আমানুর রহমান
জীবনের শেষ প্রহরে নিঃসঙ্গতার বেদিতে নীরবে যাঁরা বলি হন, আমাদের সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত সে মানুষদের একটি বড় অংশ হলেন বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই পাওয়া বাবারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের শুমারি অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটির বেশি। এই প্রবীণদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে বর্তমানে তিন শতাধিক বৃদ্ধাশ্রম পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে সন্তানদের অবহেলায় বয়োজ্যেষ্ঠরা আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। একসময় যিনি ছিলেন পরিবারের অর্থনৈতিক ও মানসিক মেরুদণ্ড, সময়ের বিবর্তনে ও সন্তানদের স্বার্থপরতায় তিনিই আজ ‘অপ্রয়োজনীয় বোঝা’। রক্তজল করে সন্তানদের মানুষ করা সেই বাবারাই আজ চার দেয়ালের ঘেরাটোপে জীবনের সবচেয়ে করুণ অধ্যায় পার করছেন।
সম্পদের লোভে সন্তানদের হাতে পিতা-মাতার বঞ্চিত হওয়ার বিষাদময় উপাখ্যান আজকাল বৃদ্ধাশ্রমের করিডোরগুলোতে প্রতিনিয়তই লেখা হচ্ছে। দেশে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ কার্যকর রয়েছে। আইনি সহায়তা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, প্রতিবছর অনেক বাবা-মা সন্তানদের বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য হন। তবে পারিবারিক সম্মানহানি ও সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে অধিকাংশ বাবা আইনের আশ্রয় নেওয়ার বদলে বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়াকেই নিয়তি হিসেবে মেনে নেন। সারা জীবনের কঠোর পরিশ্রমে গড়া বাড়িঘর বা সম্পদ সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পরই মূলত বাবারা তাঁদের অস্তিত্বের শেষ সম্বলটুকু হারান। সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে বিরোধ বা সন্তানদের নিজেদের পরিবারের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে শেষ বয়সে এসে তাঁদের ঘরছাড়া হতে হয়। এটি প্রমাণ করে, আমাদের সমাজে বাবারা সম্পদের মালিকানা পেলেও মানসিক আশ্রয় ও সম্মান থেকে চূড়ান্তভাবে বঞ্চিত। ঘাম ঝরিয়ে গড়া নিজের ইটের দালানে যখন নিজেরই ঠাঁই মেলে না, তখন সেই বাবার হৃদয় পরিণত হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্মশানে।
মানসিক যন্ত্রণার দিক থেকে বৃদ্ধাশ্রমের বাবারা যেন মায়েদের চেয়েও বেশি অসহায়। এর কারণ, সমাজ তাঁদের কাঁদতে শেখায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গবেষণা অনুযায়ী, বৃদ্ধাশ্রমে থাকা নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে বিষণ্নতা, একাকীত্বজনিত স্নায়ুবিক রোগ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অলিখিত শর্ত মেনে তাঁদের সব কষ্ট বুকের ভেতরেই চেপে রাখতে হয়। সন্তানদের অবহেলার কথা একজন মা হয়তো কাঁদতে কাঁদতে প্রতিবেশীদের কাছে বলতে পারেন; কিন্তু একজন বাবা আজীবন ধরে রাখা ‘কঠোর ও সহনশীল’ পুরুষের আবরণ সরাতে পারেন না। ফলে তাঁর ভেতরের হাহাকার অগোচরেই থেকে যায়। এই অবদমিত যন্ত্রণা তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে দ্রুত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, যা এক অর্থে আমাদের মানবিক সভ্যতারই চরম ব্যর্থতা। রাতের নিস্তব্ধতায় বালিশে মুখ গুঁজে ফেলা কয়েক ফোঁটা চোখের জলই হয়তো একসময়ের সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী পুরুষের অসহায়ত্তের একমাত্র সাক্ষী।
একটি সুস্থ সমাজ কখনোই তার স্থপতিদের অবহেলায় ছুড়ে ফেলতে পারে না; অথচ আমরা নির্দ্বিধায় সেই কাজটিই করে যাচ্ছি। জাতীয় বাজেটে বয়স্ক ভাতা ও বৃদ্ধাশ্রমগুলোর মানোন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসনে ব্যয়ের হার অত্যন্ত নগণ্য, যা তাঁদের মৌলিক মর্যাদা রক্ষায় মোটেও যথেষ্ট নয়। সন্তানদের কাছে পিতা-মাতার যত্ন নেওয়া যদি কেবল ‘আইনি বাধ্যবাধকতা’ হয়ে দাঁড়ায়, তবে পারিবারিক ভালোবাসার পবিত্র বন্ধনটি চিরতরে হারিয়ে যাবে। তরুণ প্রজন্মকে এই ধ্রুব সত্যটি মনে রাখতে হবে- সময়ের চাকা প্রতিনিয়ত ঘুরছে। আজকের যুবকই আগামীকালের সেই বৃদ্ধ বাবা, যাকে হয়তো কোনো এক বৃদ্ধাশ্রমের জানালায় বসে পথের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, ঢাকা।