আসিফ আরসালান

গত ১৭ মে বিএনপি সরকারের ৩ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এ ৩ মাসে দেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই বলা হয়নি। এর মাঝে একবার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হলো সবার আগে বাংলাদেশ। সাধারণভাবে এ রকম কথার বিপক্ষে বলার কিছু নেই। তবে বাংলাদেশের যে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান সে পটভূমিতে ঐ ৩ শব্দের একটি বাক্যে সব কিছু পরিষ্কার হয় না। এটা আরো এজন্যই বলা দরকার যে, শেখ হাসিনার আমলেও ঐ ধরনের কথাই বলা হতো। শেখ মুজিবের সময়ও পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হিসাবে বলা হতো, সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়। শেখ মুজিবের আমলে আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করে ছিলো ৩ বছর ৮ মাস। আর শেখ হাসিনা দেশ শাসন করেছেন প্রথম মেয়াদে ৫ বছর এবং পরে ধারাবাহিকভাবে ৩টি মেয়াদ, অর্থাৎ একটানা ১৫ বছর। শেখ হাসিনা মোট ৪টি মেয়াদে দেশ শাসন করেছেন ২০ বছর। পিতা ও কন্যা উভয়ের মেয়াদে আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করেছে ২৩ বছর ৮ মাস। এ ২৩ বছর ৮ মাসে অনেকবার বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল সুর হলো সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়।

কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখলাম? শেখ মুজিবের আমলেই সম্পাদিত হয় ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদি গোলামী চুক্তি। শেখ মুজিবের আমলেই বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বার্থবিরোধী ফারাক্কা চুক্তি। ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা চালু হচ্ছে- এমন ধোঁকাবাজি করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সে যে ফারাক্কা বাঁধ চালু করেন তারপর আর তার বিরাম নেই। অবশেষে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের সাথে ৩০ বছর মেয়াদি এমন এক পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যার ফলে এককালের প্রমত্ত পদ্মা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এছাড়া শেখ হাসিনা তার ১৫ বছর মেয়াদি একটানা শাসনে বাংলাদেশকে যে ভারতের করদরাজ্য বানিয়ে রাখেন সেটি তো এখন সমগ্র দেশবাসী জানেন। সেজন্যই তাকে ঝাড়েবংশে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে।

ভারতের সবচেয়ে বড় যে সমস্যা, যেটি ভারতের ভৌগোলিক সংহতির ওপর প্রচণ্ড হুমকি সৃষ্টি করেছিলো, শেখ হাসিনা সে উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রাম স্তব্ধ করায় ভারতের দক্ষিণ হস্তের ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া হাসিনা আমলের ১৫ বছরে সকলের সাথে বন্ধুত্ব নয়, একটিমাত্র দেশ অর্থাৎ ভারতের সাথেই শুধু বন্ধুত্ব, সে নীতি অব্যাহতভাবে বাস্তবায়ন করে যান। সুতরাং আজ যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সবার আগে বাংলাদেশ বলে পররাষ্ট্রনীতির ব্যাখ্যা দেন তাতে অন্তত শিক্ষিত সচেতন মানুষ সন্তুষ্ট হতে পারেন না। তাকে পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে আরো সুনির্দিষ্ট কথা ও কাজ করতে হবে।

আজ যেসব কথা বলছি, তার সুনির্দিষ্ট একটি পটভূমি রয়েছে। আগেই বলেছি যে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বিগত ১৫ বছরে ভারতের একটি তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেন। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণ দামাল ছেলেরা গণমানুষকে সাথে নিয়ে ভারতের নাগপাশ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিগত ১৮ মাসে বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। তাই দেখা যায়, ড. ইউনূসের আমলে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব পাওয়ার জন্য আমেরিকা এবং চীনের মতো বর্তমান বিশ্বের ২ সুপার পাওয়ার কত বিপুলভাবে আগ্রহী। ভারতের সাথে সম্পর্ক বিগত ১৮ মাসে এক কথায় বলতে গেলে হয়েছিলো অনেক তিক্ত । এই তিক্ততার জন্য মূলত ভারতই দায়ী ছিলো। কিন্তু ভারতের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটার নীট ফলাফলে দেখা যায় যে, আখেরে লাভবান হয়েছে বাংলাদেশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারত।

তাই দেখা যায়, সে ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে সম্পর্ক রিপেয়ার করার জন্য ভারতের সে কী আকুল আগ্রহ। বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তিকালের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপি চেয়ারম্যানের কাছে শোকবার্তা প্রেরণ করেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। বেগম জিয়ার মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করার জন্য নরেন্দ্র মোদি শুধুমাত্র শোকবাণীই পাঠাননি, বরং সে বার্তা বহন করে ঢাকা আসেন তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবং তারেক রহমানের সাথে তিনি দেখা করেন। তারেক রহমানের সরকার যখন শপথ গ্রহণ করে তখন নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে সে শপথ অনুষ্ঠানে প্রেরণ করেন এবং তারেক রহমানের হাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কংগ্র্যাচুলেটরি ম্যাসেজ তুলে দেন।

বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য নরেন্দ্র মোদি এবার বাংলাদেশে এক প্রবীণ পলিটিশিয়ানকে হাই কমিশনার হিসাবে বাংলাদেশে পাঠান। তার নাম, দিনেশ ত্রিবেদী। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে দিনেশ ত্রিবেদীই প্রথম ব্যক্তি যিনি ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট নন, পলিটিশিয়ান। এর আগে ভারত যত হাইকমিশনার পাঠিয়েছে তাদের মধ্যে দিনেশ ত্রিবেদী ছাড়া আর সকলেই ছিলেন ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট। বাবু দিনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আস্থাভাজন ব্যক্তি। তিনি ছিলেন ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী। তিনি একজন অভিজ্ঞ পোড় খাওয়া পলিটিশিয়ান। ড. ইউনূসের আমলে বাংলা-ভারত সম্পর্কের ওপর দিয়ে যে ঝড় ঝাপটা গেছে তার পরবর্তী ধকল দিনেশ ত্রিবেদীর মতো অভিজ্ঞ পলিটিশিয়ান সামলাতে পারবেন বলে ভারত মনে করে।

এখন প্রশ্ন হলো, আসুন, আমরা অতীত ভুলে যাই এবং নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলি-একথা বললেই কি বাংলা ভারত সম্পর্ক রাতারাতি উন্নত হবে? আমরা জানি না বিএনপি সরকার কিভাবে বাংলা-ভারত সম্পর্ক হ্যান্ডেল করবেন? সম্পর্ক মেরামত করে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারতের টপ প্রায়োরিটি কী, সেটি গত কয়েক দিন আগে কিছুটা আঁচ করা গেছে। বাংলাদেশ থেকে ২৬ জনের একটি গণমাধ্যম প্রতিনিধি দল ৩ থেকে ৯ মে এক সপ্তাহের জন্য ভারতের মুম্বাই ও দিল্লী সফর করেন। অবশ্য এই সফরটি স্পন্সর করেছিলো ভারত সরকার। সফর শেষে ঐ প্রতিনিধি দলের দু একজন সদস্য সেই সফরের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তাদের পত্র পত্রিকা বা টেলিভিশনে দিয়েছেন।

যাদের সাথে এ প্রতিনিধি দল ভারতে বৈঠক করেন তাদের মধ্যে একজন হলে পঙ্কজ শরণ। তিনি বাংলাদেশে ভারতের হাই কমিশনার ছিলেন। এছাড়া তিনি ভারতের নিরাপত্তা বিভাগে অজিত দোভালের অধীনে দু’নম্বর ব্যক্তি হিসাবে কাজ করেছেন। আলোচ্য বৈঠকে আলোচনা প্রসঙ্গে পঙ্কজ শরণ এক ফাঁকে বলেই ফেলেন যে, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের মূলভিত্তি হবে ভারতের নিরাপত্তা।

বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে কোথায়? ড. ইউনূসকে ধন্যবাদ, তার কারণেই এবং তার অনুসৃত নীতির কারণেই বিগত ৫ দশক বা ৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক সর্বোত্তম। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চীন দু’হাত বাড়িয়ে বাংলাদেশকে আলিঙ্গন করেছে। তারা শুধুমাত্র বিএনপির সাথেই খাতির জমায়নি, বরং জামায়াতসহ বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্য অংশ এবং ব্যক্তিত্বের সাথেও সম্পর্ক উষ্ণ করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া চীন এবং মার্কিন মৈত্রীকে রেডমেড গিফট হিসাবে পেয়েছে। এই পটভূমিতে ভারতের সাথে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে ভারতের বিজেপিপন্থী অন্যতম শীর্ষ থিংকট্যাংক অমিত ভান্ডারী বলেন, দক্ষিণ এশিয়াতে এই মুহূর্তে মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। তার মতে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাটা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টিতে মোদি সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তার পরেই তার থলির বেড়াল বেরিয়ে পড়ে। তিনি বলেন, এ ৪ দেশের সাথে সম্পর্ক ভালো থাকলে পাকিস্তানকে নিয়ে ভারতের যে চ্যালেঞ্জ সেটি উত্তরণ করা সম্ভব হবে।

এটিই হলো ভারতের আসল কথা। পাকিস্তানকে সাইডট্র্যাক করার জন্যই ভারত সার্ককে নিজ হাতে মেরে ফেলেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মনে রাখতে হবে যে, সার্ক গঠিত হয়েছিলো প্রধানত তার পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে। শহীদ জিয়া মনে করেছিলেন যে, সার্ক বা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশ যদি হাত ধরাধরি করে চলতে পারে তাহলে তাদেরকে আর পরাশক্তি বা বৃহৎ শক্তিগুলোর ওপর ভরসা করতে হবে না।

সকলেই জানেন, পাকিস্তান ভারতের তুলনায় ছোট রাষ্ট্র হলেও এবং সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে পেছনে থাকলেও তাদের রয়েছে জাত্যাভিমান। তারা ভারতকে ছেড়ে কথা বলেনি। অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্র হলেও তারা ভারতের সাথে ৩টি যুদ্ধ করেছে। এক বছর আগে গত বছরের মে মাসে পাক ভারত যে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধ হয়েছে সে যুদ্ধে পাকিস্তান এয়ার সুপিরিয়রিটি বা আকাশ যুদ্ধে অধিকতর দক্ষতা দেখিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কর্নারস্টোন হলো এশিয়ায় দুই বৈরী রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করা। এদের মধ্যে একটি হলো চীন। অপরটি হলো পাকিস্তান। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত যে পাকিস্তান ও চীন বিরোধী একটি ঢাল বা বর্ম তৈরি করবে সেখানে বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই থাকতে পারে না।

এখানে একটি কথা না বললেই নয়। ড. ইউনূসের আমলে তার সরকার পাকিস্তান থেকে ২০টি পাক-চীন যৌথ উদ্যোগে নির্মিত জঙ্গী বিমান এফ-১৭ থান্ডার, ২০টি চীনের নির্মিত জে-১০ জঙ্গী বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডার ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছিলো। ভারতের সাথে বন্ধুত্ব হতে পারে, কিন্তু সামরিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার বিনিময়ে নয়।

সার্ককে অকার্যকর করার জন্য ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিমসটেক গঠন করেছে। এখন আবার নতুন করে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালকে নিয়ে দল পাকানোতে বাংলাদেশ শামিল হতে পারে না। সার্কের স্পিরিট নিয়ে যদি ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানসহ ঐ ৭টি দেশকে নিয়ে উন্নয়ন ও সহযোগিতার জোট গঠন করতে চায় তাহলে কারো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। একই সাথে বাংলাদেশ সমান তালে আমেরিকা ও চীনের সাথে বন্ধুত্ব করে যাবে। এটাই হতে হবে আমাদের ফরেন পলিসির কর্নারস্টোন।

Email:[email protected]