পেকুয়া সংবাদদাতা : কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঝড়ের তাণ্ডবে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেল ৫টা পর্যন্ত পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাও ভেঙে পড়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে হঠাৎ করেই শুরু হয় কালবৈশাখীর তা-ব। প্রবল ঝড়ো হাওয়া, ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় প্রকৃতি। বিভিন্ন এলাকার টিনের ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে, উপড়ে যায় অসংখ্য গাছপালা। অনেক স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ও ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
মগনামা ইউনিয়নের মহরী পাড়ায় ছাদেক হোসেনের বাড়ির সম্পূর্ণ চাল ও গোয়ালঘর উড়ে যাওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। উপজেলার বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কে গাছ পড়ে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে, ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও বিঘœ ঘটে।
ঝড়ের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরা। ফসলি জমিতে আধাপাকা বোরো ধান নুয়ে পড়েছে এবং শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পেকুয়া ইউনিয়নের কৃষক বেলাল জানান, ঝড়ে তার একাধিক ক্ষেতের ধান নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে।
শিলখালী ইউনিয়নের কৃষক আবু মিয়া বলেন, তার জমির প্রায় সব ধানই ঝড়ে নুয়ে পড়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ অবস্থায় ভালো ফলন পাওয়া কঠিন হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকারের সহায়তা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকায় আর্থিক লেনদেনেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। চৌমুহনী এলাকার বিকাশ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন জানান, নেটওয়ার্ক না থাকায় মানুষ জরুরি অর্থ লেনদেন করতে পারছেন না, ফলে ভোগান্তি বেড়েছে।
পেকুয়া পল্লী বিদ্যুতের এজিএম খন্দকার মোহাম্মদ ফিরোজ কবির বলেন, ঝড়ে গাছের ডালপালা পড়ে বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত লাইন দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।
এদিকে, পেকুয়া ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক শরীফ বলেন, আকস্মিক এই কালবৈশাখী ঝড়ে তাৎক্ষণিক বড় কোনো প্রাণহানির খবর না পাওয়া গেলেও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
কাপ্তাই সংবাদদাতা : কাপ্তাই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের তা-বে উপজেলার বিভিন্ন সড়কে গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং বহু স্থানে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে সৃষ্টি হয় বিদ্যুৎ বিপর্যয়।
মঙ্গলবার দুপুরের দিকে শুরু হওয়া ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে ভারী বৃষ্টিতে এমন ঘটনার সৃষ্টি হয়। ঝড়ের তীব্রতায় উপজেলার কলেজ এলাকাসহ একাধিক এলাকায় বড় বড় গাছ সড়ক ও বাড়ি ঘরের ওপর ভেঙে পড়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, ঝড়ের সময় হঠাৎ করে প্রবল বাতাসে ঘরবাড়ি ও গাছপালা দুলতে শুরু করে। অনেকেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। ঝড় থামার পর সড়ক ও বাসা বাড়ির উপর পড়ে থাকা গাছ সরাতে স্থানীয়রা নিজেরাই কাজ শুরু করেন।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত কাজ শুরু করা হয়েছে। সড়ক থেকে গাছ অপসারণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোকজনরা কাজ করছেন।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কাজ চলছে।
রামু (কক্সবাজার) : কক্সবাজারের রামু উপজেলায় আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের উপর দিয়ে বয়ে যায় ভয়ংকর ঝড়ো হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টিপাত।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ করে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে প্রবল বেগে ঝড় শুরু হয়। ঝড়ের তীব্রতায় বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে এবং অনেক গাছের ডাল ভেঙে সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কিছু সময়ের জন্য স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘিœত হয়।
এদিকে ঝড়ের দমকা হাওয়ায় বহু ঘরের টিনের চালা উড়ে গেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে উপজেলার গ্রামীণ এলাকায় বসতঘর ও কৃষকের ঘরবাড়ি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঝড়ের সঙ্গে বজ্রপাতও হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তবে এখন পর্যন্ত হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
রামু উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে।
এদিকে ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করতে কাজ করছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
কুলাউড়া
কুলাউড়া উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকায় তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নাই। এই তিনদিনের মধ্যে একটিবারের জন্যও বিদ্যুৎ আসেনি কিছু এলাকায়। উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নে গত তিন দিন ধরে অন্ধকারে ডুবে আছেন হাজারো মানুষ । প্রবাসী অধ্যুষিত এই এলাকার প্রবাসীরা তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে না পারায় ফেইসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। করছেন সরকারের সমালোচনা। বারবার যোগাযোগ করেও বিদ্যুৎ অফিসের কর্মীরা কোনো কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারছেনা। জানা যায় লাগাতার ঝড় বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন জায়গায় বৈদ্যুতিক তারের উপর গাছপালা পড়ে বিপত্তি ঘটে কিন্তু কর্মী সংকটে থাকা কুলাউড়া বিদ্যুৎ অফিস যেন এখন গলারকাঁটা হয়ে দাড়িয়েছে। ভুকশিমইল ইউনিয়নের মতো একই অবস্থা টিলাগাও, হাজিপুর, শরীফপুর কর্মধা ইউনিয়নেও। এসব এলাকার স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, এরকম গুরুত্বহীন জীবন যাপন আমরা কখনোই করিনি, বিদ্যুৎহীন অবস্থায় চলছে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়ালেখা। এতে অভিভাবকেরাও দুশ্চিন্তার কথা জানান।
রাণীনগর (নওগাঁ)
নওগাঁর রাণীনগরে সোমবার ভোর রাতে কাল বৈশাখীর তান্ডবে উঠতি ইরি-বোরো ধান জমিতে নূয়ে পড়েছে। পাকা ধানগুলো কাটার আগে এমন প্রাকৃতিকব দূর্যোগে ফলন বিপর্যয়ের আশংকা করছেন চাষিরা। বৈশাখ মাসের ঘনকালো মেঘ যেন চাষিদের মনে আতংকের ভাঁজ পরছে। কৃষি বিভাগ চাষিদের বাড়ি বাড়ি কিম্বা মাঠে গিয়ে যত তড়াতাড়ি সম্ভব পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্ত শ্রমিক সংকট যেন চাষিদের আতঙ্কের নতুন মাত্রা যোগ দিয়েছে। প্রতি বছর এই সময় দেশের দক্ষিন জেলাগুলো থেকে শ্রমিক আসলেও এবছর তেমন শ্রমিক আসছে না। ফলে মাঠে যে পরিমান ধান পেকেছে শ্রমিক সংকটের কারণে চাষিরা ইচ্ছেমত ধান কাটতে পারছে না। কম-বেশি যে শ্রমিকগুলো পাওয়া যাচ্ছে তারা আবার ধান নূয়ে পরার কারণে বিঘা প্রতি অতিরিক্ত টাকা চাচ্ছে। বাড়ির অদূরে জমি থেকে ধান কাটতে শ্রমিকরা ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার নিচে প্রতি বিঘা ধান কাটতে তারা নারাজ। এদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজার দর কম, এবং শ্রমিক সংকট প্রকোট হওয়ায় এলাকার চাষিদের সোনালিী হাঁসির বদলে এখন কপালে চিন্তার ভাঁজ।
উপজেলার হরিশপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল আহাদ বলেন, আমি সোয়া তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। সোমবার ভোর রাতে কাল বৈশাখী ঝড়ে প্রায় সব ধান মাটিতে নূয়ে পড়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে ধানগুলো কাটতে পারছি না। এলাকার শ্রমিকরা প্রতি বিঘা জমির ধান কাটতে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা চাচ্ছে। আকাশ খারাপের কারণে ধানের দামও কমতির দিকে। সব মিলে এবার লোকসানের আভাস দেখতে পাচ্ছি। আজও আকাশের অবস্থা ঘনকালো মেঘে আচ্ছান্ন। যে কোন সময় ঝড়-বৃষ্টি নামতে পারে।
জানা গেছে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে উপজেলার ৮ টি ইউনিয়নে ১৮ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধান চাষ করা হয়। উপজেলার পশ্চিমাংশে বিল মুনসুর ও বিল চৌর ও নওগাঁর ছোট যমুনা নদী বেষ্টিত নিম্নাঞ্চল হওয়ায় উর্বরা পলি মাটির জমিতে একমাত্র ইরি-বোরো ধান ব্যাপক আকারে চাষ হয়েছে। ধানের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও কাল বৈশাখীর তা-বে চাষিদের মুখে এখন ফলন বিপর্যয়ের বিষাদের সুর। এদিকে ধান কাটার শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে। শ্রমিকের মজুরি গুণতে হচ্ছে চড়া দামে। তবুও কৃষক যে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগের আশংকায় শ্রমিকদের চড়া মজুরি দিয়ে আগে ভাগে জমির পাকা ধান কেটে ঘরে আনার চেষ্টা করছে।
মতলব (চাঁদপুর)
চাঁদপুরের মতলব উত্তরে কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রসহ প্রবল শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্যমতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপজেলার অন্তত ৪৪৫ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এতে বোরো ধান, ভুট্টা, পাট, তিল, মুগ ও গ্রীষ্মকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রোববার রাতের ঝড় ও শিলাবৃষ্টির পর মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কয়েকদিনের তীব্র তাপদাহের পর বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও কৃষকদের জন্য তা নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, মোট আক্রান্ত জমির মধ্যে বোরো ধান ৩২০ হেক্টর, ভুট্টা ৫০ হেক্টর, পাট ২০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন সবজি ৫০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন ভুট্টা ৫ হেক্টর, তিল ৫ হেক্টর এবং গ্রীষ্মকালীন মুগ ৫ হেক্টর রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের আওতাধীন বোরো ধানের মাঠে ধান পাকতে শুরু করেছে। কেউ কেউ ধান কাটা শুরু করেছেন, আবার অনেকে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেক কৃষক ধান কেটে জমিতে রেখে এসেছিলেন। অন্যদিকে ভুট্টাও পাকতে শুরু করায় কেউ কেউ তা তুলে বাড়ির উঠোনে শুকাতে দিয়েছিলেন। হঠাৎ বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে এসব ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া উপজেলার কয়েকটি স্থানে ঝড়ে গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক চলাচলে সাময়িক বিঘœ ঘটে। বিভিন্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়ে, বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এতে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।