাররা পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পুষ্টি এবং সুরক্ষাসহ মৌলিক সেবাগুলো বিস্তৃত ও জোরদার করেছে।

মূলত, ৯ বছর আগে মিয়ানমারে নিপীড়নের মুখে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ঢল নামে সীমান্ত অভিমুখে। কয়েক দিনে সাত লাখের বেশি উদ্বাস্তুর ঠাঁই হয় বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরে। তখন থেকেই তাদের প্রত্যাবাসনে তোড়জোড় শুরু হলেও সে প্রক্রিয়া এতদিনেও আলোর মুখ দেখেনি। মিয়ানমার রোহিঙ্গা পত্যর্পণে নিজেদের আন্তরিকতা প্রমাণ করতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সময়ের সঙ্গে বদলেছে রাখাইনের পরিস্থিতি, পাল্টে গেছে সব হিসাব-নিকাশ। যুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা ও নাগরিকত্বের সঙ্কটে ঘরে ফেরার সব পথ এখনো বন্ধ রয়েছে। তবু নিজেদের ঘর, ভূমি ও পরিচয়ে ফেরার স্বপ্ন দেখছেন বাস্তুচ্যুতদের বড় একটি অংশ। এখন প্রশ্ন-ফিরলেও নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জমি-বাড়ি ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে তো? বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত আশ্বস্ত হওয়া যায়নি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এখন বড় বাধা রাখাইনের যুদ্ধ। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাতের কারণে অঞ্চলটি এখনো অস্থিতিশীল। ওই রাজ্যের বড় একটি অংশ বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাখাইনে সংঘাতের কারণে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। তাদের অধিকাংশই উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছেন।

রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরানোর বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নানা ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেলে বাস্তবতা হলো তাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা নেই। মূলত, রোহিঙ্গাদের বড় উদ্বেগ প্রত্যাবাসনের পর নিরাপত্তা ও অধিকার। ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিস সূত্রমতে, চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়া প্রত্যাবাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত। এরপর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকত্বও বড় প্রশ্ন। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের কারণে রোহিঙ্গাদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রহীন অবস্থায় রয়েছেন। নাগরিকত্ব ও সমানাধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আসলে রোহিঙ্গাদের কাছে একমাত্র সমাধান নিরাপদ প্রত্যাবাসন।

ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নানাবিধ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের আন্তরিকতার বিষয়টিই প্রধান। উদ্ভূত পরিস্থিতে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে তালিকা যাচাইও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে। গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে। একে অগ্রগতি হিসাবে দেখা হলেও, তা এখনো বাস্তব প্রত্যাবাসনে রূপ নেয়নি। মিয়ানমার বলছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাই করা ব্যক্তিদের নেয়া হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাদের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকছে।

প্রশ্ন উঠেছে রোহিঙ্গাদের যদি সত্যিই ফেরানো হয় তাহলে তারা কোথায় থাকবেন বা রোহিঙ্গারা কি নিজেদের পুরোনো গ্রামে ফিরতে পারবেন, জমি-বাড়ির মালিকানা ফিরে পাবেন; কাজ করার অধিকার থাকবে বা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াই প্রত্যাবাসন নয়। মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে ফেরার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অন্যথায় নতুন করে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

মূলত, রোহিঙ্গারাই শুধু বিপদে পড়েনি বরং শরণার্থীদের কারণেই বাংলাদেশেও নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ৯ বছরে রোহিঙ্গা সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনজীবন, পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায়। স্থানীয়রাও চান, রোহিঙ্গারা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাক। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য যে, ভাগ্যাহত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও রাখাইনের পরিস্থিতিতে বাস্তব অগ্রগতি নেই বরং দিনের পর দিন সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। মূলত, রোহিঙ্গা সঙ্কট বাংলাদেশের একার নয়। বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের রূপরেখা প্রণয়নসহ সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক চাপ, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের আলোচনা ও তালিকা যাচাই চললেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকে ৯ বছরে নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি। ২০১৭ সালের পর থেকে ২৫ আগস্টকে তারা রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালন করেন।

বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নিরাপদে নিজভূমিতে ফেরার আশায় থাকলেও দীর্ঘ ৯ বছরে তাদের অপেক্ষার প্রহর কাটেনি বরং তা ক্রমেই দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হচ্ছে। একদিকে মিয়ানমারের চলমান সঙ্ঘাত ও অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসার কারণে রোহিঙ্গা সঙ্কট নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় দিন যতই যাচ্ছে দেশে ফেরার অনিশ্চতায় হতাশায় ভূগছেন রোহিঙ্গারা। তবে দেশে ফেরার নেপথ্যে আছে এক ভয়ঙ্কর তৎপরতা। ক্যাম্পে আধিপত্য, মাদক কারবার পরিচালনা, অপহরণ, অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধ বেড়েই চলছে। যা আমাদের জন্য হুমকীর কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী গত ৯ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ৩শর মতো খুন হয়েছেন। ক্যাম্পে প্রায় ১০টির বেশি সশস্ত্র ও অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। যারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত। অস্ত্র-মাদক কারবার, অপহরণ, আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজিতে দিন দিন অস্থিরতা বেড়েই চলছে। অপরাধ দমনে পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) নিয়মিত অভিযান চালালেও ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে বাংলাদেশও রোহিঙ্গাদের নিয়ে স্বস্তিতে নেই।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে এবং বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন বাড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা। সরকারি তথ্যানুযায়ী বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে মাত্র কয়েক সপ্তাহে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র যুদ্ধের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছে আরো সাড়ে চার লাখ। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। তবুও বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। একইসাথে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন সাফল্য আসেনি।

দীর্ঘ ৯ বছর বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে থাকা রোহিঙ্গারা দেশে ফেরার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। তারা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চান না। রোহিঙ্গা কমিউনিটি সূত্র বলছে, বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি তারা কৃতজ্ঞ। কিন্তু তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হলে তারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে প্রস্তুত। ভুক্তভোগীরা বলছেন, তাদের সন্তানদের অনেকেই মিয়ানমার দেখেনি। তারা বাংলাদেশে নিরাপদে আছেন, কিন্তু এটি তাদের দেশ নয়। তারা নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে চায়। তবে ফিরে গিয়ে যদি আবার নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা বৈষম্যের শিকার হতে হয়, তাহলে সে প্রত্যাবাসনের কোনো অর্থ থাকবে না। তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে স্থানীয় জনপদে রোহিঙ্গা জটিলতার কারণে স্থানীয় নানাবিধ চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে বনভূমি উজাড়, পরিবেশের ভারসাম্যহানি, শ্রমবাজারে মজুরি কমে যাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের বিষয়টি সমর্থন করেন, তবুও সঙ্কটের দ্রুত ও টেকসই সমাধান দেখতে চান। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হলেও স্থানীয় মানুষের মধ্যে এখনো উদ্বেগ রয়েছে। মাদক, মানবপাচার ও অপরাধচক্রের তৎপরতা নিয়ে আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধান জরুরি। মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও সীমিত সুযোগের কারণে বাল্যবিবাহ, মানবপাচার, নিরাপত্তাহীনতা এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার মতো সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে কিশোরীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে পরিবারগুলোর মধ্যে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দালালচক্র এখনো নানাভাবে সক্রিয়। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক নারী ও তরুণকে পাচারের চেষ্টা করা হয়। সচেতনতা বাড়লেও ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি। এ বিষয়টিতে কঠোর নজরদারি দরকার। তারা বলেন, সম্প্রতি উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়ে জীবন দিয়েছেন শতশত নারী-পুরুষ। এপিবিএনসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বানিনী সূত্র জানায়, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৩৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। তার মধ্যে মামলা হয়েছে ২০৮টি। এসব মামলায় আসামি গ্রেফতার হয়েছে ৪৬৮ জন। হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩২৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ২০২৫ সালে ২৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এরমধ্যে মামলা হয়েছে ২২টি। গ্রেফতারের সংখ্যা মাত্র ২৩। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত্র ২০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৯টি। আসামি গ্রেফতার করা হয়েছে ৪৭ জনকে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে তিন বছরে চার বছরের তুলনায় ২০২৪ সালের পর হত্যাকাণ্ড, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকটা কমেছে।

এপিবিএনের চারটি ব্যাটালিয়নের মাত্র ৯০৫ জনবল নিয়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা গত দু’বছরে ভালো প্রশংসা পেয়েছে সাধারণ রোহিঙ্গাদের কাছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এপিবিএনের চারটি ব্যাটালিয়নের অভিযানে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৮টি অস্ত্র, বোমা ২২টি, গ্রেনেড ১টি, গোলাবারুদ ৭৯ ও গুলির খোসা ৪৫টি উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় ১৮টি মামলায় ৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময়ে অভিযানে দুই লাখ ৯০ হাজার ৫২৪ পিস ইয়াবা, গাঁজা ৪৬ কেজি, সাড়ে ৫৬ কেজি স্বর্ণালঙ্কারসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ও সিগারেট জব্দ করা হয়। মাদক ও অন্যান্য ২৭৮ মামলায় ২০২৫ সালে ৩৬৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। চলতি বছরের আট মাসে এক লাখ ১৯ হাজার ৩৩১ পিস ইয়াবা জব্দ করে এপিবিএন।

এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও তাদের যে কোনো সমস্যা সমাধানে এপিবিএন সদস্যরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। উখিয়া এবং টেকনাফসহ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিতভাবে একটি ইউনিট গঠন প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য শক্তিশালী এ ইউনিটটি তৈরি হচ্ছে যাতে এপিবিএনের তত্ত্বাবধানে থাকবে সিআইডি, এসবি, এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)। এ ছাড়া ক্যাম্পগুলোতে যে কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটার আগেই সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণে তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তাসহ বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দেয়া কোন ভাবেই সহজসাধ্য হচ্ছে না।

মূলত, রোহিঙ্গারা ঐতিহাসিকভাবে ভাগ্যবিড়ম্বিত ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। তারা নিজেদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। বাস্তুভিটা ছেড়ে রোহিঙ্গারা যেমন স্বস্তিতে নেই, ঠিক তেমনিভাবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বাংলাদেশেও সৃষ্টি হয়েছে নানাবিধ জটিল সমস্যা। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রের ওপর। তাই সার্বিক সমস্যা সমাধানে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্বসহ পূর্ণ মর্যাদার সাথে দেশে ফেরৎ পাঠাতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

www.syedmasud.com