মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

সকাল থেকেই আসলাম সাহেবের পাঁচতলার ফ্ল্যাটটা বড় বেশি নিস্তব্ধ। ড্রয়িংরুমের কোণায় রাখা বিশাল ফ্রিজটা গোঁ গোঁ শব্দে জানান দিচ্ছে সে আজ পূর্ণগর্ভ। অথচ সত্তরোর্ধ্ব আসলাম সাহেবের বুকের ভেতরটা আজ যেন মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে।
রিটায়ার্ড লাইফটা তাঁর কাটছে এক অদ্ভুত যান্ত্রিকতায়। দুই ছেলে আর এক মেয়ে—সবাই বিদেশে থিতু। কেউ কানাডায়, কেউ অস্ট্রেলিয়ায়। ভিডিও কলে ঈদের সালাম বিনিময় হয়েছে ভোরবেলাতেই। বড় ছেলে জাহিদ স্ক্রিনে হাসিমুখে বলেছে, “আব্বা, বড় গরু দিয়েছেন তো? টাকার চিন্তা করবেন না, পাঠিয়ে দিয়েছি।”
টাকা! আসলাম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। টাকার অভাব তাঁর কোনোদিন ছিল না, আজ তো নেই-ই। আজ ভোরে তিনি একাই গিয়ে বিশাল এক গরু কুরবানি দিয়ে এসেছেন। কসাইরা দক্ষ হাতে কাজ শেষ করে দিয়ে গেছে। আসলাম সাহেবের কাজের লোক রফিক তিন ভাগ করে যত্ন করে ফ্রিজে তুলে রেখেছে সব। নিয়ম মেনে তিন ভাগের এক ভাগ প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে টিফিন ক্যারিয়ারে করে। কিন্তু আসলাম সাহেব জানেন, ওই প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের কারও ফ্রিজেই আজ জায়গা নেই। ওটা কেবলই এক যান্ত্রিক লেনদেন।
বিকেল গড়াতেই আসলাম সাহেব ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিচের রাস্তায় তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। একদল ছিন্নমূল মানুষ, কেউ বস্তা হাতে, কেউ পলিথিন হাতে ভিড় করে আছে ডাস্টবিনের আশেপাশে কিংবা বড় বড় গেটের সামনে। এক টুকরো হাড় বা চর্বির জন্য তাদের কী হাহাকার!
আসলাম সাহেবের হঠাৎ মনে হলো, তাঁর ড্রয়িংরুমের ওই বিশাল ফ্রিজটা যেন একটা ঠান্ডা কবরের মতো। যেখানে দামী গোশতগুলো জমে পাথর হয়ে আছে, অথচ নিচে রক্তমাংসের মানুষগুলো ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করছে। তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। রফিককে ডাক দিলেন।
“রফিক, ফ্রিজ থেকে সব গোশত বের করো। যতগুলো প্যাকেট করেছো সব নিয়ে নিচে চলো।”
রফিক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। “স্যার, সব? রাইতের বেলা আপনার মেহমান আসবে না?”
আসলাম সাহেব ম্লান হেসে বললেন, “মেহমানরা পেট ভরে খেয়েই আসবে রফিক। কিন্তু নিচে যাদের দেখছো, তারা আজ না খেলে হয়তো কাল আর ওঠার শক্তি পাবে না।”
নিচে নামার পর আসলাম সাহেব এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলেন। মানুষগুলো তাঁকে ঘিরে ধরলো। তিনি নিজ হাতে গোশতের প্যাকেটগুলো বিলিয়ে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন এক বৃদ্ধ লোক রাস্তার এক কোণায় বসে আছে, তার হাতে কোনো ব্যাগ নেই। আসলাম সাহেব তাঁর কাছে গিয়ে এক প্যাকেট ভালো গোশত এগিয়ে দিলেন।
বৃদ্ধ লোকটা গোশত নিলেন না। বরং আসলাম সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবা, গোশত তো অনেকেই দিল। কিন্তু কেউ একটু জিরানোর জায়গা দিল না। পা দুটা বড্ড ব্যথা করছে, কেউ একটু জিজ্ঞাসাও করলো না—দাদা, কেমন আছেন?”
কথাটা তীরের মতো আসলাম সাহেবের বুকে বিঁধলো। তিনি বুঝতে পারলেন, এই শহরটা মানুষকে গোশত দিতে শেখেছে, কিন্তু সময় দিতে শেখেনি। ত্যাগের উৎসবে আমরা পশুর রক্ত ঝরিয়েছি ঠিকই, কিন্তু মানুষের প্রতি মমতাটাকে বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি অনেক আগেই।
আসলাম সাহেব এক মুহূর্ত ভাবলেন। তারপর বৃদ্ধের হাত ধরে টেনে তুললেন।
“চলেন আমার সাথে।”
“কই যাব বাবা?”
“আমার বাসায়। আজ আমরা সবাই মিলে একসাথে খাব।”
রফিকসহ আরও তিন-চারজন ভিক্ষুক আর ওই বৃদ্ধকে নিয়ে আসলাম সাহেব তাঁর সুসজ্জিত ডাইনিং রুমে বসালেন। দামী ডিনার সেটে গরম গরম খিচুড়ি আর কুরবানির গোশত বেড়ে দিলেন। প্রথম দিকে লোকগুলো খুব আড়ষ্ট ছিল, কিন্তু আসলাম সাহেব যখন নিজে বসে গল্প শুরু করলেন, তখন পরিবেশটা পাল্টে গেল।
ওই বৃদ্ধ লোকটা একসময় পালকিতে মানুষ বইতেন। তাঁর গল্পের ঝুলি যেন এক রূপকথার জগত। রফিক রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখছিল—বিগত দশ বছরেও সে আসলাম সাহেবকে এত প্রাণখুলে হাসতে দেখেনি।
খাওয়ার পর বিদায় নেওয়ার সময় বৃদ্ধ লোকটা আসলাম সাহেবের মাথায় হাত রেখে বললেন, “বাবা, আজ পেট ভরে খাইলাম না শুধু, পরানটা ভইরা গেল। আল্লা আপনারে অনেকদিন বাঁচায় রাখুক।”
রাতে আবার ছেলেদের ফোন এলো। আসলাম সাহেব এবার হাসিমুখে বললেন, “জাহিদ রে, আজ আমি সত্যিকারের কুরবানি দিয়েছি। আজ আমার ঘরে উৎসব হয়েছে।”
ছেলেরা হয়তো ওপারে বসে বুঝতেই পারলো না বাবা কিসের কথা বলছেন। কিন্তু আসলাম সাহেব যখন একা ড্রয়িংরুমের লাইটটা নেভালেন, তখন তাঁর মনে হলো—এই প্রথম অন্ধকার ঘরটাতে এক টুকরো আসমানি রোদ ঢুকে পড়েছে। কুরবানির আসল শিক্ষা তো পশু হত্যায় নয়, বরং ত্যাগের মাধ্যমে মানুষের সাথে মানুষের সংযোগ স্থাপনে। আজ রাতে আসলাম সাহেব অনেকদিন পর খুব নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন।