পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) শুধু বাংলাদেশিদের নয়, আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ভিসাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে। তিনি জানান, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৫ হাজার নয়, এ পর্যন্ত ৬২৬ জন বাংলাদেশি এ সমস্যার মুখে পড়েছেন।

আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।

ব্রিফিংয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরও উপস্থিত ছিলেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, ‘এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়। পাকিস্তান, মিসর, ফিলিপাইন, নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ভিসাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে।’

তিনি বলেন, কয়েকটি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশির ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমাদের দূতাবাস এবং ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আজকের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা পর্যন্ত প্রকৃত সংখ্যা ৬২৬।’

তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৪১৭ জনের বিস্তারিত তথ্য ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তাদের ভিসা নবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

অবশিষ্টদের তথ্যও পর্যায়ক্রমে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।

শামা বলেন, আবুধাবি ও দুবাইয়ে বাংলাদেশের মিশন ইতোমধ্যে ইউএই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং আগামী সপ্তাহে আরও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিবাচক ফলাফল প্রত্যাশা করছি।’

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের স্বাগতিক দেশের আইন কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেক শ্রমিক জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করেন, এমনকি বিদেশে কাজের সুযোগ পেতে জমিজমাও বিক্রি করেন।

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে স্থানীয় আইন লঙ্ঘন করলে তারা আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।

‘আপনারা অনুগ্রহ করে স্বাগতিক দেশের আইনবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকুন,’ তিনি বলেন।

শামা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশ দূতাবাস যোগাযোগ করছে, যাতে জানা যায় চাকরি হারানো বা নিয়োগকর্তাসংক্রান্ত কোনো কারণে ভিসা বাতিল হয়েছে কি না।

যদি নিয়োগকর্তার সিদ্ধান্তের কারণে ভিসা বাতিল হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে সম্ভাব্য সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে তিনি জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার জাল কাগজপত্র ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করছে, কারণ এটি শুধু ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিকর নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক শ্রমবাজারের জন্যও নেতিবাচক।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে।

প্রয়োজনে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রবাসী কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে জাল কাগজপত্র ব্যবহারের জন্য আরও কঠোর শাস্তির বিধান করা যায়।

শামা বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও সরাসরি কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’

সংবেদনশীল অভিবাসন-সংক্রান্ত বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করার জন্যও তিনি গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সামগ্রিক ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যা, বিদেশে যেতে উচ্চ ব্যয় এবং অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালচক্রের কর্মকাণ্ডও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

সরকার অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং প্রতারণামূলক প্রতিষ্ঠান ও দালালদের হাত থেকে কর্মীদের রক্ষায় কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে শামা বলেন, মিয়ানমারে কারাদণ্ড শেষ করেছেন এমন ২৭ জন বাংলাদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ চলছে।

তিনি বলেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে সমন্বয় এখনো জটিল হলেও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও অন্যান্য সংস্থা এ বিষয়ে কাজ করছে।

তিনি আরও জানান, সম্প্রতি ভারতের চেন্নাইয়ে আটক কয়েকজন বাংলাদেশিকেও দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার সফল হয়েছে।

শামা বলেন, অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার মোকাবিলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি মাইগ্রেশন উইং গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অবৈধ অভিবাসন রোধে সরকার তৎপরতা জোরদার করেছে এবং এ বিষয়ে তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতা তৈরিতে জেলা প্রশাসকদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

তিনি জানান, বিশেষ করে পর্যটক ভিসায় বিদেশে গিয়ে চাকরির প্রলোভনের ঘটনা ঠেকাতে অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোরভাবে ভ্রমণকারীদের তথ্য যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, শ্রম ভিসাসহ অন্যান্য ভিসার আবেদনকারীদের জন্য কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয় সে বিষয়ে সরকার শিগগিরই নির্দেশিকা প্রকাশ করবে।

এরপর বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, ছুটিতে দেশে এসে যাদের ইউএইর ভিসা বাতিল হয়েছে, তাদের জন্য বাংলাদেশে একটি বিশেষ হটলাইন চালু করা হবে।

এ ছাড়া ইউএইতে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের নিবন্ধন, সমস্যার ধরন শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য পৃথক একটি জরুরি সেবাও চালু করা হবে।

তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে।

নুর প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বাগতিক দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা সংঘাতে জড়িত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে দেশের ভাবমূর্তি ও বৈদেশিক শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের এমন কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে, যা তাদের অবস্থানরত দেশের আইন লঙ্ঘন করতে পারে।

তিনি বলেন, অল্প কয়েকজনের ভুল কর্মকাণ্ড পুরো বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং বৃহত্তর প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নুর বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী জাল কাগজপত্র তৈরি বা দাখিলের অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো জাল কাগজপত্র শনাক্ত হলে তা জব্দ করা হবে এবং যারা এসব তৈরি, ব্যবহার বা সরবরাহের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, জাল কাগজপত্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ যে কঠোর অবস্থানে রয়েছে, তা বিদেশি সরকারগুলোর কাছে স্পষ্ট করতে সংশ্লিষ্ট আইন আরও কঠোর করার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে।

সূত্র: বাসস