আজ ঐতিহাসিক ‘মে দিবস’। খেটেখাওয়া মানুষের সংগ্রাম ও তাদের আয় উপার্জনকে একটা নিয়ম নিগড়ের মধ্যে আনার লক্ষ্যেই আজ থেকে বহু বছর আগে কর্মজীবী শ্রেণী তথা শ্রমিকরা সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন। বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনের এ সংগ্রাম এবং তার অর্জনকে স্মরণ করতে প্রতিবছর পয়লা মে বিশ্বজুড়ে মে দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। কিন্তু দিবসটির তাৎপর্য বাংলাদেশে কি ধারণ করা গেছে, শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা গেছে বা মাস শেষে তাদের মজুরিটি কি সঠিকভাবে আদায় হচ্ছে? এসব প্রশ্ন কিন্তু রয়েই গেছে।

প্রশ্ন রয়ে গেছে বাংলাদেশে শ্রমিক স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে কি না, তাদের জীবন-মানের কার্যত কোন উন্নতি ঘটেছে কি না। শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকানোর আগে তার পারিশ্রমিক প্রদানের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহর (স) একটি বাণীর কথা আমরা স্মরণ করতে পারি। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করো তার ঘাম শুকানোর আগেই’ (বায়হাকি, মিশকাত)। ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অনেক। কিন্তু তার প্রতিফলন কতটা দেখতে পাই সেটাই প্রশ্ন। এর কারণগুলো বিশ্লেষণ করতে গেলে অনেকটা হতাশ হতে হয়। কারণ তা অর্জিত হয়নি। প্রতি বছর মে দিবস আসে আর যায় কিন্তু এসব বিষয় অধরাই থেকে যাচ্ছে।

আমরা দেখতে পাই দিবসটির শেকড় রয়েছে শ্রমিকদের ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্যে, যারা উন্নত কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকারের জন্য লড়াই শুরু করেছিলেন আধুনিক রাষ্ট্র বলে কথিত আমেরিকায়। সেই ইতিহাসটি কিন্তু মর্মান্তিক। শ্রমিকরা সে দিন প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন অকাতরে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে পয়লা মে জাতীয় ছুটির দিন।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শহীদদের আত্মত্যাগ এই ঘটনার মূলে। সেদিন দৈনিক আট ঘণ্টার কাজের দাবিতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিলেন। জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওইদিন তাদের জীবনদানের মধ্যদিয়ে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় নেমে আসে ৮ ঘণ্টায়। অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এ দিনকে তখন থেকেই সারা বিশ্বে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ১৮৮৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব সোশ্যালিস্ট গ্রুপস এবং ট্রেড ইউনিয়নস যৌথভাবে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

বর্তমানে মে দিবস সারা বিশ্বের শ্রমিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে এবং জগতের সব শ্রমিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্দোলনের প্রেরণা হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য চলমান লড়াই বাস্তবায়নের ক্ষেত্র প্রসারিত করছে। মে দিবসের এই চেতনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামে শ্রমিক আন্দোলনের ভূমিকার সঙ্গে জড়িত। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে, বাংলাদেশের শ্রমিকরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছ থেকে উন্নত মজুরি এবং কর্মপরিবেশের দাবিতে ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এটি দেশে প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে এবং শ্রমিকদের মধ্যে সংহতিবোধ এবং আন্দোলনের স্পৃহা বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালে স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলনে শ্রমিক মজুরদের দেখা গেছে সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে অকাতরে জীবন দিতে। সুতরাং তাদের অবদানকে গুরুত্ব্সহ ভাবতে হবে, মূল্যায়ন করতে হবে।

স্বৈরশাসক হাসিনার পতনের পর গণতান্ত্রিক সরকারের শাসনামলে এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে মে দিবস পালিত হচ্ছে। দিনটি পালনে রাষ্ট্রীয়ভাবে একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সমাবেশসহ বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে দিবসটির তাৎপর্য কি আমরা পুরোপুরি অনুধাবনে সক্ষম হয়েছি। শ্রমিক স্বার্থ কি রক্ষিত হচ্ছে?

বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। এখনো গার্মেন্ট শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে রাস্তা অবরোধ করতে বাধ্য হয়। বেতন কম দেয়া হয়, নারী ও পুরুষ শ্রমিকের বেতন বৈষম রয়ে গেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাদের জীবনমানকে পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। খেটেখাওয়া শ্রমিকরা দিনকার রুজি অর্জনে প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও যথাযথ প্রাপ্তিটা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লেখাপড়া শেষ করেও বহু ছাত্র বেকার। তাদেরও শ্রমজীবীর ভূমিকায় নামতে হচ্ছে। কৃষক তার পণ্যের যথাযথ মূল্য পাচ্ছেন না।

শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্কের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে মে দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। শ্রমিক ও মালিক পরস্পরের পরিপূরক, আর তাদের যৌথ প্রচেষ্টাই একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে । এ দেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে হলে ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আস্থার পরিবেশ সুদৃঢ় করতে হবে। একথা আমরা শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

বিশিষ্টজনেরা বলেন, আমরা যদি ঐক্য ও সহযোগিতার ধারা অব্যাহত রাখি, তাহলে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তব হয়ে উঠবে। আমরা সেই আশায় বলিয়ান হতে চাই।

আজকের বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শ্রমশক্তির আবাসস্থল। লাখ লাখ শ্রমিক বিভিন্ন শিল্প, যেমন- জুট, টেক্সটাইল, বিভিন্ন শিল্প কৃষিসহ রকমারি উৎপাদনে কাজ করছে। পোশাক রফতানিকারক শিল্প হিসেবেও বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপর্ণ। এটি দেশের অন্যতম প্রধান রফতানি খাত এবং বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের প্রধান উৎস। তবে অধুনা ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন ক্রমশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমিকদের অবস্থা এখন ভয়ের মুখে পড়েছে। অনেক শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলে তাদের জীবনেও নেমে আসতে পারে অমানিশার অন্ধকার। সরকারের তরফ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ তাই জরুরী। তাদের মাধ্যমে অর্জিত রেমিটেন্স দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন হিসেবে চিহ্ণিত। ফলে মে দিবসে তাদের কথাও ভাবতে হবে।

আগেই বলেছি, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অপর্যাপ্ত মজুরি, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সীমিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক কর্মী অস্থায়ী ভিত্তিতে নিযুক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্যবিমা, অসুস্থতাজনিত ছুটি এবং সবেতনের ছুটির মতো মৌলিক কর্মসংস্থান সুবিধার আওতার বাইরে থাকে। অনেকেই অনিরাপদ পরিস্থিতিতেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। তাছাড়া, শ্রম আইন ও প্রবিধান কার্যকর করার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব পরিলক্ষিত হয়। এছাড়াও শ্রমিক অধিকারকর্মী এবং ইউনিয়ন নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ক্ষুদ্র স্বার্থের রাজনীতি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের হয়রানি বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে। মাস শেষে বেতনটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় তারা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে বাধ্য হয়।

মে দিবসের মূল চেতনাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এবং নিয়োগকর্তা ও সরকারের কাছে উন্নত মজুরি, উন্নত চিকিৎসা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ ব্যাপারে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও তা বাস্তবতার সাথে সামঞ্চস্যপূর্ণ নয়।

মে দিবস বিশ্বের শ্রমিকদের জন্য সংহতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বার্তা বহন করে। ফলে তা আজও প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান শতাব্দীর রকমারি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সঙ্গে সঙ্গে মে দিবস শ্রমিকদের অধিকারের জন্য চলমান সংগ্রাম এবং আরও ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত সমাজের জন্য লড়াইয়ের গুরুত্বের দ্যোতক হিসেবে কাজ করে। সমাজে শ্রমিকদের মৌলিক ভূমিকার স্বীকৃতি এবং তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান মে দিবসের প্রধান তাৎপর্য হওয়া উচিত। কিন্তু সে ক্ষেত্রে অর্জন কতখানি তা বিশ্লেষণ ও বিচারের সময় এসেছে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ সরকারের কাছে জনগণ বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের চাওয়াটা তাই অমূলক নয়। শ্রমিক স্বার্থ রক্ষায় সরকারের অনেক কিছু করার রয়েছে, বিগত স্বৈারাচারী সরকার যা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

মে দিবসের শ্রমিক জাগরণ সমস্যাগুলোর সমাধান নিশ্চিত করে শ্রমিকদের প্রাপ্য মর্যাদা ও যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের পথ সুগম করে। তাই মে দিবসের তাৎপর্য আগের চেয়ে বেশি বৈ কম নয়। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় পুঁজির দ্রুত বিকাশের পাশাপাশি শ্রমের সঙ্গে যুক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অস্তিত্বের লড়াইয়ে মে দিবসের কথাই আসে বার বার। ধনীর সম্পদে দরিদ্রেরও অধিকার রয়েছে, হক রয়েছে। সেটা বন্টনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত হতে পারে। মে দিবস শ্রমিক স্বার্থ নিশ্চিত করণে ভাল ভূমিকা রাখতে পারে। সে দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করা জরুরী। শুধু মাত্র দিবস পালনের মধ্যে এর আসল তাৎপর্য নিহিত নয়, একথাটি বুঝার সময় এসেছে। তবে অব্যাহত নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসাবে শ্রমিকদের বিকশিত হওয়ার যে তাগিদ দেয় মে দিবস তার তাৎপর্যও অনেক।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।