জাফর আহমাদ
“আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর আলো। তাঁর আলোর উপমা যেন একটি দীপাধার, যার মধ্যে আছে একটি প্রদীপ, প্রদীপটি স্থাপিত একটি কাচপাত্রের মধ্যে কাচপাত্রটি উজ্জ্বল নক্ষত্র সদৃশ্য। আর প্রদীপটি পবিত্র যয়তুনের তেল দ্বারা প্রজ্জ্বলিত করা হয় যা পূর্বেরও নয়, পশ্চিমেরও নয়। যার তেল আপনা আপনিই জ্বলে ওঠে, আগুন তাকে স্পর্শ না করলেও। আলোর ওপরে আলো। আল্লাহ যাকে চান আলোর দিকে পথ নির্দেশ করেন। তিনি উপমা পেশ করেন মানুষের জন্য, আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞানী। (সুর নুর-৩৫)
আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী শব্দ সাধারণভাবে কুরআন মাজীদে ‘‘বিশ্বজাহান” অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কাজেই অন্য কথায় আয়াতের অনুবাদ এও হতে পারে: “আল্লাহ সমগ্র বিশ্বজাহানের আলো।” আলো বলতে এমন জিনিস বুঝানো হয়েছে যার বদৌলতে দ্রব্যের প্রকাশ ঘটে। অর্থাৎ যে নিজে নিজে প্রকাশিত হয় এবং অন্য জিনিসকেও প্রকাশ করে দেয়। মানুষের চিন্তায় নূর ও আলোর এটিই আসল অর্থ। কিছুই না দেখা যাওয়ার অবস্থাকে মানুষ অন্ধকার নাম দিয়েছে। আর এর বিপরীত যখন সবকিছু দেখা যেতে থাকে এবং প্রত্যেকটি জিনিস প্রকাশ হয়ে যায় তখন মানুষ বলে আলো হয়ে গেছে। আল্লাহ তা’আলার জন্য “নুর” তথা আলো শব্দটির ব্যবহার ও মৌলিক অর্থের দিক নির্দেশ করে।
নাউযুবিল্লাহ তিনি এমন কোন আলোকরশ্মি নন যা সেকেণ্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হ্জাার মাইল বেগে চলে এবং আমাদের চোখের পর্দায় পড়ে মস্তিস্কের দৃষ্টি কেন্দ্রকে প্রভাবিত করে, আলোর এ ধরণের কোন অর্থ এখানে নেই। মানুষের ভাষায় প্রচলিত যতগুলো শব্দ আল্লাহর জন্য বলা হয়ে থাকে সেগুলো তাদের আসল মৌলিক অর্থের দৃষ্টিতে বলা হয়ে থাকে, তাদের বস্তুগত অর্থের দৃষ্টিকে বলা হয় না। যেমন: আমরা তাঁর জন্য দেখা শব্দটি ব্যবহার করি। এর অর্থ এ হয় না যে, তিনি মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টিজীবের মতো চোখ নামক একটি অংগের মাধ্যমে দেখেন। আমরা তাঁর জন্য শোনা শব্দ ব্যবহার করি। এর মানে এ নয় যে, তিনি আমাদের মতো কানের সাহায্যে শোনেন। তাঁর জন্য আমরা পাকড়াও ধরা শব্দ ব্যবহার করি। এর অর্থ এ নয় যে, তিনি হাত নামক একটি অংগের সাহায্যে ধরেন। এসব শব্দ সবসময় তাঁর জন্য একটি প্রায়োগিক মর্যাদায় বলা হয়ে থাকে এবং একমাত্র একজন স্বল্প বুদ্ধিমান ব্যক্তিই এ ভুল ধারণা করতে পারে যে, আমাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় শোনা, দেখা, ও ধরার যে সীমাবদ্ধ ও বিশেষ আকৃতি রয়েছে তার বাইরে এগুলোর অন্য কোন আকৃতি ও ধরন হওয়া অসম্ভব।
অনুরূপভাবে “নুর” বা আলো সম্পর্কেও একথা মনে করা নিছক একটি সংকীর্ণ চিন্তা ছাড়া আর কিছুই নয় যে, এর অর্থের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এমন রশ্মিরই আকারে পাওয়া যেতে পারে যা কোন উজ্জল অবয়ব থেকে বের হয়ে এসে চোখের পর্দায় প্রতিফলিত হয়। এ সীমিত অর্থে আল্লাহ আলো নন বরং ব্যাপক, সার্বিক ও আসল অর্থে আলো। অর্থাৎ এ বিশ্ব-জাহানে তিনিই এক আসল “প্রকাশের কার্যকারণ”, বাকি সবই এখানে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যান্য আলোকে বিতরণকারী জিনিসগুলোও তাঁরই দেয়া আলো থেকে আলোকিত হয় ও আলো দান করে। নয়তো তাদের কাছে নিজের এমন কিছু নেই যার সাহায্যে তারা এ ধরনের বিস্ময়কর কাণ্ড করতে পারে। আল্লাহকে আলো বলার মানে এ নয় যে, নাউযুবিল্লাহ আলোই তাঁর স্বরূপ। আসলে তিনি তো হচ্ছেন একটি পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ সত্তা। তিনি মহা জ্ঞানী, মহা শক্তিশালী, প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ ইত্যাদি হবার সাথে সাথে আলোর অধিকারীও। কিন্তু তাঁর সত্তাকে আলো বলা হয়েছে নিছক তাঁর আলোকোজ্জলতার পূর্ণতার কারণে।
আলো শব্দের ব্যবহার জ্ঞান অর্থেও হয় এবং এর বিপরীতে অজ্ঞতা ও অজ্ঞানতাকে অন্ধকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এ অর্থেও আল্লাহ বিশ্ব-জাহানের আলো। সত্য-সঠিক, সহজ-সরল ও আলোকিত রাজপথটি তাঁর আলো দ্বারাই উদ্ভাসিত। কেননা, এখানে সত্যের সন্ধান ও সঠিক পথের জ্ঞান একমাত্র তাঁর মাধ্যমেই এবং তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া যেতে পারে। তাঁর দান গ্রহণ করা ছাড়া মূর্খতা ও অজ্ঞতার অন্ধকার এবং তার ফলশ্রুতিতে ভ্রষ্টতা ও গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা প্রতিদিন সুরা ফাতিহায় প্রার্থনা করি, “আমাদের সরল পথ দেখাও” সেটিই আলোর পথ। অর্থাৎ জীবনের প্রত্যেকটি শাখা প্রশাখায় এবং প্রত্যেকটি বিভাগে, চিন্তা, কর্ম ও আচরণের এমন বিধি-ব্যবস্থা আমাদের শেখাও, যা হবে একেবারেই নির্ভূল, যেখানে ভুল দেখা, ভুল কাজ করা ও অশুভ পরিণামের আশংকা নেই, পথটি আলোকিত বিধায় সে পথে চলে সাফল্য ও সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়া যায়। কুরআন অধ্যয়নের প্রাক্কালে বান্দা তার প্রভু, মালিক আল্লাহর কাছে এই আবেদনটি পেশ করে। বান্দা আর্জি পেশ করে, হে আল্লাহ! তুমি আমাদের পথ দেখাও। কল্পিত দর্শনের গোলকধাঁধার অন্ধকারের মধ্য থেকে যথার্থ সত্যকে উন্মুক্ত করে আমাদের সামনে আলোকিতক করে তুলে ধর। বিভিন্ন নৈতিক চিন্তা-দর্শনের মধ্য থেকে যথার্থ ও নির্ভুল নৈতিক চিন্তা-দর্শন আমাদের সামনে উপস্থাপিত কর। জীবনের অসংখ্য পথের মধ্য থেকে চিন্তা ও কর্মের সরল ও আলোকিত রাজপথটি আমাদের দেখাও।
আল কুরআনকে পরোক্ষভাবে নুর বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আলিফ, লাম, রা। এটি একটি কিতাব, তোমার প্রতি এটি নাযিল করেছি, যাতে তুমি লোকদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর মধ্যে নিয়ে আসো তাদের রবের প্রদত্ত সুযোগ ও সামর্থের ভিত্তিতে, এমন এক আল্লাহর পথে যিনি প্রবল প্রতাপান্বিত ও আপন সত্তায় আপনি প্রশংসিত।” (সুরা ইবরাহিম : ০১) অর্থাৎ অন্ধকার থেকে বের করে আলোর মধ্যে আনার মানে হচ্ছে, শয়তানের পথ থেকে সরিয়ে আল্লাহর পথে নিয়ে আসা। অন্য কথায়, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে নেই সে আসলে অজ্ঞতা ও মূর্খতার অন্ধকারে বিভ্রান্তর মতো পথ হাতড়ে মরেছে। সে নিজেকে যতই উন্নত চিন্তার অধিকারী এবং জ্ঞানের আলোকে যতই উদ্ভাসিত মনে করুক না কেন তাতে আসল অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর পথের সন্ধান পেয়েছে সে মূলত: আল্লাহর আলোর পথ খুঁজে পেয়েছে, সে গ্রামীন এলাকার একজন অশিক্ষিত লোক হলেও সে আসলে জ্ঞানের আলোর রাজ্যে পৌঁছে গেছে।
উল্লেখিত আয়াতে বলা হয়েছে, যাতে তুমি এদেরকে রবের প্রদত্ত সুযোগ ও সামর্থের ভিত্তিতে আল্লাহর পথে নিয়ে এসো এ উক্তির মধ্যে আসলে এদিকে ইংগিত করা হয়েছে যে, আল্লাহর নূর তারাই পেতে পারে যাদেরকে আল্লাহ দীনের জন্য বাঁচাই করেন। কোন প্রচারক, তিনি নবী হলেও, সঠিক আলোর পথ দেখিয়ে দেয়া ছাড়া তাকে পুরোপুরি আল্লাহর দেয়া সুযোগ ও সামর্থের ওপর নির্ভর করতে হবে। আল্লাহ কাউকে সুযোগ দিলে সে হেদায়াত লাভ করতে পারে। নয়তো নবীর মতো সফল ও পূর্ণ শক্তিধর প্রচারকও নিজের সকল শক্তি নিয়োগ করেও তাকে হিদায়াত দান করতে পারে না। হিদায়াত দান সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর মর্জি ও ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যদি এটাই আল্লাহর ইচ্ছা হতো তাহলে তিনি তোমাদের সবাইকে একই উম্মতে পরিণত করতেন। কিন্তু তিনি যাকে চান গোমরাহীর মধ্যে ঠেলে দেন এবং যাকে চান সরল সঠিক পথ দেখান। আর অবশ্যই তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (সুরা নাহল : ৯৩) আল্লাহ তা’আলা অন্যত্র বলেন, “হে নবী! তুমি যাকে চাও তাকে হিদায়াত দান করতে পারো না কিন্তু আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত দান করেন এবং যারা হিদায়াত গ্রহণ করে তাদেরকে তিনি খুব ভাল করেই জানেন।” (সুরা আল কাসাস : ৫৬)
তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চিন্তা করতে হবে যে, আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সৃষ্টি করার সাথে সাথে তাকে একটি স্বাধীন বিবেক দান করেছেন। এই স্বাধীন বিবেক দ্বারা মানুষ নিজেই নির্বাচন ও গ্রহণ করবে তার জন্য কোনটি ভালো বা আলো ঝলমলো পথ এবং কোন পথটি মন্দ ও অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা সরু ও কন্টকার্কির্ণ পথ। তাই দুনিয়ায় মানুষদের পথ বিভিন্ন। কেউ গোমরাহীর দিকে যেতে চায় এবং আল্লাহ গোমরাহীর সমস্ত উপকরণ তার জন্য তৈরি করে দেন। কেউ সত্য-সঠিক পথের সন্ধানে ব্যাপৃত থাকে এবং আল্লাহ তাকে সঠিক পথোর নির্দেশনা দানের ব্যবস্থা করেন।
মুফাসিসর কেরামগণ বলেন, আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ তাঁর নূরকে একটি উপমার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। প্রথমত: তাঁর নূর মুবারকময় অর্থাৎ যা বহুল উপকারী, বহুমূখী কল্যাণের ধারক। দ্বিতীয়ত: যা খোলা ময়দানে বা উঁচু জায়গায় অবস্থান করে। যেখানে সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত তার ওপর রোদ পড়ে। তার সামনে পেছনে কোন আড়াল থাকে না যে, কেবল সকালের রোদুটুকু বা বিকালের রোদটুকু তার ওপর পড়ে। এমন ধরনের যয়তুন গাছের তেল বেশি স্বচ্ছ হয় এবং বেশি উজ্জল আলো দান করে। নিছক পূর্ব বা নিছক পশ্চিম অঞ্চলের যয়তুন গাছ তুলনামূলকভাবে অস্বচ্ছ তেল দেয় এবং প্রদীপ তার আলোও হালকা থাকে। উপমায় প্রদীপের সাথে আল্লাহর সত্তাকে এবং তাদের সাথে বিশ্ব-জাহানের তুলনা করা হয়েছে এমন পরদাকে যার মধ্যে মহাসত্যের অধিকারী সমস্ত সৃষ্টিকুলের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন অর্থাৎ এ পরদাটি যেন গোপন করার পরদা নয় বরং প্রবল পরাক্রান্ত প্রকাশের পরদা। সৃষ্টির দৃষ্টি যে তাঁকে দেখতে অক্ষম এর কারণ এটা নয় যে, মাঝখানে অন্ধকার আছে বরং আসল কারণ হচ্ছে, মাঝখানের পরদা স্বচ্ছ পরদা অতিক্রম করে আগত আলো এতবেশি তীক্ষè, তীব্র, অবিমিশ্র ও পরিবেষ্টনকারী যে, সীমিত শক্তি সম্পন্ন চক্ষু তা দেখতে অক্ষম হয়ে গেছে।
যদিও আল্লাহর এ একক ও একচ্ছত্র আলো সমগ্র বিশ্ব-জাহান আলোকিত করছে কিন্তু তা দেখার, জানার ও উপলব্ধি করার সৌভাগ্য সবার হয় না। তা উপলব্ধি করার সুযোগ এবং তার দানে অনুগৃহীত হবার সৌভাগ্য আল্লাহই যাকে চান তাকে দেন। নয়তো অন্ধের জন্য যেমন দিনরাত সমান ঠিক তেমনি অবিবেচক ও অদূরদর্শী মানুষের জন্য বিজলী, সুর্য, চাঁদ ও তারার আলো তো আলোই কিন্তু আল্লাহর নূর ও আলো সে ঠাহর করতে পারে না। এ দিক দিয়ে এ দুর্ভাগার জন্য বিশ্ব-জাহানের সবদিকে অন্ধকারই অন্ধকার। তার অন্তরদৃষ্টি না থাকার কারণে তার নিজের পাশেই আল্লাহর আলোয় যে সত্য জ¦লজ¦ল করছে তাকে দেখতে পায় না। যে ব্যক্তি সত্যের আলোর অনুসন্ধানী নয়, ব্যক্তি সমগ্র মনপ্রাণ দিয়ে নিজের পার্থিব স্বার্থেরই মধ্যে বিলীন হয়ে যায় এবং বস্তুগত স্বাধ ও স্বার্থের সন্ধানে নিমগ্ন থাকে। আল্লাহ জানেন যে এর সন্ধানী ও ঐকান্তিক সন্ধানী সে-ই এ দান লাভের যোগ্য।
লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।