মোঃ রাশেদুল হাসান

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রাজনীতিতে আরেকটি নাম এখন বারবার উঠে আসছেÑ চীন। আপনি যদি ভাবেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুধু এ দু’দেশের লড়াই, তাহলে ছবিটা পুরোটা দেখা হয়নি। কারণ এ সংঘাতের আড়ালে চীন আছেÑকখনও নীরব পর্যবেক্ষক, কখনও কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী, কখনও আবার নিজের স্বার্থরক্ষায় হিসাবি খেলোয়াড়। এ সংঘাতের ভেতর চীনের লাভ, ক্ষতি আর কৌশল বুঝতে হলে আপনাকে তাকাতে হবে যুদ্ধের বাইরে, বড় শক্তিগুলোর ক্ষমতার মানচিত্রে। সে ছবিটাই আমরা এবার একটু কাছ থেকে দেখব।

চলমান মার্কিন-ইরান সংঘাতের পটভূমিতে চীনকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি উঠছে, তা হলোÑ বেইজিং কি ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে এ যুদ্ধের গতিপথ বদলাতে পারবে, নাকি সে কেবল নিজের স্বার্থরক্ষার কৌশলই চালাবে? সাম্প্রতিক সংবাদ, বিশ্লেষণ এবং প্রকাশ্য বক্তব্যের আলোকে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত উত্তর হলো: চীন যুদ্ধের সরাসরি অংশ নয়, কিন্তু যুদ্ধের পরিণতি নির্ধারণে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

এ গুরুত্ব বোঝার জন্য আগে চীন-ইরান সম্পর্কের প্রকৃতি বুঝতে হবে। সম্পর্কটি দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত, তবে জোটভিত্তিক নয়। ২০২১ সালের ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তি এ সম্পর্ককে আরও আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়Ñ যেখানে জ্বালানি, বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। কিন্তু এ অংশীদারিত্বের ভেতরে একটি মৌলিক সতর্কতা আছে। চীন ইরানকে ব্যবহারযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখে, একক নিরাপত্তা-দায়বদ্ধ মিত্র হিসেবে নয়। ফলে যখনই সংঘাত তীব্র হয়, বেইজিং এমন এক অবস্থান নেয়, যেখানে ইরানকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়াও হয় না, আবার ইরানের জন্য প্রকাশ্য সামরিক প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয় না ।

চীনের এ নীতির কারণ স্পষ্ট। ইরান চীনের জন্য জ্বালানি-নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনৈতিক উপস্থিতি ধরে রাখতেও ইরানের প্রয়োজন আছে। কিন্তু একই সঙ্গে চীন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরাইল এবং পশ্চিমা বাজারের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তাই চীন কখনোই ইরানের পক্ষে এমনভাবে যেতে চায় না, যাতে তার বৃহত্তর বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ বিপদে পড়ে। এই ভারসাম্য-নীতি তাকে কার্যত একধরনের দ্বিমুখী অবস্থানে দাঁড় করায়Ñ প্রকাশ্যে শান্তির পক্ষে, আড়ালে স্বার্থ-নির্ভর।

চলমান মার্কিন-ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ সম্পর্কের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তার অভিঘাত শুধু তেহরান বা ওয়াশিংটনে সীমাবদ্ধ থাকে না; তেলের দাম, সমুদ্রবাণিজ্য, বীমা খরচ, পরিবহন রুট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপরও চাপ পড়ে। চীন বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা তার জন্য কৌশলগতভাবে অপরিহার্য। ফলে বেইজিং চাইবে না যে ইরান সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ুক, আবার চাইবে না যুদ্ধ এতটা দীর্ঘায়িত হোক যে বৈশ্বিক অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে পড়ে। এই দ্বৈত স্বার্থই চীনের ভূমিকা নির্ধারণ করছে।

প্রকাশ্যে চীন নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেইজিং যুদ্ধবিরতি, সংলাপ এবং কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছে। কিছু সংবাদে এমনও বলা হয়েছে যে চীন পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে সমঝোতার পথ খোঁজার চেষ্টা করেছে। এই সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে বোঝা যায় চীন শুধু পর্যবেক্ষক নয়; সে সংঘাতের কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে চায়। তবে এখানেও সীমা আছে। চীন ইরানের ওপর চাপ দিতে পারে, কিন্তু তাকে এমন পর্যায়ে ঠেলে দিতে পারে না, যাতে তেহরান পুরোপুরি পশ্চিমা শিবিরের কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য হয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিও এ সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখে। ওয়াশিংটন ইরানকে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপে রাখতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়াতেও চায়। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করে, ইরানের ওপর কঠোর চাপ রাখলে আঞ্চলিক প্রতিরোধ জোরদার হয়। আবার অন্য অংশ মনে করে, দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই বেশি চাপ ফেলবেÑঅর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কৌশলগতÑএবং এতে চীনই লাভবান হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও দ্বিধাবিভক্ত: ইরানকে দুর্বল করতে চায়, কিন্তু যুদ্ধকে এমন পর্যায়ে নিতে চায় না, যেখানে চীন কূটনৈতিকভাবে বাড়তি সুবিধা পেয়ে যায়।

এ প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফর আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক সংবাদে দেখা যায়, সফরের আলোচনায় ইরান ইস্যু স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, এবং ট্রাম্প নিজেও চীনের সহায়তা চেয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কম নয়। কারণ, যদি বেইজিং সত্যিই ইরানের ওপর কিছুটা চাপ দিতে রাজি হয়, তাহলে যুদ্ধের টানাপোড়েন নরম হতে পারে। তবে চীন এখানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে কাজ করবেÑ এমন ভাবা ভুল হবে। চীন সবসময় নিজের স্বার্থের ভেতর থেকে পদক্ষেপ নেয়। ফলে ট্রাম্পের সফর যুদ্ধ থামানোর চেয়ে যুদ্ধের কূটনৈতিক পরিসর বদলাতে বেশি সক্ষম হতে পারে।

চীনের ভূমিকা কেন এত জটিল, তা বুঝতে হলে “গোপন” সম্পর্কের দিকেও তাকাতে হয়। সংবাদমাধ্যমে বারবার এসেছে, চীন ইরানকে এমন কিছু সহায়তা দিতে পারে, যা প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয় নাÑ বিশেষত জ্বালানি, কাঁচামাল, প্রযুক্তি-উপাদান এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানো বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। কিছু প্রতিবেদনে সামরিক উপাদান বা ক্ষেপণাস্ত্র-সংক্রান্ত কাঁচামাল পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে। কিন্তু এসব দাবি বহু ক্ষেত্রে গোয়েন্দা-সূত্রনির্ভর, এবং সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই এমন অভিযোগকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। বরং বলা যেতে পারে, চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের একটি অংশ অস্বচ্ছ, এবং সেটিই পশ্চিমা উদ্বেগের বড় কারণ।

এ অস্বচ্ছতার মধ্যেও একটি ব্যাপার নিশ্চিত, চীন ইরানকে একা ফেলতে চায় না। কারণ তেহরানের পতন বা অতিরিক্ত দুর্বলতা বেইজিংয়ের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। যদি ইরান অস্থির হয়ে পড়ে, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেলের সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়বে, আর যুক্তরাষ্ট্র সেই সুযোগে অঞ্চলটিতে আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারে। এ কারণে চীন ইরানকে টিকিয়ে রাখে, কিন্তু এতটুকুইÑ যাতে ইরান একেবারে ভেঙে না পড়ে, আবার এমন শক্তিও না হয় যে চীনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

ইরানের দৃষ্টিতে চীনের গুরুত্ব অপরিসীম। নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ সীমিত হওয়ায় চীন তার জন্য বড় বাণিজ্যিক বিকল্প। যুদ্ধের সময়ে এই বিকল্প আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে, কারণ ইরান তখন শুধু অস্ত্র আর জ্বালানির প্রশ্নে নয়, টিকে থাকার প্রশ্নেও চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু এ নির্ভরতাই ইরানের দুর্বলতা। চীন সবসময় শেষ পর্যন্ত ইরানের নিরাপত্তা-গ্যারান্টি দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে তেহরানের কাছে চীন একদিকে আশ্রয়, অন্যদিকে সীমাবদ্ধতা।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীনের এ ভূমিকা আবার একধরনের দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে, চীন যদি যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত হয়, তাহলে ওয়াশিংটন সরাসরি চাপ কমাতে কিছুটা সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে, যদি চীন ইরানকে পরোক্ষভাবে টিকিয়ে রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এ দ্বৈত বাস্তবতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে কখনো সম্ভাব্য সহায়ক, কখনো কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে।

সব মিলিয়ে চীন-ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের লাভ-ক্ষতির হিসাব সাদামাটা নয়। চীন লাভ করে সময়, প্রভাব এবং মধ্যস্থতার সুযোগ; কিন্তু ক্ষতিও পায় বৈশ্বিক অস্থিরতা ও জ্বালানি ঝুঁকিতে। ইরান পায় কূটনৈতিক আশ্রয় এবং বাণিজ্যিক বিকল্প; কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় যুদ্ধের সরাসরি অভিঘাতে। যুক্তরাষ্ট্র পায় চাপ প্রয়োগের কৌশলগত সুবিধা; কিন্তু এর বিনিময়ে বহন করতে হয় দীর্ঘ যুদ্ধের রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক খরচ।

সুতরাং, এ সংঘাতে চীন কোনো নিরপেক্ষ দর্শক নয়, আবার কোনো প্রকাশ্য যুদ্ধপক্ষও নয়। সে এমন এক শক্তি, যে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে নিজের প্রভাব বাড়াতে চায়, কিন্তু নিজের ওপর ঝুঁকি নিতে চায় না। যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে চীনের ভূমিকা হলো “সীমিত সহায়তা, কূটনৈতিক দরকষাকষি, এবং কৌশলগত সতর্কতা”Ñ যার উদ্দেশ্য যুদ্ধ থামানো নয় শুধু, বরং যুদ্ধের পরিণতিতে নিজের জায়গা নিশ্চিত করা ।

ট্রাম্পের চীন সফর এ সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে সেটি নাটকীয় মোড় নেবে কি না, তা নির্ভর করছে চীন কতটা বাস্তব চাপ দিতে প্রস্তুত, যুক্তরাষ্ট্র কতটা সমঝোতায় যেতে চায়, আর ইরান নিজের বর্তমান যুদ্ধক্ষমতা ও কূটনৈতিক অবস্থানকে কতটা টিকিয়ে রাখতে পারে তার ওপর। আপাতত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মূল্যায়ন হলোÑচীনের ভূমিকা যুদ্ধের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু একাই যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারবে না।

চূড়ান্ত সত্যটি তাই খুবই স্পষ্টÑএ যুদ্ধের কেন্দ্রে বন্দুক আছে, কিন্তু তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে জ্বালানি, বাজার, কূটনীতি এবং ক্ষমতার হিসাব। আর সেই হিসাবের সবচেয়ে দক্ষ খেলোয়াড়দের একজন এখন চীন।

লেখক : সাংবাদিক।