ক্যানসারের নাম শুনলেই মানুষের মনে এক ধরণের ভীতিকর ধারণা তৈরি হয় যে এটি একটি নিরাময় অযোগ্য ও মারাত্মক রোগ। কিন্তু সত্তরের দশকের পর থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের কারণে ক্যান্সারে আক্রান্তদের বেঁচে থাকার হার তিনগুণ বেড়েছে।
বাস্তবে, সঠিক সময়ে রোগ ধরা পড়লে এবং মারাত্মক পর্যায়ে যাওয়ার আগে চিকিৎসা শুরু হলে বেশিরভাগ ক্যানসারই নিরাময়যোগ্য।
সমস্যা হলো, অনেক সময়ই আমরা ছোটখাটো উপসর্গগুলোকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিই না বা চিকিৎসকের কাছে যেতে দ্বিধাবোধ করি। যুক্তরাজ্যের ক্যানসার গবেষণা সংস্থার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি মানুষ জীবনে এমন কোনো উপসর্গে ভুগেছেন যা ক্যানসারের উপস্থিতি নির্দেশ করতে পারে, অথচ একটি বড় অংশ একে পাত্তাই দেননি।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক ক্যাটরিনা হুইটেকার বলেন, মানুষ প্রায়ই মনে করেন স্বাস্থ্য নিয়ে অতি উদ্বিগ্ন হওয়া বা চিকিৎসকের কাছে যাওয়া মানে সময় ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্পদ নষ্ট করা। অথচ এই মানসিকতা কাটিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বা হুশিয়ারি সংকেতযুক্ত উপসর্গগুলোকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির মতে, যে ১০টি সাধারণ উপসর্গ দেখা দিলে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়:
১. ব্যাখ্যাহীন ওজন হ্রাস: কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে ৫ কেজি বা তার বেশি ওজন কমে যাওয়া অগ্ন্যাশয়, পাকস্থলী, খাদ্যনালী বা ফুসফুসের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
২. জ্বর: জ্বর ক্যানসার আক্রান্তদের একটি সাধারণ উপসর্গ। বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে এমন ক্যান্সার যেমন লিউকেমিয়া বা লিম্ফোমার ক্ষেত্রে এটি প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
৩. অতিরিক্ত ক্লান্তি: পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি চরম ক্লান্তিভাব দূর না হয়, তবে এটি ক্যানসার বাড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ হতে পারে।
৪. ত্বকের পরিবর্তন: ত্বক কালো হয়ে যাওয়া (হাইপারপিগমেন্টেশন), ত্বক ও চোখ হলুদ হওয়া (জন্ডিস), ত্বক লাল হওয়া, চুলকানি কিংবা মাত্রাতিরিক্ত চুল বৃদ্ধি ত্বকের পরিবর্তনের লক্ষণ।
৫. অন্ত্র ও মূত্রাশয়ের কার্যক্রমে পরিবর্তন: দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, বা মলের আকৃতিতে পরিবর্তন মলাশয়ের ক্যানসারের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে প্রস্রাবের সময় ব্যথা, রক্তপাত বা মূত্রাশয়ের কার্যক্রমে অস্বাভাবিকতা প্রোস্টেট বা মূত্রাশয়ের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
৬. দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত: শরীরের কোনো ক্ষত চার সপ্তাহের বেশি সময় ধরে না সারলে, কিংবা মুখ বা জননাঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত থাকলে তা অবিলম্বে পরীক্ষা করানো উচিত।
৭. অস্বাভাবিক রক্তপাত: কাশির সাথে রক্ত, মলের সাথে রক্ত, যোনিপথে অস্বাভাবিক রক্তপাত, মূত্রের সাথে রক্ত বা স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত-মিশ্রিত তরল বের হওয়া বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের স্পষ্ট লক্ষণ।
৮. দেহে শক্তভাব বা চাকা অনুভূত হওয়া: স্তন, অণ্ডকোষ, গ্রন্থি এবং শরীরের নরম টিস্যুতে শক্তভাব বা মাংস জমে আছে এমন অনুভূতি হওয়া ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
৯. গিলতে অসুবিধা: ক্রমাগত বদহজম বা কোনো কিছু গিলতে সমস্যা হওয়া ইসোফ্যাগাস, পাকস্থলী বা গলার ক্যানসারের দিকে ইঙ্গিত করে।
১০. টানা কাশি বা কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন: তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে টানা কাশি ফুসফুসের ক্যানসার এবং কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন স্বরযন্ত্র বা থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
উল্লিখিত উপসর্গগুলো সবসময় যে ক্যানসার নির্দেশ করে তা নয়, এগুলো অন্য নানা সাধারণ কারণেও দেখা দিতে পারে। তবে কোনো উপসর্গ যদি সহসাই না যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে কোনো সংকোচ না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।