দেশের বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৪ টাকা বাড়িয়ে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৯ টাকা, যা আগে ছিল ১৯৫ টাকা। একই সঙ্গে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১৭৯ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া পামওয়েলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে মানুষের নিত্যদিনের খরচের চাপ আরো বাড়বে বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।
গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ভোজ্যতেলের বাজারমূল্য পর্যালোচনা সংক্রান্ত বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ কথা জানান। বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ভোজ্যতেল শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রিফাইনার ও আমদানিকারকদের প্রতিনিধিরা ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। যেসব পণ্যে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর, সেসব পণ্যের ক্ষেত্রে উৎস পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি আমদানি ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। সয়াবিন তেল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে।
তিনি বলেন, রমযান মাস থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। ওই সময় থেকে আমদানিকারক ও রিফাইনাররা মূল্য সমন্বয়ের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। তাদের দাবি ছিল, মূল্য সমন্বয় না হলে তারা ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়বেন এবং পুঁজি সংকটে পড়বেন।
সরকার বিষয়টি একাধিকবার যাচাই-বাছাই করেছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, আমদানি ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত খরচ বিবেচনায় নিয়ে দেখা গেছে, মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবিত পুরো মূল্য বৃদ্ধি গ্রহণ করা হয়নি। ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে সীমিত পরিসরে এ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভোক্তারা এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে নেবেন। একই সঙ্গে এই সমন্বয়ের ফলে আমদানিকারক ও রিফাইনারদের লোকসানের চাপ কিছুটা কমবে এবং বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।
এদিকে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হলেও পাম তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে ১ লিটার খোলা পাম তেল ১৬১ থেকে ১৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি লিটার খোলা সুপার পাম তেল ১৬৫ থেকে ১৭২ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।
ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানামালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে এ বিষয়ে ১২ এপ্রিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়েছিল। সেদিন বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘ভোজ্যতেল সংবেদনশীল পণ্য। আমরা ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো শুনেছি। এগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে খুব দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে, যাতে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা যায়।’
আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে দেশীয় পরিশোধন কারখানামালিকেরা বেশ কিছুদিন ধরে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) এ প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে। বিটিটিসি কিছুটা দরবৃদ্ধির পক্ষে যৌক্তিকতা আছে বলে মত দেয়।
এদিকে ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ৮ এপ্রিল ‘ভোজ্যতেলের বাজারে কারসাজি ও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে’ মানববন্ধন করে। ক্যাবের নেতারা তখন বলেন, দেশের বাজারে প্রায় দুই মাস ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহসংকট চলছে। বোতলের গায়ে লেখা দামের (এমআরপি) চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কোথাও কোথাও। বোতলজাত সয়াবিনের সংকটের মধ্যে বেড়েছে খোলা সয়াবিন তেলের দামও।
মানববন্ধন থেকে ছয়টি দাবি তুলে ধরে ক্যাব। এগুলো হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামে ভোজ্যতেল বিক্রি অবিলম্বে নিশ্চিত করা, সয়াবিন তেলের বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট চক্র চিহ্নিত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, বাজারে নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি এবং অভিযান পরিচালনা করা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, নন-ফুড গ্রেড ড্রামে তেল সংরক্ষণ ও বিক্রি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা এবং ভোজ্যতেলের জন্য ফুড-গ্রেড পাত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
এদিকে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন গতকাল বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, নতুন দাম বুধবার থেকেই কার্যকর করা হয়েছে।