আল পারভেজ
“শুনহ পয়ার কথা কিতাব বিহীন / কহিলু কিতাব কথা হীন বুদ্ধি হীন।” পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালে কবি শাহ মুহম্মদ সগীর তাঁর ‘ইউসুফ-জুলেখা’ কাব্যে এই বিনয়মিশ্রিত পঙক্তিটি লিখেছিলেন। এটি কেবল মধ্যযুগের এক কবির বিনয় প্রকাশ নয়। এটি ছিল বাঙালি মুসলমানের নিজের ভাষায় কিতাবি বয়ান বা সাহিত্য রচনার এক বলিষ্ঠ আত্মঘোষণা। সেই যুগে যখন জ্ঞানচর্চার ভাষা ছিল আরবি ও ফারসি, তখন এই মাটির ভাষায় পবিত্র প্রেমের আখ্যান রচনা করা ছিল এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। বাঙালি মুসলিম মানসের এই যাত্রাপথ পুথি সাহিত্যের মরমি ছন্দ থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক ছোটোগল্পের মননশীল গদ্য পর্যন্ত এক দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর পথরেখা।
বাঙালি মুসলিমের সাহিত্যিক শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হয় সেই সুলতানি আমলের দিকে। শাহ মুহম্মদ সগীর দিয়ে যে যাত্রার সূচনা, তার পূর্ণতা পায় সপ্তদশ শতকের মহাকবি আলাওলের হাতে। আরাকান রাজসভার এই কবি ‘পদ্মাবতী’ কাব্যের মাধ্যমে দেখালেন, ভিনদেশি উপাখ্যানকে কীভাবে বাংলার পানি-হাওয়ায় সিক্ত করে নিজস্ব করে তোলা যায়। আলাওলের পাণ্ডিত্য ও শিল্পচেতনা কেবল ধর্মীয় ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মানবিক প্রেম ও যুক্তিবাদের এক চমৎকার মিশেল ঘটিয়েছিলেন। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছিল এক নাগরিক আভিজাত্য, যা বাংলা সাহিত্যের তৎকালীন ধারায় ছিল সম্পূর্ণ নতুন। এই আদি কবিদের হাতেই বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক সত্তা প্রথম রূপ লাভ করে।
আঠারো ও উনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যে এক বিরাট পরিবর্তন আসে। ছাপাখানার প্রসারের ফলে পুঁথিসাহিত্য সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ‘সৈয়দ হামজা’ বা ‘গরীবুল্লাহর’ মতো কবিগণ ‘জঙ্গনামা’ বা ‘আমীর হামজা’র মতো উপাখ্যানগুলোর মাধ্যমে এক নতুন ধরনের বীরত্বগাথা তৈরি করেন। পুঁথির সেই মিশ্র ভাষা, যা ‘দোভাষী বাংলা’ নামে পরিচিত, সেখানে আরবি, ফারসি ও দেশি শব্দের এক অপূর্ব সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়। এই সাহিত্যে মক্কাতুল মোকাররমা বা কারবালার ময়দান যেন বাংলার মেঠোপথ আর সবুজ প্রান্তরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। পুথি সাহিত্যের সেই ছন্দোবদ্ধ বয়ানে মুসলমান সমাজ খুঁজে পেয়েছিল তাদের শেকড়ের সন্ধান। প্রতিটি পঙক্তিতে ফুটে উঠেছিল এক বিশ্বাসী হৃদয়ের আকুতি। সাধারণ মানুষ যখন এই পুথিগুলো পাঠ করত, তখন তারা কেবল গল্প শুনত না, তারা তাদের যূথবদ্ধ জীবনের প্রতিফলন দেখত।
সময়ের চাকা গড়িয়ে যখন উনিশ শতকের শেষার্ধে আসে, তখন মুসলিম মানসে এক নতুন সংকটের উদয় হয়। আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ও হিন্দু নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে মুসলমানরা তখন আত্মপরিচয়ের সন্ধানে অস্থির। এই ক্রান্তিকালে মীর মোশাররফ হোসেন আবির্ভূত হলেন এক শক্তিশালী গদ্যশিল্পী হিসেবে। তাঁর ‘বিষাদ-সিন্ধু’ কেবল কারবালার ইতিহাস নয়, এটি বাঙালি মুসলিমের হৃদয়ের এক চিরন্তন হাহাকার। তিনি পুথির সেই প্রাচীন গণ্ডি ভেঙে আধুনিক গদ্যের শৈলী গ্রহণ করলেন। তাঁর লেখনীতে বাংলা ভাষা এক ভিন্ন মাধুর্য ও গম্ভীরতা লাভ করল। মীর মোশাররফ হোসেন দেখালেন, আধুনিক গদ্যের কাঠামোর ভেতরেও কীভাবে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে শিল্পিত রূপে উপস্থাপন করা যায়। তাঁর গদ্য ছিল সাবলীল, চিত্রাত্মক এবং গভীর আবেগে আপ্লুত। এটি এক নতুন যুগের ইশারা দিচ্ছিল।
বিশ শতকের শুরুতেই বাঙালি মুসলমানের মননশীলতায় আমূল পরিবর্তন ঘটে। ১৯২৬ সালে ঢাকায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। আবুল ফজল, কাজী আবদুল ওদুদ ও মোতাহের হোসেন চৌধুরীÑএরা চাইলেন ধর্মের গতানুগতিক আচার থেকে বেরিয়ে এসে জীবনকে যুক্তি ও মননশীলতার আলোয় দেখতে। তাঁদের মতে, সাহিত্য হবে মানুষের সৃজনশীলতার শ্রেষ্ঠ পরিচয়। এই সময় মুসলিম লেখকদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা ছিল। একদিকে শেকড়ের টান, অন্যদিকে আধুনিকতার হাতছানি। কাজী নজরুল ইসলাম এই দুইয়ের মধ্যে সেতু বন্ধন করলেন। নজরুলের আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিষ্ময়কর ঘটনা। তিনি তাঁর কবিতায় ও গানে ইসলামি ঐতিহ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করলেন, যা আগে কেউ কখনও ভাবেনি। তাঁর ‘খেয়া পারের তরণী’ বা ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আমরা দেখি এক নতুন মানুষ। এই মানুষটি একদিকে স্রষ্টার কাছে সমর্পিত, অন্যদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ। নজরুলই প্রথম বাঙালি মুসলিম লেখক, যিনি বিশ্বজনীনতার সাথে দেশজ ঐতিহ্যের এক সার্থক সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
নজরুল পরবর্তী সময়ে ফররুখ আহমদ এক ভিন্ন ধারার সূচনা করেন। তিনি তাঁর কবিতায় ইসলামের স্বর্ণযুগ ও ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ চাইলেন। ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে তিনি সিন্দবাদের রূপকের মাধ্যমে এক তন্দ্রাচ্ছন্ন জাতিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। ফররুখের ভাষা ছিল শব্দগতভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং ছন্দের দিক থেকে অত্যন্ত দৃঢ়। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলিম মানস যদি তার শিকড় থেকে বিচ্যুত হয়, তবে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। তাঁর এই নন্দনতত্ত্ব আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ইসলামি মূল্যবোধকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিল। তবে তিনি কেবল অতীতের গুণগান গেয়েই ক্ষান্ত হননি, তাকে সমকালের প্রেক্ষাপটে স্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।
চল্লিশের দশক থেকে বাংলা ছোটোগল্পের আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু এক নতুন দিকে মোড় নিতে শুরু করে। বিশেষ করে দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের সাহিত্যে মুসলিম মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ
জীবনের জটিলতাগুলো প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ উপন্যাস ও তাঁর ছোটোগল্পগুলো এই ধারায় এক অপরিহার্য সংযোজন। ওয়ালীউল্লাহ ধর্মীয় গোঁড়ামির ভেতরে থাকা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনকে খুব নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখি, ধর্মবিশ্বাস কীভাবে মানুষের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে এবং কীভাবে তা অনেক সময় শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তিনি ধর্মের পবিত্রতার পরিবর্তে তার প্রয়োগিক দিকের সংকীর্ণতাকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর গল্পের ভাষা ছিল অত্যন্ত গভীর ও সংকেতময়। সেখানে কোনো বাড়তি শব্দ ছিল না, কিন্তু প্রতিটি বাক্যের নিচে লুকিয়ে ছিল হাজার বছরের এক চাপা দীর্ঘশ্বাস।
ষাটের ও সত্তরের দশকে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে এক ধরনের শৈল্পিক সাবলীলতা আসে। এই সময়ের লেখকদের মধ্যে হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা শওকত আলীর নাম করা যায়। যদিও এঁদের অনেকে সমাজতান্ত্রিক ধারার অনুসারী ছিলেন, কিন্তু তাঁদের লেখায় মুসলিম সমাজের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ জীবনের ক্ষুদ্রতা, অভাব এবং সেই অভাবের মধ্যেও মানুষের যে ঈশ্বরমুখী প্রবণতা, তা এই লেখকদের কলমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই ধারায় ছোটোগল্প আর কেবল ঘটনার বর্ণনা রইল না, তা হয়ে উঠল মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর অনুসন্ধান। আধুনিক এই গল্পকাররা ধর্মের বাহ্যিক আচারের চেয়ে মানুষের আধ্যাত্মিক আর্তি ও জীবনের তুচ্ছতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে ধর্মীয় অনুষঙ্গ অত্যন্ত নান্দনিক ও সুক্ষ্মভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের লেখকরা এখন আর পুথির মতো সরল বিশ্বাস বা সরাসরি সমাজ সংস্কারের বাণী দেন না। তাঁরা এখন মানুষের একাকিত্ব, নগরায়ন ও বিশ্বাসের বিবর্তনকে ধরতে চান। এখনকার ছোটোগল্পে কোনো চরিত্র যখন মোনাজাত করে অথবা গভীর রাতে তসবিহ পাঠ করে, তখন তা কেবল ধর্মীয় ক্রিয়া থাকে না; তা হয়ে ওঠে মানুষের মহাজাগতিক একাকিত্বের এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। সমকালীন সাহিত্যে ধর্মীয় পরিভাষাগুলো অত্যন্ত সুনিপুণভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সাহিত্য নয়, এটি মানুষের সামগ্রিক অভিজ্ঞতার অংশ। লেখায় এখন ধর্মের নাম করে যেমন বাড়াবাড়ি নেই, তেমনি তাকে অস্বীকার করার সস্তা প্রবণতাও নেই। প্রতিটি চরিত্র তার নিজ নিজ বিশ্বাসের জায়গা থেকে জীবনকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলা সাহিত্যের এই দীর্ঘ যাত্রায় মুসলিম মানস বারবার নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছে। মধ্যযুগের সেই পুথি থেকে আজকের আধুনিক ছোটোগল্প পর্যন্ত এই পরিবর্তনের মূলে ছিল আত্মোপলব্ধির প্রবল তৃষ্ণা। যখনই সমাজ স্থবির হয়ে পড়েছে, তখনই কোনো না কোনো সৃজনশীল প্রতিভা কলম হাতে তুলে নিয়েছেন সেই স্থবিরতাকে কাটাতে। পুথি সাহিত্যের সেই লৌকিক আবহে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশ্বসাহিত্যের দরবারে নিজের পরিচয় পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। আধুনিক ছোটোগল্পের বুননে আমরা যেমন পাশ্চাত্যের প্রভাব দেখি, তেমনি তার আত্মার ভেতরে খুঁজে পাই আমাদের সেই চিরচেনা গ্রাম্য সুফিবাদের স্পর্শ।
একজন সত্যিকারের সৃজনশীল মানুষ কেবল সমকালকে ধারণ করেন না, তিনি ধারণ করেন তাঁর বংশপরম্পরার স্মৃতিকে। বাঙালি মুসলিমের সাহিত্যিক যাত্রাও এর ব্যতিক্রম নয়। পুথির সেই ছন্দময় লড়াই আর মীর মোশাররফের সেই গদ্যের গাম্ভীর্য আজ আমাদের আধুনিক ছোটোগল্পের শরীরের ভেতর বহমান। বর্তমানের ছোটোগল্পকারগণ জানেন, শেকড় ছিঁড়ে কোনো বড়ো মহীরুহ হওয়া সম্ভব নয়। তাই তাঁরা বিশ্বসাহিত্যের আধুনিক আঙ্গিক গ্রহণ করার পাশাপাশি নিজেদের সমাজ ও ধর্মের মৌলিক সত্যগুলোকে বিসর্জন দেননি। এই সংমিশ্রণই আমাদের সাহিত্যকে এক বিশেষ চরিত্র দান করেছে। সেখানে যেমন আছে মরমী সাধনা, তেমনি আছে আধুনিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতা।
বাংলা সাহিত্য ও মুসলিম মানসের এই সম্পর্ক কেবল ধর্মের নয়, এটি মূলত সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। পুথি থেকে আধুনিক ছোটোগল্প পর্যন্ত এই দীর্ঘ বিবর্তনে আমরা দেখতে পাই এক জাতির চিন্তার পরিপক্বতা। ধর্ম ও শেকড়কে ধারণ করেও কীভাবে একটি বৈশ্বিক সাহিত্য তৈরি করা যায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের এই পথপরিক্রমা। আজকের পাঠক যখন একটি আধুনিক ছোটোগল্প পড়েন, তখন তিনি হয়তো অবচেতনেই সেই প্রাচীন পুথির সুরটি কোথাও শুনতে পান। সাহিত্যের সার্থকতা এখানেই। এটি একটি প্রবহমান নদী, যা তার আপন গতিতে পলি জমিয়ে জমিয়ে সমৃদ্ধ করেছে বাংলার মনন ও মেধা। আগামীর সাহিত্য আরও বেশি মানবিক, আরও বেশি জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে, যেখানে বিশ্বাস আর যুক্তি হাত ধরাধরি করে চলবে। এই সুসমন্বয়ই আমাদের সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং বিশ্ব দরবারে আমাদের এক স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করবে। এভাবেই পুথির সেই প্রাচীন পয়ার থেকে আধুনিক ছোটোগল্পের গদ্যে রচিত হয়েছে এক মহান জাতির মননশীলতার ইতিহাস।