একটি প্রশ্ন এখন বেশ বড় হয়ে উঠেছে। প্রশ্নটি হলো, মানুষ কেন সমাজবদ্ধ হয়েছে? সমাজের এখন যে চিত্র, তা দেখে কেউ কি বলবেন-একদা আপন প্রয়োজনে এবং খুবই আগ্রহ নিয়ে মানুষ সমাজবদ্ধ হয়েছিলো? আগ্রহের জায়গায় এখন প্রশ্ন কেন? এ প্রশ্ন কারা সৃষ্টি করলো? আকাশ থেকে এলিয়নরা এসে প্রশ্ন সৃষ্টি করেনি। প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে এ সমাজের মানুষরাই। আমাদের সমাজ যে বসবাসের জন্য এখন খুব সুখকর জায়গা নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতিদিনের সংবাদপত্রে। সামাজিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে যে, নৃশংসতা ও হত্যাকা-ের হার বেড়েই চলেছে। এ নিয়ে মানুষ চিন্তিত। প্রশাসনও আছে চাপের মধ্যে। তবে চিন্তা-দুশ্চিন্তা বা চাপ কোনো সংকটের সমাধানে কার্যকর কিছু নয়। সংকট সমাধানে প্রয়োজন কারণ উদঘাটন এবং প্রতিবিধান। এসব নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু আলোচনা আছে, আছে প্রতিবেদনও।
একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে দেশে নৃশংসতা ও হত্যকা-ের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী পর্যালোচনা করে ছয়টি বিশেষ কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাদকের প্রভাব। মাদকের টাকার জোগান দিতে গিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছে মাদকসেবীরা। পারিবারিক কলহ ও পরকীয়ার কারণে মূল্যবোধ এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে এখন বিবেচিত হচ্ছে মোবাইলে পর্ণো-ভিডিওর ছড়াছড়ি। এতে নৈতিকতায় অধঃপতন ঘটছে দেশের তরুণ সমাজসহ নাগরিকদের। এমন অবক্ষয়ে জড়িত রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সিনেমার যৌন উন্মাদনামূলক চিত্রনাট্যের প্রভাব। এছাড়া রয়েছে পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহকে উপজীব্য করে নির্মিত ভারতীয় মিডিয়ার বিভিন্ন সিরিয়াল, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নির্মিত বিভিন্ন ধরনের সিরিয়াল ও মুভি শো। এতে হয়তো তাদের ব্যবসা হচ্ছে কিন্তু পরিবার ও সমাজে পড়ছে মন্দ প্রভাব। অনলাইনে জুয়ার ছড়াছড়ি এবং সাম্প্রতিক সময়ে ফেক আইডি তৈরি করে প্রতারণার কৌশল তরুণদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা এর বিপরীতে সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার কথা বলছেন। যেসব ঘটনা, কাজ, সমাজে অধঃপতন ডেকে আনছে; সেগুলো দূর করতে কঠোর আইনি পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে, বিচারের সংস্কৃতিক গড়ে তোলার কথা বলছেন সমাজ বিজ্ঞানীরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গত মার্চ মাসের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ মাসে শুধু ডিএমপিতেই খুনের শিকার হয় ২৪ জন। ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৫৬টি। নারী ও শিশু নির্যাতনে ঘটনা ঘটে ৫৫টি। অপহরণের ঘটনা ঘটে ২০টি। বিভিন্ন অপরাধের কারণে মামলা হয় এক হাজার ৩০৫টি। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের এপ্রিলে বিভিন্ন সহিসংসতায় ২২ জন নিহত হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয় ২৯৪ নারী ও শিশু। ওই মাসে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৯ নারী ও শিশুকে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ দেশে প্রায় ৭৭০টি হত্যাকা- ঘটে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিমাসে প্রায় ২৫০টি হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যে বলা হয়, চলতি বছরের গত তিন মাসে দেশে ১২৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। মার্চ মাসে ছয় বছরের নিচে পাঁচ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ৭ থেকে ১২ বছরের ১৪ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। তাদের মধ্যে একজন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। সূত্র জানায়, অনেক পরিবার অপরাধীর হুমকির মুখে মামলা করার সাহস পায় না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে। আর প্রভাবশালী আসামিরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগী পরিবারকে এলাকা ছাড়া করার হুমিক দেয়। এসব কারণে মামলা করার সাহস পায় না অনেকেই। ফলে আড়ালে থেকে যায় প্রকৃত চিত্র।
সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়া বেড়ে গেছে। ধনীর দুলাল থেকে শুরু করে রিকশাচালক পর্যন্ত মত্ত এখন এ খেলায়। এতে মোটা অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচারের পাশাপাশি সমাজে বড় ধরনের অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। অনলাইনে জুয়ার টাকা জোগান দিতে গিয়ে কিশোর গ্যাং ছিনতাই ও অপহরণের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সময়ে ফেসবুকে ভুয়া ফেক আইডি তৈরি করে বিভিন্ন অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটছে। ফেক আইডি তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার তৎপরতা চালাচ্ছে অপরাধী চক্র। সাইবার অপরাধ ঠেকানো এখন বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশের জন্য। রাত জাগা কিশোর ও তরুণরা মোবাইলে বিশেষ ধরনের আসক্তিতে পড়ছে। তারা বিভিন্ন গেম যেমন-পাবজি, ফোর্টনাইট, পোকেমন গো, মাইনক্র্যাফট, ক্র্যাশল্যান্ড, ইভোল্যান্ড-১ ও ২, ব্যাডল্যা- ব্রাউল এবং হোলডাউনসহ বিভিন্ন গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অনেকেই সারারাত গেম খেলার কারণে সকালে ঘুম থেকে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিশুরাও মোবাইলে আক্রমণাত্মক কার্টুনে মগ্ন হয়ে পড়ছে। বামা-মা মোবাইল দিতে না চাইলে অনকাক্সিক্ষত আচরণ করে শিশুরা।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাদকাসক্তি ও অবৈধ যৌন অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে হিন্দি সিরিয়ালের প্রভাব রয়েছে। পরকীয়ার কারণে স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করা হচ্ছে। এসব অপরাধের বিচার হওয়া জরুরি। বিচারের শক্ত বার্তা না থাকায় এসব অপরাধ বাড়ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীর মনকে প্রভাবিত করে। সে মনে করে, অপরাধ করলেও পার পাওয়া যাবে।
অপরাধ প্রসঙ্গে বিচার ও শাস্তির কথা উচ্চারিত হয়। এটা শুধু মানুষের আকাক্সক্ষার বিষয় নয়, সমাজ ও রাষ্ট্্রকে টিকে থাকতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। সমাজে যখন অবক্ষয় নেমে আসে, তখন মাদক, পরকীয়া, পর্নো-ভিডিও, জুয়াসহ নানা অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। এমন বাস্তবতায় সমাজে হত্যা ও নৃশংসতার ঘটনাও বেড়ে যায়। প্রশ্ন জাগে এ কেমন সমাজ, এসবের জন্যই কি আমরা সমাজবদ্ধ হয়েছিলাম? বিস্মিত হতে হয়, এত সহজে মানুষ মানুষকে হত্যা করে কেমন করে? অথচ শৈশব থেকেই আমরা শুনে এসেছি, মানুষ হত্যা মহাপাপ। ধর্মের বাণী হলো, অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করা যেন পুরো মানব জাতিকে হত্যার সমান। অথচ এমন হত্যার ঘটনা এখন প্রায় প্রতিদিনই সংঘটিত হচ্ছে। ধর্ষণের মতো কুৎসিত ঘটনার সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। ধর্ষণের পর হত্যার নৃশংস ঘটনাও ঘটছে। শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। এরপরও আমরা মানুষ! আমাদের সমাজও মাবিক সমাজ! একদিনে আমাদের এমন অধ্যঃপতন ঘটেনি! বছরের পর বছর ধরে আমরা অবক্ষয়ের ¯্রােতে বসবাস করেছি। মোহনায় এসে আমরা এখন ভয় ও আতঙ্কের কথা প্রকাশ করছি। সামনে তো ধ্বংসের মহাসমুদ্র।
সমাজের কাঠামো ও রূপ একরকম থাকে না, কারণ সভ্যতার অভিঘাত এসে যায়। পাশ্চাত্য সভ্যতা এখন পৃথিবীকে শাসন করছে, যার মূলে রয়েছে ‘সেক্যুলারিজম’ তথা ইহলৌকিকবাদিতা। এ সভ্যতায় পরকালের গুরুত্ব নেই। পরকাল তো ঈমানের বিষয়। পরকালে যারা বিশ^াস করবে, তারা প্রতিটি কাজের জন্য মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার চেতনায় সতর্ক থাকবে, শুদ্ধ জীবন-যাপনের চেষ্টা করবে। তারা মাদক গ্রহণ করবে না, দুষণযুক্ত টিভি সিরিয়াল দেখবে না, পরকীয়া করবে না, মোবাইলে পর্নো ভিডিও দেখবে না, জড়াবে না অনলাইন জুয়ায়ও। পরকালে জবাবদিহিতার চেতনায় যারা সমৃদ্ধ, তারা ধর্ষণ ও নৃশংস কর্মকা- থেকে থাকবে অনেক দূরে। মানুষ হত্যার কথা তারা ভাবতেও পারবে না। অনেকেই বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে ধর্ষণ, নৃশংসতা ও হত্যাকা-ের মতো ঘটনা বাড়ছে। অনাকাক্সিক্ষত এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণে বিচার ও কঠোর শাস্তির কথা বলা হচ্ছে। সমকাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় এসবের প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের সমাজে আইন-আদালত, পুলিশ তো রয়েছে; তারপরও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে কেন? তাহলে কি আইন-আদালত দিয়ে সব হয় না? আর আইন-আদালতের প্রসঙ্গ তো আসে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে। ঘটনা যদি না ঘটে, তাহলে কেমন হয়? এর জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধের চাষাবাস, অবক্ষয় নয়। পরকালে জবাবদিহিতার চেতনা মূল্যবোধের চারা গাছটিকে পত্রপল্লবে সুশোভিত করে তুলতে পারে। এ পথের পথিক হলে কেমন হয়?