৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের ফলেই ফাঁসির দ- থেকে মুক্তি পেয়ে জনগণের ভোটে সংসদে আসার সুযোগ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি সুপ্রিম কোর্টের সর্বোচ্চ আদালতে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামী ছিলাম। যেকোনো মুহূর্তে আমার ফাঁসি কার্যকর করা হতো। ঠিক সেই মুহূর্তে ২৪ সালের ৫ই আগস্ট বিপ্লব বলি অথবা অভ্যুত্থান বলিÑতার মাধ্যমে আমার মুক্তির পথ সুগম হয়।
গতকাল বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনিত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
আজহারুল ইসলাম বলেন, জুলাই যোদ্ধা যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। যারা পঙ্গুত্ব বরণ করে এখনো হাসপাতালে আছেন, তাদের সুচিকিৎসা এবং তারা যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে আমাদের সমাজে বসবাস করতে পারে, সেই দোয়া আল্লাহর কাছে করছি।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন হঠাৎ করে হয়েছে এটাও যেমন ঠিক নয়, তবে জুলাই আন্দোলন একটা সরকার পরিবর্তনের জন্য হয়নি। একটা সরকার যাবে আর একটি সরকার আসবেÑএই আন্দোলন তা ছিল না। একটা পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল। সময় যেহেতু কম, আমি ব্যাখ্যায় না গিয়ে এই পরিবর্তন আন্দোলন ছিল বলেই আমাদের ঐক্যমত কমিশনের মাধ্যমে আমরা সুপারিশ দাঁড় করিয়েছিলাম, যার মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং জনগণ ৭০ ভাগ গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, জুলাই আন্দোলনে শুধু বাংলাদেশের জনগণই অংশগ্রহণ করেনি। আমি ধন্যবাদ জানাবো আমাদের বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী প্রবাসী ভাই ও বোনদের। তারা যদি ওই কয়েক মাস রেমিট্যান্স দেওয়া বন্ধ না করতো, তাহলে এই আন্দোলন আরও বেগবান হতো না। অতএব তারা আমাদের এই আন্দোলনের শরিক। আমি ধন্যবাদ জানাবো যারা বিদেশে সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন, তারা জনমত গঠনে অনেক ভূমিকা রেখেছেন। আমরা আজকে তাদের কথা ভুলে যাই। আমরা তাদের স্মরণ করি না। অতএব এই জুলাই আন্দোলন এদেশের আপামর জনগণের। এ আন্দোলনে শরিক ছিলেন আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনেরা, এ আন্দোলনে শরিক ছিলেন বিদেশে অবস্থানরত সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্টরা। তাদেরকে আমাদের পক্ষ থেকে জানাই সংগ্রামী সালাম।
এটিএম আজহার বলেন, আজকে আমাদের বিরুদ্ধে অনেক অসত্য কথা বলা হয়েছে। এই অসত্য কথা আমরা যারা প্রবীণÑআমাদের বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে, যোগাযোগ ছিল, আন্দোলনে শরিক ছিলাম। ৯৫-৯৬ আন্দোলন থেকেই আমরা পাশাপাশি আন্দোলন করেছি। আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। এজন্য এ প্রসঙ্গেও আমি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া যখন প্রেসিডেন্ট হলেন তার আগেই আমরা তাঁর সঙ্গে ছাত্র আন্দোলন এবং ছাত্র সংগঠনের দায়িত্বে ছিলাম। সংগ্রামী মাননীয় স্পিকার, আমি তাই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে। শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে, যারা সংগ্রাম করেছেন এদেশের জনগণের জন্য।
তিনি জিয়াউর রহমান সর্ম্পকে বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া অমর হয়ে থাকবেন তিনটি কারণে। তিনি বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শহীদ জিয়া অমর হয়ে থাকবেনÑতিনি ঐক্যের রাজনীতি করেছিলেন। তাঁর ঐক্যের রাজনীতিতে আপনারা জানেন, শাহ আজিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আব্দুল আলীমের মতো লোক মন্ত্রিসভায় ছিলেন। আজকে অনেক মুক্তিযোদ্ধার পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলা হয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে ছিলেন। তাঁর ৭ই নভেম্বর বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ আধিপত্যবাদ মুক্ত হয়। এই তিনটি কারণে তিনি আজকে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
তিনি বেগম খালেদা জিয়া সর্ম্পকে বলেন, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া, তিনিও অমর হয়ে থাকবেন। তিনি বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি জনগণের কাছে খেতাব পেয়েছেন আপসহীন নেত্রী। এটা আমরা সবাই জানি। এবং তিনিও ঐক্যের রাজনীতি করেছেন। যে ঐক্যের মধ্যে তাঁর কাছে কোনো ডান-বাম কোনো ভেদাভেদ ছিল না। যেটা ছিল না প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়। তিনি দেশকে গঠন করতে চেয়েছিলেন এবং করতে পেরেছিলেন।
১৯৯১ সালে আপনারা জানেন যে নির্বাচন পঞ্চম সংসদের হয়, সেই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পায়। আর জামায়াতে ইসলামী পায় ১৮টি। তখন কিন্তু এ প্রশ্ন আসে নাই জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কি না। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেই আমরা সরকার গঠনে সমর্থন দেই। আমাদেরকে অফার করা হয়েছিল মন্ত্রীত্ব দেওয়ার জন্য, আমরা গ্রহণ করিনি দেশ এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে। আমরা তাঁদের সাথেই ছিলাম। আমরা এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করেছি, আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলন করেছি। আমরা সবাই এক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে করেছি। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের মাধ্যমে আমাদের সরকার গঠন করলাম। সেখানে আমাদের দুইজন মন্ত্রী ছিলেন। তৎকালীন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির, সফল মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীÑপ্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তী সময়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এবং মুজাহিদ সাহেবও ছিলেন। এ প্রসঙ্গে আমি তাঁদেরকে স্মরণ করি। আপনারা জানেন যে, আপনারা তাঁদেরকে মিথ্যা মামলায় সাজিয়ে তাঁদেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ করে ১৬ বছরে দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে কেউ নিগ্রহ-নির্যাতনের শিকার হয়নি। আর কোনো দলের প্রধান নেতা থেকে আরম্ভ করে সেক্রেটারি জেনারেল থেকে আরম্ভ করে ১১ জন ভাইকে জেলখানায় ফাঁসি দিয়ে এবং বিনাচিকিৎসায় হত্যা করা হয়Ñএটা আর কোনো দলের ছিল না। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রমাণ করেছে তারা বাংলাদেশের জনগণকে ভালোবাসে। তারা জীবনকে ক্ষয় করে জীবন রক্ষা করার জন্য, সুন্দর জীবন যাপনের জন্য কোনো সময় দেশ থেকে পালিয়ে যায়নি। তারা মনে করে যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে তাদের অনেক বিপদ নেমে আসবে, কিন্তু দেশ থেকে পালায়নি। এমনকি শহীদ নিজামী সাহেব তখন আমেরিকায় অবস্থান করতেন। তাঁকে অনেকেই বলেছে যে আপনি দেশে আসবেন না, গ্রেপ্তার করা হবে, মামলা দেওয়া হবে, ফাঁসি হবে। তিনি দেশে এসেছেন, গ্রেপ্তার করা হয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন, শহীদ হয়েছেনÑকিন্তু দেশ তো ছাড়েন নাই। আমরা আজকে অনেকেই অনেক কথাই বলছি যে আমি এই করেছি, সেই করেছি। এদেশের জনগণ জানে কারা ত্যাগ বেশি স্বীকার করেছে। আমি কারো ত্যাগকে অস্বীকার করি না, ছোট করে দেখতে চাই না। কিন্তু এমন কথা বলবেন না যা জনগণ বিশ্বাস করে না এবং আমাদের মনে আঘাত সৃষ্টি করে।
তিনি নিজ এলাকা সর্ম্পকে বলেন, আমার এলাকা অত্যন্ত গরীব এলাকা। উত্তরবঙ্গের রংপুর অঞ্চলের মধ্যে আমার বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ অত্যন্ত গরীব। সেখানে ৭৫ ভাগ রাস্তা কাঁচা রয়েছে, সেখানে পাকা রাস্তার ব্যবস্থা হয়নি। আমি শুধু দৃষ্টি আকর্ষণ করব। যানজট আমার পুরাতন বন্দর, যেটাকে বলে বদরগঞ্জ। আপনার বন্দর, সেখানে রাস্তা এত চিকন-সরু যার কারণে পার্বতীপুর থেকে যে আর্মিরা আসেন, সাধারণ লোকরা আসেন, রংপুর ক্যান্টনমেন্টে যান, রাস্তায় প্রতিদিন যানজট হচ্ছে। আমি অনুরোধ করব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে একটা বাইপাস করার জন্য। সাথে সাথে পার্বতীপুর থেকে রংপুর পর্যন্ত দুই লেনের রাস্তাকে চার লেন করলে রাস্তাটা প্রশস্ত হলে যানজট অনেক কমে যেতে পারে। আমার এলাকায় একটা সুগার মিল আছে, শ্যামপুর সুগার মিল। আমি এই সুগার মিল বন্ধ রয়েছে। আমাদের মন্ত্রী যখন শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন তখন এটা লাভজনক ছিল। আওয়ামী লীগ এসে এটাকে অলাভজনক করল। এখন বন্ধ হয়েছে। এবং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে বন্ধ সমস্ত শিল্প কারখানা বন্ধ চালু করা হবে। আমি অনুরোধ করব খুব দ্রুত গতিতে আগামী বাজেটেই যাতে করে শ্যামপুর সুগার মিল পূর্ণাঙ্গ চালু হতে পারে তার ব্যবস্থার আহ্বান জানাব। হাসপাতালের কথা বললাম না, কারণ সারা বাংলাদেশ হাসপাতালের সমস্যা। হাসপাতাল আছে ক্লিনার নাই, এত অপরিচ্ছন্ন। এটা ইমিডিয়েটলি তাদের নিয়োগ করা উচিত। হাসপাতালে রোগী গিয়ে যদি পরিচ্ছন্ন না পায় তার রোগ তো আরও অর্ধেক বেড়েই যাবে। এ জন্য আপনারা চেষ্টা করবেন। তারাগঞ্জ হাসপাতাল ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে কিন্তু কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। এজন্য আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করব ৫০ শয্যা চালু করবেন এবং ১০০ শয্যায় উন্নীত করবেন। আমার এলাকায় সবচেয়ে মাদকের সমস্যা, সীমান্ত এলাকার বেশি কাছাকাছি। যুব সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সেটা সারা দেশের সমস্যা। কোনো খেলার মাঠ নেই। আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে অনুরোধ করব যাতে করে সেখানে খেলার মাঠ মিনি স্টেডিয়াম করা হয়।