জসিম উদ্দিন মনছুরি

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শত শত নিরীহ মানুষকে কন্ঠ রুদ্ধ করতে জেলে বন্দী করে রাখা হয়। বর্তমান বিএনপি সরকার ও বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জনগণের বিরুদ্ধে কোন কালো আইন করবে না মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনের বিকল্প নেই। জনগণের স্বার্থে আইন প্রণয়ন করা হয়। আইনের জন্য জনগণ নয় বরং জনগণের জন্যই আইন। গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি। যেহেতু জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস সুতরাং সরকার সব সময় জনগণের কাছেই দায়বদ্ধ। সরকারের সমালোচনা সরকারকে সুসংগঠিত ও ভুল ত্রুটি হতে নিরাপদ রাখে। যে কোন জনগণ চাইলে তার স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে পারেন। স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে পারা তার মৌলিক অধিকার। তবে সমালোচনা হতে হবে আক্রোশের বশবর্তী হয়ে নয় বরং শুধরে দেয়ার উদ্দেশ্যে। কারো চরিত্রহনন কিম্বা ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে সমালোচনা করা যাবে না। সকল জনগণের অধিকার রয়েছে সরকারের সমালোচনা করার। গণমাধ্যমে স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার রাষ্ট্রের যে কোন নাগরিকের রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে জনগণের স্বাধীন মতামতের অধিকার বা চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতা ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সংরক্ষিত। এই অনুচ্ছেদের অধীনে প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা নৈতিকতার স্বার্থে আইন দ্বারা এই অধিকারের ওপর যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯(১) এ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৩৯(২) এ বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের কণ্ঠ রুদ্ধ করার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে বিতর্কিত আইন পাস করে জনগণের বাক স্বাধীনতা হরণ করেছিল। জনগণের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে বিতর্কিত আইন পাস করে জনগণের স্বাধীন মতামত প্রকাশের উপর কঠোরতা আরোপ করেছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ (ডিএসএ) মূলত ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ দমন, প্রতিরোধ ও বিচারের জন্য প্রণীত হয়েছিল। যাতে রাষ্ট্র, সমাজ ও সাইবার নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত ও আলোচিত ধারাগুলো হলো ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১ এবং ৩২, যা মূলত তথ্য প্রকাশ, রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি, মানহানি, ধর্মীয় অনুভূতি ও সরকারি গোপনীয়তা সংক্রান্ত।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রধান ও আলোচিত ধারাগুলো-ধারা ১৭: সাইবার সন্ত্রাসবাদ বা ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো অবৈধ প্রবেশ বা (sabotage) করলে। ধারা ২১: বাংলাদেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণার জন্য শাস্তি। ধারা ২৫: ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা বিরক্তিকর তথ্য ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠানো বা প্রকাশ করা। ধারা ২৭: সাইবার সন্ত্রাসমূলক অপরাধ বা বৈধ প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করার অপরাধ। ধারা ২৮: ডিজিটাল মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার। ধারা ২৯: ওয়েবসাইটে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করা। ধারা ৩১: ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা, বিদ্বেষ বা শত্রুতা সৃষ্টি করা। ধারা ৩২: সরকারি গোপনীয়তা বা অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের অধীনে অপরাধ ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত হলে। ধারা ৩৪-৩৮: হ্যাকিং, কম্পিউটার সিস্টেমের ক্ষতিসাধন, বা অপরাধের উদ্দেশ্যে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার।

বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ সালে প্রণীত এই বিতর্কিত আইনটি ২০২৩ সালে রহিত করা হয় এবং এর পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ কার্যকর করা হয়। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বহুল বিতর্কিত এই আইনের বেশ কয়েকটি ধারা সংশোধন করে সাইবার সুরক্ষা আইন নামে একটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেন। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ (Cyber Security Ordinance 2025) বাংলাদেশের একটি নতুন আইন যা বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর পরিবর্তে ২১ মে ২০২৫ সালে জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশটি বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আগের আইনের ৯টি কঠোর ধারা (defamation, misinformation, ইত্যাদি) বাতিল করেছে এবং সাইবার অপরাধের জন্য জামিনযোগ্য বিধান তৈরি করেছে। প্রধান পরিবর্তন ও বৈশিষ্ট্যসমূহ-সাইবার সুরক্ষা আইনের ৯টি বিতর্কিত ধারা বাতিল করা হয়। যেমন: ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১ এবং ৩৪। যার ফলে প্রায় ৯৫% মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। এই অধ্যাদেশটিতে সহজে জামিন, বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত অধিকাংশ অপরাধ এখন জামিনযোগ্য করা হয়েছে। এআই-ভিত্তিক অপরাধ: দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনকে এই আইনে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সাইবার সন্ত্রাস দমন: গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোয় হ্যাকিং, ডিজিটাল জালিয়াতি, ই-লেনদেন জালিয়াতি, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো, যৌন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি: জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি গঠনের মাধ্যমে সাইবার স্পেসে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করা। শাস্তি: গুরুতর অপরাধে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই অধ্যাদেশটির মাধ্যমে আগের আইনের অপপ্রয়োগ ও নিপীড়নের ক্ষেত্রগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ সহ মোট ৫টি ধারা বিলুপ্ত করে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তে, বাংলাদেশের সংসদে কণ্ঠভোটে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ পাস হয়। এ আইনটি প্রস্তাবের পর গণমাধ্যমকর্মী এবং সামাজিক মাধ্যমের কর্মী সহ বিভিন্ন মহলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। তাদের মতে ৫৭ ধারায় অপরাধের ধরণগুলো একসঙ্গে উল্লেখ ছিল, নতুন আইনে শুধুমাত্র সেগুলো বিভিন্ন ধারায় ভাগ করে দেয়া হয়েছে। ৩২ ধারায় সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন সাংবাদিকরা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন প্রথম করা হয় ২০০৬ সালে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে শাস্তি বাড়িয়ে আইনটিকে আরও কঠোর করা হয়।

৫ এপ্রিল, ২০২৬ রাত আনুমানিক ১১টা নাগাদ সাইবার অ্যাক্ট মামলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক নারী কর্মীকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ সমালোচনার ঝড় ওঠে। গ্রেপ্তারকৃত ওই নারীর নাম বিবি সাওদা (৩৭)। তিনি ভোলা পৌরসভার জামায়াতে ইসলামীর মহিলা কর্মী বলে জানা যায়। ওই নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তিনি সরকারের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট করেন। পোস্টে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারের সমালোচনা করেন। এর জেরে ওই নারীকে গ্রেফতারের ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমসহ দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ওই নারী অভিযোগ করেন তাকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে তার যথাযথ কারণ পুলিশ উল্লেখ করতে পারেনি। তারা বলেছেন উপরের নির্দেশে তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এতদিন যেভাবে আওয়ামী লীগ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দোহাই দিয়ে জনগণকে কোণঠাসা করে রাখত অনেকেই বিএনপি সরকারের এই কর্মকান্ডে তারই পুনরাবৃত্তি কিনা সংশয় প্রকাশ করেছেন। এই ঘটনাটি অবশেষে সংসদ পর্যন্ত গড়ায়। সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এমপি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ওই নারীকে আটকের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং তাকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দেয়ার দাবি জানা। অবশেষে সরকার বাধ্য হয়ে ওই নারীকেই ৭ এপ্রিল মুক্তি দেন।

ওই নারীকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত। তবে অতীতে এ ধরনের আইনের অপব্যবহার করে বাকস্বাধীনতা দমন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা। বক্তারা আরও বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী গণতান্ত্রিক পরিবেশে মানুষের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ থাকার কথা থাকলেও, ভোলার এই গ্রেপ্তার সেই প্রত্যাশার পরিপন্থি।’ অভিযোগ করা হয়, কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ ছাড়াই তাকে আটক করা হয়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী মতকে দমনের জন্য বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ করে সাধারণ জনগণকে স্তব্ধ করে রেখেছিল। জুলাই সনদের অঙ্গীরাবদ্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার গঠন করা বিএনপি যেন আওয়ামী লীগের পথে পরিচালিত না হয় এমনটাই প্রত্যাশা করেন দেশের জনগণ। জনগণের কাছে যেন সরকারের জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়, এ বিষয়টি বিএনপি সরকারের ভেবে দেখা উচিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সীমাহীন জুলুম-নির্যাতনে জনগণ দিশাহারা হয়ে পড়েছিল। অবশেষে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। সরকার যেন এই বিষয়টি মাথায় রেখে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়। স্বাধীন মতামত প্রকাশে যেন বাঁধা প্রদান না করে এমনটাই সচেতন নাগরিকের দৃঢ় প্রত্যাশা। গণতান্ত্রিক সরকার মানে জবাবদিহিতার সরকার ; দায়বদ্ধতার সরকার। বিএনপি সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের অপপ্রয়োগ না করে জনগণের পালস বুঝে স্বাধীন মতামত প্রকাশে যেন বাধার সৃষ্টি না করে এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : কথা সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।