২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর কথিত যুদ্ধাপরাধ মামলার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপক্ষের (প্রসিকিউশন) সাক্ষী স্বীকার করেছেন যে, তাদেরকে জোরপূর্বক মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ কারণে তারা ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের করেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICT) চীফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে হাজির হয়ে আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে তারা স্বীকার করেছেন যে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও তদন্ত সংস্থা তাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়ে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছিল।
নিচে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া প্রধান মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানকারীদের স্বীকারোক্তি ও জবানবন্দির বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১. মাহবুবুল আলম হাওলাদার (১ম ও প্রধান সাক্ষী)
মামলার একাত্তরের গোয়েন্দা কমান্ডার এবং রাষ্ট্রপক্ষের ১ নম্বর সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা অভিযোগে তার স্বীকারোক্তিতে জানান:
মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে জবানবন্দি: তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার অধীনে একটি কথিত 'সেফ হোমে' (Safe House) আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দিয়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও জবানবন্দি তৈরি করা হয়।
* শারীরিক নির্যাতন: ট্রাইব্যুনালে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় তার ওপর ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
* চিরকুট দেখে সাক্ষ্যদান: (উল্লেখ্য, ২০১২ সালে মূল বিচার চলাকালেও আদালত কক্ষে মাহবুবুল আলমের হাতের তালু এবং ছোট কাগজ থেকে দেখে দেখে জবানবন্দি পড়ার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল)। ২০২৫ সালের স্বীকারোক্তিতে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের লিখে দেওয়া স্ক্রিপ্ট অনুযায়ীই তিনি বাধ্য হয়ে মিথ্যা বলেছিলেন।
২. মাহতাব উদ্দিন ও আলতাফ হাওলাদার (অন্যতম প্রধান সাক্ষী)
রাষ্ট্রপক্ষের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীও ১ নম্বর সাক্ষীর সাথে যৌথভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। তারা নিম্নোক্ত স্বীকারোক্তি প্রদান করেন:
* রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার: তারা জানান, সাঈদীকে যেকোনো মূল্যে ফাঁসি দেওয়ার জন্য তৎকালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম একজোট হয়ে কাজ করেছিল।
* ভীতি প্রদর্শন ও জিম্মি দশা: আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। সত্য কথা বললে বা সাঈদীর পক্ষে কথা বললে তাদের 'যুদ্ধাপরাধী' বা 'দেশদ্রোহী' বানিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। নিজেদের জীবন বাঁচাতে তারা আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের শেখানো মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বাধ্য হন।
৩. তৎকালীন প্রসিকিউশনের ভূমিকা নিয়ে স্বীকারোক্তি
অভিযোগকারী সাক্ষীরা তাদের স্বীকারোক্তিতে তৎকালীন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দল এবং তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তাদের সরাসরি অভিযুক্ত করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, আদালতে তারা যাতে কোনোভাবেই সত্য বলতে না পারেন, সেজন্য ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পূর্বে এবং পরে তাদের কড়া গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হতো এবং তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনসহ অন্যরা সুনির্দিষ্টভাবে সাঈদীর নাম বলতে বাধ্য করতেন।
নতুন তদন্তের বর্তমান অবস্থা
সাক্ষীদের এই বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি ও অভিযোগের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান তদন্ত সংস্থা এই মামলার নতুন করে আইনি পর্যালোচনা শুরু করেছে। সাক্ষীদের জোরপূর্বক মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ানো, সেফ হোমে নির্যাতন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহারের প্রমাণ সাপেক্ষে দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে বালি অপহরণের সাথে জড়িত তৎকালীন এএসপি ফজলুর রহমানকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।