ঢাকার উপর চাপ কমাতে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক (বেসিক) সুবিধাগুলোকে দেশের সব অংশেই পর্যায়ক্রমিকভাবে গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিন গতকাল বুধবার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মানুষের সুযোগ-সুবিধা সেটি চাকরি বাকরির ক্ষেত্রে হোক, চিকিৎসার ক্ষেত্রে হোক, পড়ালেখার ক্ষেত্রে হোক, বাচ্চাদের সবকিছুই ঢাকা-কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে। একদিন দুইদিনে না, এটি বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে। আনফরচুনেটলি সারা দেশকে ঘিরে এই সুবিধাগুলো আমরা হয়তো সেভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হইনি এখনও। সে কারণেই স্বাভাবিকভাবে সারা দেশ থেকে মানুষ ঢাকামুখী হয়ে থাকে। সেটি কর্মসংস্থানের সুবিধার জন্য হোক, সন্তানদের লেখাপড়ার জন্যই হোক, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্যই হোক না কেন। সেজন্যই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ধীরে ধীরে দেশের সব অংশেই পর্যায়ক্রমিকভাবে এই বেসিক সুবিধাগুলোকে গড়ে তোলা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বিভিন্ন শিল্পায়ন গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ শিল্পায়িত অঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে আমরা চেষ্টা করছি দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা সেবাও গড়ে তুলতে এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্মদের লেখাপড়ার জন্য ধীরে ধীরে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে। আমরা মনে করি এই সুবিধাগুলো যদি আমরা গড়ে তুলতে পারি তাহলে মানুষ ঢাকা শহরে আসার জন্য কম উৎসাহিত হবে। এর মাধ্যমেই ধীরে ধীরে ঢাকার উপরে চাপ কমাতে সক্ষম হব বলে আমরা মনে করি।

বৃষ্টিতে ফসল হারানো কৃষকদের টানা তিন মাস সহায়তার ঘোষণা

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রবল বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের টানা তিন মাস সরকারি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই মানবিক ও জরুরি পদক্ষেপের কথা জানান।

প্রধানমন্ত্রী জানান, এরই মধ্যে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো কৃষক যেন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে সরকার কঠোর নজরদারি রাখছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহসহ তিনটি নির্দিষ্ট জেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত সময়ের মধ্যে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হবে। প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে আগামী তিন মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে এই সরকারি সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামবাসীর কষ্টের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন প্রধানমন্ত্রী

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর চরম ভোগান্তিতে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। এই সমস্যা সমাধানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব মানুষকে এই দুর্যোগ থেকে বের করে আনতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানের পয়েন্ট অব অর্ডারে করা এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম শহরের একটি বড় অংশ এখন তলিয়ে গেছে, মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যে প্রশাসক আছেন, ওনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি এর মধ্যেই সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখন তো এটি অনেক বড় একটি জলাবদ্ধতা হয়ে গেছে, স্বাভাবিকভাবেই এটি নিরসনে একটু সময় লাগবে।

চট্টগ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী আবেগপূর্ণ কণ্ঠে বলেন, এই কষ্টের জন্য আমি আমার অবস্থান থেকে চট্টগ্রাম শহরে বসবাসকারী সব নাগরিকের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যাটা থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসা যায়।

শুধু চট্টগ্রাম নয়, ঢাকার জলাবদ্ধতা ও সারাদেশে এই সমস্যার বিস্তৃতির কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এটি আমাদের অনেক দিনের সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে একজন রাজনীতিবিদ বিশেষজ্ঞ ছিলেনÑশহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি সারাদেশে খাল খননের মাধ্যমে পানির আধার তৈরি এবং বন্যা ও জলাবদ্ধতা দূর করেছিলেন। আমাদের সেই খাল খনন কর্মসূচিতেই ফিরে যেতে হবে এবং সরকার এরইমধ্যে তা শুরু করেছে।

জলাবদ্ধতার পেছনে জনসচেতনতার অভাবকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন ড্রেন ও খালগুলোতে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিনসহ নানা বর্জ্য ফেলায় পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার পরিষ্কার করার কয়েকদিনের মধ্যেই আবার ময়লা ফেলে ব্লক করে দেওয়া হচ্ছে। এখানে সব সংসদ সদস্যের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধÑআসুন আমরা জনসচেতনতা বৃদ্ধি করি। প্লাস্টিক বা পলিথিন কীভাবে ডিসপোজ করতে হয়, তা জনগণকে শেখাতে হবে। এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

চাঁদপুর ও নীলফামারীতে মেডিকেল কলেজ-হাসপাতাল নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে

চাঁদপুর ও নীলফামারীতে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।

মো. হাফিজ ইব্রাহিমের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

তিনি বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভূমিহীন, গৃহহীন, ঠিকানাহীন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনের ফলে দুর্গত পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য বর্তমানে 'গুচ্ছগ্রাম-৩ পর্যায় প্রকল্প' গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সারা দেশে মোট ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। তার মধ্যে ২৩টি মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যা ও তদূর্ধ্ব হাসপাতালের কার্যক্রম চলমান আছে। বর্তমানে ৮টি মেডিকেল কলেজের (যশোর, পাবনা, কক্সবাজার, নোয়াখালী, রাঙামাটি, সুনামগঞ্জ, পটুয়াখালি ও জামালপুর) সঙ্গে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া মাগুরা, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা এবং নওগাঁ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের লক্ষ্যে ডিপিপি প্রণয়নের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে; বাকি ২টি (চাঁদপুর ও নীলফামারী) মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

৩৭৮১৪ পরিবারের ‘নারী প্রধানকে’ ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে এরইমধ্যে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারের ‘নারী প্রধানকে’ ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।

সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়ালের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে বিভিন্ন আইন এবং বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল টোল ফ্রি হেল্প লাইন, ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি), ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেল, ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরী, ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, মহিলা, শিশু ও কিশোরী হেফাজতীদের নিরাপদ আবাসন কেন্দ্র রয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলা এবং ৩টি সিটি কর্পোরেশনে ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারের নারী প্রধানকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠী, বিশেষত নারীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততার ঝুঁকি প্রশমন ও অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং জীবিকার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘জেন্ডার রেসপন্সিভ ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন’ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় (খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা এবং সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলা) বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

সংসদ সদস্য আমির এজাজ খানের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপকূলীয় জেলা খুলনার দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা ভয়াবহ নদী ভাঙনের ঝুঁকি সম্পর্কে সরকার অবগত। দাকোপ উপজেলায় ৬০-এর দশকে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। বেড়িবাঁধটি নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে সময়ে সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই, দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলাবাসীর জীবন ও সম্পদ রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নদীভাঙন রোধকল্পে সরকার ইতোমধ্যেই বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।