ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) শাখা ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে ছাত্রদলের এক কর্মীর থাপ্পড় দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে। পরে এ ঘটনার জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। সেখানে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের উপর বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে শাখা ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা দুই হলের পকেট গেটে পিভিসি পাইপ নিয়ে অবস্থান করছে বলে জানা যায়।

দেশীয় অস্ত্রসহ বহিরাগত ও ছাত্রদলের অবস্থান
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রবেশমুখে থাপ্পড়ের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রদল কর্মী হলেন আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আলিনূর রহমান। আর থাপ্পড়ের শিকার ছাত্রশিবির নেতা হলেন দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং শহীদ জিয়াউর রহমান হল শাখা শিবিরের সেক্রেটারি কাজী জুহায়ের। অভিযুক্ত আলীনুর হলের অবৈধ শিক্ষার্থী বলে অভিযোগ ছাত্রশিবিরের।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, লিগামেন্টে আঘাতপ্রাপ্ত কাজী জুহায়ের ক্র্যাচে ভর করে হলের করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় আলিনূর একটি কক্ষ থেকে বের হয়ে রহমান তাকে থাপ্পড় দেন এবং একাধিকবার জুহায়েরকে 'বেয়াদব' বলে সম্বোধন করেন। পরে তার ব্যক্তিগত রুমে অবস্থান নিয়ে বাইরে থেকে তালা দেওয়ায়। ঘটনার পর শিবিরের নেতাকর্মীরা অভিযুক্ত ছাত্রদল কর্মীকে তার কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে আসতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, ছাত্র-উপদেষ্টা ও হল প্রভোস্টের উপস্থিতিতে বিষয়টি সমাধানের জন্য উভয় পক্ষ আলোচনায় বসে।
আলোচনায়, অভিযুক্ত ছাত্রদল কর্মীকে আনতে গেলে শিবির নেতা-কর্মীরা উত্তেজনা সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ দিয়ে বের হয়ে যায় ছাত্রদলের নেতারা। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্রদল কর্মীদের সাথে শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আবারও কথা-কাটাকাটি হয়। এরই একপর্যায়ে সেখানে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ প্রটোকলে অভিযুক্তকে সেখান থেকে বের করে আনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি।
এরপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হল থেকে বেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেন। এ সময় স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে স্থানীয় জামায়াতের দুই কর্মী শহীদুল ও বাবলু আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিবির নেতা জুহায়ের বলেন, “হলের ভেতরে ঢোকার সময় সিঁড়ির কাছাকাছি পৌঁছাতেই আচমকা আলীনূর এসে আমাকে চড় মেরে দেয়। কোনো পূর্বশত্রুতা না থাকা সত্ত্বেও সে নিজেকে স্থানীয় দাবি করে অহংকার দেখায় এবং বলে যে তার মন চেয়েছে বলেই সে আমাকে চড় মেরেছে। আমি যেন যা পারি করে নিই।”
অভিযুক্ত আলীনুর বলেন, “আমি পরীক্ষা দিয়ে হলে গেছি। মোবাইলের চার্জার নিয়ে আমি আসতেছিলাম, টিউবওয়েলে পানি খেয়ে বের হওয়ার সময় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা, তখন আমি বলি যে 'ভাই আপনি বেয়াদব'। সেই সময় ভাই আমারে গালি দিলে আমি একটা থাপ্পড় দিই। এর পর থেকে যা হয়েছে আপনারা দেখেছেন। আগে বেয়াদব বলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এমনি, জানি না।”
এ বিষয়ে ইবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমী মিথুন বলেন, “ঘটনাটি জানতে পেরে আমরা সমাধানের উদ্দেশ্যে প্রভোস্ট, প্রক্টর, ছাত্র-উপদেষ্টাসহ শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসি। কিন্তু শিবিরের পক্ষ থেকে সমাধানের পথে না গিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে হলের বাইরে আমার সদস্য সচিবকে ধাক্কাধাক্কি করা হয়। পরে আমরা সেখান থেকে চলে আসি।”
এ বিষয়ে ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি বলেন, “ঘটনার প্রথম সূত্রপাত ছাত্রদল কর্মী আলীনূরের হাতধরে হয়। তবে আমরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এরপরও ছত্রদল দেশীয় অস্ত্রসহ স্থানীয়দের নিয়ে মেইনগেটে অবস্থান গ্রহণ করে। স্থানীয় জামায়াত কর্মীদের ওপর হামলা করে আহত করে। তবে আমরা এখন অবধি ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছি। এখন প্রক্টর অফিসে আলোচনায় বসেছি। আশা করি একটি সুন্দর সমাধান হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, “আমরা এই ঘটনা শুনতে পেরে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে যাই। উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করি। পরে পুলিশের সহযোগিতায় অভিযুক্তকে নিরাপদে প্রক্টর অফিসে নিয়ে আসি। উভয় পক্ষকে নিয়ে ঘটনা সমাধানের চেষ্টা করছি।”
কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদ বলেন, “এখানে দুই পক্ষের মাঝে একটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। আমরা পুলিশ এসে বিষয়টা দুই পক্ষের সাথে কথা বলে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে বর্তমানে একটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করিয়েছি। তারপরেও আমরা আমাদের অবস্থান এখানে রেখেছি যাতে পরবর্তীতে এটা আরও উত্তপ্ত না হয়।”