সিস্টেম লস কমানো ও আয় বাড়াতে বাড়তি বিল

কামাল উদ্দিন সুমন : অবশেষে ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ । দেশের অনেক স্থানে ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট দফতরে ভূতুড়ে বিল নিয়ে অভিযোগ দেয়ার পর সত্যতা খুঁজে পাওয়ার পর প্রকৃত বিল করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) চেয়ারম্যান মো: রেজাউল করিম দৈনিক সংগ্রামকে জানান, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কোন গ্রাহকের প্রতি যেন কোন অন্যায় না হয় সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। যে পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রাহক ব্যবহার করবেন সে পরিমাণে বিল আসবে। এর বাইরে কিছু হয়ে থাকলে সেটা গ্রাহকের প্রতি অন্যায়। এটা আমরা করতে দিতে পারি না। কারা, কোন উদ্দেশ্যে প্রকৃত বিলের বাইরে গিয়ে বাড়তি বিল করেছে সেটা আমরা তদন্ত করছি এবং তদন্তে দোষি প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকদের সাথে বৈঠক হয়েছে। প্রতিটি কোম্পানিকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখতে বলা হয়েছে। কোন বিদ্যুৎ গ্রাহক যেন অযথা হয়রানি না হয় সে বিষয়ে বলা হয়েছে। তারপরও যদি সঠিক অভিযোগ আসে তাহলে তদন্তের পর যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ পেয়ে সব বিতরণ সংস্থাকে তা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। একই সঙ্গে গ্রাহককে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার কার্যালয়ে গিয়ে কিংবা নির্দিষ্ট হটলাইনে অভিযোগের পরামর্শ দিয়েছে। কাজটি সমন্বয় করছেন বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (সমন্বয়) মোহাম্মদ সানাউল হক।

জানা গেছে , বর্তমানে দেশে ৬ টি বিতরণ কোম্পানির প্রায় ৫ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে আরইবির গ্রাহক প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ৫৮ হাজার। মোট গ্রাহকের ৫৫ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী। যাদের ক্ষেত্রে মিটারে ত্রুটি ছাড়া ভূতুড়ে বিলের সুযোগ নেই। বাকি যে বিপুলসংখ্যক পোস্টপেইড গ্রাহক রয়েছেন, সেখানেই মূলত বিলে কারসাজি হয়। বেশিরভাগ পোস্টপেইড গ্রাহকই আরইবির। সংস্থাটি দেশ জুড়ে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

সিস্টেম লস কমানো ও আয় বাড়াতে বাড়তি বিল

বিতরণ কোম্পানিগুলো জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কিনে তা গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণের সময় বৈদ্যুতিক তার, ট্রান্সফরমার এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশের নিজস্ব রোধ বা বাধায় কিছু বিদ্যুৎ অপচয় হয়। এই কারিগরি লোকসানই মূলত সিস্টেম লস। বিশ্ব জুড়ে এটি গ্রহণযোগ্য।

তবে বাংলাদেশে বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিশেষ করে আরইবির সিস্টেম লস অনেক বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরইবির সিস্টেম লসের পরিমাণ ৮.৫১ শতাংশ। আগের বছরে তা ৮.১৬ শতাংশ ছিল। সিস্টেম লস যত বাড়বে আর্থিক ক্ষতিও তত বাড়বে।

নি¤œমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা, দীর্ঘ বিতরণ লাইন, ওভারলোডেড ফিডারের পাশাপাশি বিদ্যুৎ চুরি ও অপচয়ের কারণে সিস্টেম লস বেড়ে যায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। বিতরণ কোম্পানিগুলোর সেই ব্যর্থতা ও দুর্নীতির দায় চাপে গ্রাহকের ওপর। তারা গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যবহারের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আদায় করে সিস্টেম লস কমানোর মতো অপকৌশল করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, প্রতি বছর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোকে সিস্টেম লস কমানোর টার্গেট দেয় আরইবি। সেই টার্গেট পূরণ না হলে জুন ক্লোজিংয়ের আগে বাড়তি বিল করারও মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। যদিও লিখিত নির্দেশনা না থাকায় এর প্রমাণ জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।

তাদের বক্তব্য হলো প্রত্যন্ত এলাকায় গাছপালার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিতরণ লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণেই এমনিতেই অন্যান্য বিতরণ কোম্পানির তুলনায় সিস্টেম লস বেড়ে যায়। এরপর আবার আরইবির সরবরাহ করা নি¤œমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারে তা বেড়ে যায় আরও। আবার সমিতিকে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আরইবির কাছ থেকে কিনতে হয় বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে। এই বাড়তি দাম বহন করা বেশিরভাগ সমিতির পক্ষে সম্ভব হয় না। তখন রক্ষণাবেক্ষণ কাজে বিঘœ হয়। এতে বেড়ে যায় সিস্টেম লস।

তারা বলেছেন, এই সিস্টেম লস কমানোর তখন একমাত্র উপায় থাকে গ্রাহকের কাঁধে বাড়তি বিলের বোঝা চাপানো। অনেকে আবার আরইবির সুনজরে থাকতে পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধির জন্যও বেছে নেন এই কৌশল।

আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, যেসব কর্মকর্তা একটু চতুর। তারা জুনের দুই-তিন মাস আগে থেকেই অল্প অল্প করে বাড়তি বিল তৈরি করেন, যাতে গ্রাহক বুঝতে না পারেন। অবশ্য কোনো কোনো কর্মকর্তা আশ্রয় নেন না এমন অপকৌশলের।

তারা জানিয়েছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুলাই মাস থেকে এই বাড়তি বিল আবার সমন্বয় করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত বিলের কারণে গ্রাহকের স্লাব পরিবর্তনে যে বাড়তি টাকা চলে যায়, তা আর ফেরত আসে না। কারণ স্লাব অনুযায়ী গ্রাহক যত বেশি ব্যবহার করবে, ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দামও তত বাড়তে থাকে।

জানা গেছে, প্রতি বছর মে-জুনে সিস্টেম লস কমানোর যে কৌশল নেওয়া হয়, তার বেশ কিছু নমুনা আগামীর সময়ের হাতে এসেছে। এর একটি সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। এই সমিতির ২০২৪ সালের জুন মাসে সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এক মাস পর জুলাইয়ে তা এক লাফে বেড়ে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ হয়। পরের বছর জুনে সিস্টেম লস ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ দেখানো হলেও জুলাই মাসে দেখানো হয় ২১ দশমিক ১৬ শতাংশ। গত বছরের জুন মাসে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এ সিস্টেম লস ২ দশমিক ২৩ শতাংশ দেখানো হয়। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ।

নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এ ২০২৪ সালের জুনে সিস্টেম লস ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে জুলাই মাসে সিস্টেম লস বেড়ে হয় প্রায় দ্বিগুণ (৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ)। এর পরের বছর তা যথাক্রমে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।

মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে ২০২৪ সালের জুনে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ সিস্টেম লস থেকে বেড়ে জুলাই মাসে হয় ১১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পরের বছর জুন ও জুলাই মাসে তা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এ গত বছরের জুনে সিস্টেম লস দেখানো হয় ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। পরের মাসেই তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

২০২৪ সালের জুনে যশোরের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এ সিস্টেম লস ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ দেখানোর পর জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আর গত বছর সেখানে জুন ও জুলাই মাসে সিস্টেম লস ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৩১ এবং ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ।

পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি বকেয়া কমিয়ে আয় বাড়ানোরও একটি টার্গেট দেয় আরইবি। এই টার্গেট পূরণের জন্যও কোনো কোনো সমিতির ঊর্ধ্বতনরা বাধ্য হয়েই বাড়তি বিল করেন।

মিটার রিডারদের গাফিলতি

বিল তৈরি করেন মিটার রিডাররা। তাদের নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক, বেতন তুলনামূলক কম। নিয়ম হলো প্রত্যেক গ্রাহকের আঙিনায় গিয়ে মিটার রিডিং নেওয়া। কিন্তু বেশিরভাগ রিডার সব গ্রাহকের কাছে যান না। অনেক সময় গ্রাহক যাই ব্যবহার করেন না কেন, আগের মাসের বিলের সঙ্গে আনুমানিক একটা হিসাব ধরে বিল করেন। সেক্ষেত্রে কখনো বিল কম বা বেশি হয়।

আবার এসব মিটার রিডাররা সাধারণত ছয় মাস করে একেক এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। নতুন কেউ এলে তিনি প্রথমবার সব গ্রাহকের কাছে গিয়ে বিল করেন। তখন প্রকৃত রিডিং নেওয়ার সময় গরমিল হয়। জুন ক্লোজিংয়ের সময় এর প্রভাব পড়ে।

জানা গেছে, পল্লী বিদ্যুতের একজন মিটার রিডারের মাসে ২ হাজার গ্রাহকের বিল তৈরি এবং তা বিতরণের দায়িত্ব থাকে সাধারণত। তবে লোকবলের অভাবে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার গ্রাহকের বিল তৈরি ও বিতরণ করতে হয়। ফলে প্রতিমাসে সম্ভব হয়না সব মিটারের রিডিং নেওয়া। পাশাপাশি মে-জুনে তাদেরকে ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি বিল করতে কর্মকর্তাদের অলিখিত চাপ থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। আরইবির পাশাপাশি অন্যান্য বিতরণ সংস্থার বিরুদ্ধেও কমবেশি এসব অভিযোগ রয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দৈনিক সংগ্রামকে জানান , আরইবিসহ অন্যান্য বিতরণ সংস্থাগুলোতে সিস্টেম লস কমানোর এই অপকৌশল সম্পর্কে অনেকেই জানেন। কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয় না। কারণ বিদ্যুৎ খাতে সেবা দেওয়ার পরিবর্তে লুণ্ঠন হচ্ছে। পুরো সিস্টেম অসততার মনোবৃত্তির কাঠামোর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ফলে মানুষ জ্বালানিতে সুবিচার পাচ্ছে না।

‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন দরকার। সেই পরিবর্তন হবে জনগণ শক্তিশালী হলে। কিন্তু মানুষের প্রতিবাদ ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সবাই সবকিছু মেনে নিচ্ছে। এটাই আসলে বড় সংকট’, যোগ করেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জ¦ালনি বিশ্লেষক মোশাহিদা সুলতানার মতে , সিস্টেম লস কমানো এবং আয় বাড়ানোর জন্য ওপর থেকে চাপ দেওয়ার কারণেই নিচের দিকের কর্মীরা তা বাধ্য হয়ে করেন। আবার তারাই গ্রাহকের রোষের মুখে পড়ছে। কিন্তু যারা এই চাপ দিচ্ছে তাদের কিছুই হচ্ছে না। আরইবি সমিতিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে। তারা নানাভাবে কর্মীদের চাপ দেয়। সেটা না মানলে বদলি, চাকরিচ্যুতির হুমকি দেয় এবং কখনো কখনো তা করেও। এগুলো বন্ধ করতে হবে। এমন অন্যায়ে ওপরের যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলে এসব বন্ধ হবে।

একজন ভুক্তভোগীর ভাষ্য

ভূতুড়ে বিদ্যুৎ নিয়ে গত ৩০জুন সংবাদ প্রকাশ করার পর টনক নড়ে ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির। ওই সমিতির গ্রাহক বোয়ালমারি থানার দাদপুর বঙ্গেশ^রদী সুগান্দি এলাকার তায়েব আলী মোল্লা । সংবাদে তার বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে তুলে ধরা হলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিত বিল কমিয়ে দিয়েছে । এবিষয়ে তায়েব আলী মোল্লার পুত্র ফিরোজ মোল্লা গতকাল বৃহস্পতিবার দৈনিক সংগ্রামকে জানান, দৈনিক সংগ্রামে সংবাদ প্রকাশের পর বিল কমানো হয়েছে। আগে বিল আসছিল ১৭৭২ টাকা বর্তমানে বিল নিয়েছে ১৪৭২টাকা।