ভিয়েতনামের মধ্যাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকা বিশ্বের মোট কফির প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ উৎপাদন করে। তবে চীনে তীব্র গন্ধযুক্ত ‘ফলের রাজা’ ডুরিয়ানের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী কফি চাষ ছেড়ে ডুরিয়ানের দিকে ঝুঁকছেন।

‘কফি চাষ করে ভালোভাবে চলা যায়। কিন্তু ডুরিয়ানই আপনাকে ধনী করে’- নিজের খামার ঘুরিয়ে দেখানোর সময় এ কথা বলেন ফাম জুয়ান লান।

ভিয়েতনামের মধ্যাঞ্চলীয় পার্বত্য প্রদেশ ডাক লাক থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া ও উর্বর ব্যাসল্ট মাটির কারণে সবুজে ঘেরা মধ্যাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় বিপুল পরিমাণ রোবাস্তা কফি উৎপাদন হয়। কফি উৎপাদনে ভিয়েতনামের অবস্থান ব্রাজিলের পরই।

তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য জানা যায়, গত এক দশকে দেশটিতে ডুরিয়ান চাষের জমির পরিমাণ পাঁচ গুণেরও বেশি বেড়ে ২ লাখ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।

২০২২ সালে বাণিজ্য প্রটোকল স্বাক্ষরের পর ভিয়েতনাম আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের ডুরিয়ান বাজারে প্রবেশ করে। তবে গত বছর পরিমাণের দিক থেকে দেশটি চীনের সবচেয়ে বড় ডুরিয়ান সরবরাহকারী হয়ে ওঠে। এতে প্রায় দুই দশক ধরে বাজারে আধিপত্য ধরে রাখা থাইল্যান্ডকে পেছনে ফেলে ভিয়েতনাম।

লান ছিলেন এই পরিবর্তনের শুরুর দিকের কৃষকদের একজন। দুই দশক আগে তিনি ফসলের বৈচিত্র্য আনতে শুরু করেন। এখন ডাক লাক প্রদেশের অংশ ইয়া নুয়েক কমিউনে তার ৪০০টি ডুরিয়ান গাছ রয়েছে।

এসব গাছ থেকে তিনি ৬০ টন তীব্রগন্ধযুক্ত মিষ্টি ফল পান। হিমায়িত কনটেইনারে করে ফলগুলো কয়েক হাজার কিলোমিটার উত্তরে চীনে পাঠানো হয়।

৫৬ বছর বয়সী লান আশা করছেন, এ বছর তার আয় হবে ৭৬ হাজার ডলার। শুধু কফি চাষে থাকলে আয় হতো ১০ হাজার ডলার।

‘ডুরিয়ান চাষ করে আমি গাড়ি কিনেছি, সন্তানদের জন্য বাড়ি বানিয়েছি এবং পরিবারের জন্য একটি ভিলা তৈরি করেছি,’ বলেন তিনি। তার চারপাশে সচ্ছলতার ছাপ স্পষ্ট।

স্থানীয় অন্য কৃষকরাও তার পথ অনুসরণ করেছেন। তারা উন্নত মানের রি৬, মুসাং কিং ও ডোনা জাতের ডুরিয়ান চাষে মনোযোগ দিচ্ছেন।

আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডুরিয়ান সংগ্রহের মৌসুমে ডাক লাকের সড়কগুলো কাঁটাযুক্ত এই ফলবোঝাই ট্রাকে ভরে যায়। চলতি মাসে আয়োজিত একটি ডুরিয়ান উৎসবে ৫২৫টি যানবাহন অংশ নেয়। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এটিকে ফল বহনকারী যানবাহনের সবচেয়ে বড় শোভাযাত্রা হিসেবে ঘোষণা করেছে।

কোটি কোটি ভিউ

চীনে ডুরিয়ানের চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই এই উত্থান। সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে, ফলটির জনপ্রিয়তাও বাড়ছে।

চীনে টিকটকের সমতুল্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দৌইনে খালি হাতে ডুরিয়ান ভাঙার ভিডিও বার বার দেখানো হয়েছে।

দৌইনের এক ভিডিওতে লিউলিয়ানজি নামের এক ইনফ্লুয়েন্সার বলেন, ‘এটি খুব মিষ্টি। মনে হচ্ছে যেন চিনিতে মাখানো।’

ভিডিওটিতে ১৭ হাজারের বেশি লাইক পড়েছে।

একসময় বিলাসবহুল খাবার হিসেবে বিবেচিত ডুরিয়ানের দাম এখন কমেছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মধ্যে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতা এবং উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ফলটিকে আরও সাশ্রয়ী করেছে।

গত মাসে বেইজিংয়ে আয়োজিত এক ডুরিয়ান স্বাদ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আদা সং এএফপিকে বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনি ফলটির পেছনে প্রায় ১ হাজার ইউয়ান খরচ করেছেন।

সং বলেন, ‘আমি প্রায় ২০ ধরনের ডুরিয়ান খেয়ে দেখেছি।

‘ডুরিয়ানের স্বাদ কেকের মতোই মিষ্টি। তবে এতে কেকের মতো তেলতেলে ভাব ও ভারী অনুভূতি নেই।’

গত বছর চীন প্রায় ৭৫০ কোটি ডলারের তাজা ডুরিয়ান আমদানি করেছে। ২০১৫ সালের তুলনায় এ পরিমাণ প্রায় ১২ গুণ বেশি।

এখন চীন নিজেদের দেশে ডুরিয়ান উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ প্রদেশ হাইনানে ইতোমধ্যে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে ডুরিয়ান বাগান গড়ে উঠেছে। এখানকার আবহাওয়া উত্তর ভিয়েতনামের মতোই।

মান বাড়ানোর চেষ্টা

এ বছর ভিয়েতনামের ডুরিয়ান রপ্তানি ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২১ সালে যা ছিল মাত্র ১৮ কোটি ডলার। এর ৯০ শতাংশই যাচ্ছে উত্তরের প্রতিবেশী চীনে।

তবে মধ্যাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে আরও কৃষক ডুরিয়ান চাষে ঝুঁকে পড়ায় অতিরিক্ত সরবরাহের ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় ডুরিয়ানের দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। অস্বাভাবিকভাবে বেশি ফলনকেই এর জন্য দায়ী করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভিয়েতনামের অনেক কৃষক উদ্বিগ্নভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

মালয়েশিয়ার অনেক কৃষকও ডুরিয়ান চাষে ঝুঁকেছেন। তারা উন্নত জাত ও তাজা ফল উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে চীনের বাজারে দেশটির অংশ এখনো খুবই কম।

ভিয়েতনাম সরকার আগস্টের শুরুতে সতর্ক করে বলেছে, চাষের জমি দ্রুত বাড়তে থাকায় ‘অতিরিক্ত সরবরাহ এবং মান নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি’ রয়েছে।

কৃষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ডুরিয়ান চাষে সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর জন্য আর্দ্রতা, পানি ও সারের কঠোর ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়।

মজার বিষয় হচ্ছে, ডুরিয়ানের গন্ধ এতই কটু যে থাইল্যান্ড, হংকং, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং এসব দেশের আশপাশের আরও কিছু দেশের গণপরিবহন, বিমানবন্দর ও হোটেলে ফলটা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কোনো আবদ্ধ জায়গায় এই ফলের খোসা ছাড়ানো রীতিমতো অন্যায়। দুর্গন্ধের কারণেই ফলটায় যুক্তরাষ্ট্রে নিষেধাজ্ঞা । তবে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তা বেশ জনপ্রিয়।