চট্টগ্রাম ব্যুরো

পুলিশের অভিযানে মাদক উদ্ধার, মামলা রুজু, জব্দ তালিকা তৈরি-সবই নিয়মমাফিক। এরপর আলামত জমা হয় থানার মালখানায়। আদালতে উপস্থাপন, রাসায়নিক পরীক্ষা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ধ্বংস হওয়ার কথা সেই আলামতের। কিন্তু মাঝপথেই যদি আসল ইয়াবা ‘উধাও’ হয়ে যায়, তার জায়গায় ঢুকে পড়ে নষ্ট কিংবা ইয়াবা সদৃশ ট্যাবলেট, তাহলে সেটি আর নিছক মালখানা ব্যবস্থাপনার অনিয়ম থাকে না। প্রশ্ন ওঠে-মাদক মামলার আলামতই কি পুলিশের হেফাজতে নিরাপদ নয়?

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার ডাঙারচর পুলিশ ফাঁড়ি ও থানার মালখানাকে ঘিরে ওঠা একাধিক গুরুতর অভিযোগে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডাঙারচর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই চায়ন কুমার দাস এবং থানার মালখানা কর্মকর্তা এসআই মাহিন ছারোয়ার।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন মাদক মামলায় জব্দ করা ইয়াবার একটি অংশ কথিত যোগসাজশের মাধ্যমে সরিয়ে মাদক কারবারিদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। পরে সেই ঘাটতি পূরণে অপেক্ষাকৃত নষ্ট, নি¤œমানের বা ইয়াবা সদৃশ ট্যাবলেট আলামত হিসেবে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এমনকি কথিতভাবে পরিবর্তন করা আলামতও পরে আদালতের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি ১৬ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবা ঘিরে।

কর্ণফুলী থানার মামলা নম্বর-০৭, তারিখ ৪ আগস্ট ২০২৬। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) সারণির ১০(গ) ধারায় দায়ের করা এ মামলায় ১৬ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবা জব্দ দেখানোর কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, মামলার জব্দ করা প্রকৃত ইয়াবা আলামত হিসেবে সংরক্ষণের পরিবর্তে একটি বড় অংশ পরিবর্তন করে ফেলা হয়। ১৬ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবা প্রায় ১৬ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। পরে অপেক্ষাকৃত নষ্ট ও ইয়াবা সদৃশ ট্যাবলেট কম দামে সংগ্রহ করে সেই ট্যাবলেটই আদালতে ধ্বংসের জন্য পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মাদক মামলা রুজু হওয়ার পর রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ইয়াবা আলাদা করে রাখা হয়। এরপর অবশিষ্ট আলামত নিয়ে শুরু হয় কথিত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। প্রকৃত ইয়াবার পরিবর্তে নষ্ট বা নি¤œমানের ট্যাবলেট আলামত হিসেবে প্রস্তুত করে আদালতে পাঠানো হয়।

কথিত আলামত বিক্রি ও সরবরাহের সঙ্গে পুলিশের কথিত সোর্স এবং কয়েকজন সদস্যের নামও অভিযোগে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন চেকার হারুন, কনস্টেবল মাসুদ, বাকলিয়া কালামিয়া বাজার এলাকার মামু, ইসহাক, সোহেল, সেলিম, আনোয়ারার রফিক ওরফে ‘সোনা রফিকসহ কয়েকজন।

এছাড়া কর্ণফুলী কলেজ বাজার এলাকার পুলিশের কথিত সোর্স বাবুলের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তার কাছে জব্দ করা ইয়াবা বিক্রি করে দিয়ে পরিবর্তে নষ্ট ইয়াবা আদালতে আলামত হিসেবে পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আলামত বিক্রির কথিত অর্থ ভাগাভাগি নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের আরেকটি অংশে বলা হয়েছে, কথিত আলামত বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে ড্রাইভার কনস্টেবল নূর মোহাম্মদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরোধ দেখা দেয়। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছে এবং বিরোধ এখনো রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এসআই চায়ন কুমার দাসকে ঘিরে রয়েছে আরও একটি বিস্ফোরক অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, ১০ আগস্ট রাতে মইজ্জারটেক চেকপোস্টে ডিউটিরত অবস্থায় ১২ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়। পরে তার সঙ্গে থাকা ফোর্স ও চেকার হারুনের সহায়তায় ওই ইয়াবা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের দাবি, ওই ইয়াবা পরে ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়।

অভিযোগের সবচেয়ে ভয়াবহ অংশ হলো আলামত ধ্বংসের প্রক্রিয়া নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃত আলামত পরিবর্তনের পর সেগুলো আদালতের মাধ্যমে ধ্বংস করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ কাজে জিআর শাখার এএসআই শাহাদাতকে অর্থ দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি শনিবার ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে এসব আলামত ধ্বংস করা হয়।

এসআই চায়ন কুমার দাসের বিরুদ্ধে মাদক আলামত সংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি দায়িত্বাধীন এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, অভিযোগগুলো কি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক? এই পুরো চেইনটি তদন্তের আওতায় না আনলে প্রকৃত চিত্র বের করা কঠিন।

একটি মাদক মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো জব্দ করা আলামত। সেই আলামত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শুধু সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য নয়, মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বিশেষ করে ৪ আগস্টের ১৬ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবার মামলার জব্দ তালিকা, মালখানা রেজিস্টার, রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন, আদালতে পাঠানো আলামত এবং ধ্বংসের আদেশ-সব নথি একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। সঙ্গে ১০ আগস্টের মইজ্জারটেক চেকপোস্টের কথিত ১২ হাজার ইয়াবার ঘটনাটিও তদন্তে আনা জরুরি।

কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল-পুলিশের হাতে উদ্ধার হওয়া ইয়াবা কি পুলিশের মালখানায় নিরাপদ? আর যদি জব্দ করা মাদকের আলামতই হেফাজতে থাকা অবস্থায় বদলে যাওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে আদালতে দাঁড়িয়ে মাদক মামলার সত্যতা প্রমাণ হবে কীভাবে? এখন তাই প্রয়োজন অভিযোগ চাপা দেওয়া নয়, আবার অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও নয়-প্রয়োজন আলামতের প্রতিটি পিসের হিসাব বের করা।