ঘটনা ২৭ মে ভোরের বেলার। আদ দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ রুমে মোট ১১ জন মা ও ৬ শিশু ছিল। রাত ২টা থেকে ৩টার দিকে একজন মা বেশি ঠান্ডা লাগায় এসি বন্ধ করতে বলেন। পরবর্তীতে ১ ঘণ্টার জন্য এসি বন্ধ করা হয়। এ সময় অন্যান্য শিশুদের শ্বাসকষ্ট তৈরি হয়। পরে ভোর ৬টা থেকে শিশুদের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে এবং একে একে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি যেহেতু ওই রুমে কোন ভেন্টিলেশন ছিল না, তাই হয়তো এসি বন্ধ রাখায় শ্বাসকষ্ট বা সাফোকেশনের কারণে শিশুগুলোর মৃত্যু হয়েছে।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. মাজহারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, হাসপাতালটিতে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশের ক্রাইমসিনসহ তদন্ত দল রয়েছে। শিশুগুলো কিভাবে মারা গেছে সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের বয়স হবে এক থেকে দুই দিন, সবাই পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ছিল।

এদিকে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে শিশুদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-১ শাখার এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।

অফিস আদেশে বলা হয়, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয়জন নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা শাখার একজন যুগ্ম সচিবকে। এছাড়া সদস্য হিসেবে রয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (আইন শাখা) এবং সদস্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (হাসপাতাল-১)।

কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়, কমিটি তিনদিনের মধ্যে শিশুদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান এবং প্রতিকারের জন্য করণীয় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দেবে। কমিটি প্রয়োজনে যে কোনো সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে।

এদিকে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মোট ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এর মধ্যে নিরাপদ খাদ্য আইনের আওতায় ২ লাখ টাকা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আওতায় ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। রবিবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম ও অসঙ্গতি পাওয়া যায় বলে জানানো হয়েছে।

অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম। এ সময় তার সঙ্গে সিটি করপোরেশনের সহকারী পরিচালক, আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক এবং পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অভিযান শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ দীর্ঘ সময় ধরে পরিদর্শনের পর একাধিক অনিয়ম পাওয়া যায়। এর ভিত্তিতে নিরাপদ খাদ্য আইনে ২ লাখ টাকা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ১ লাখ টাকাÑমোট ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তিনি জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেছে।

অভিযানকালে দেখা যায়, হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক ছাড়া অন্যান্য ওয়ার্ডের রেফ্রিজারেটরে কোনো মিটার নেই। শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট চেম্বারে মিটার পাওয়া যায়। এছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ লক্ষ্য করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরও জানান, একটি স্থানে খাবারজাতীয় পণ্যের লেবেলিং ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পাওয়া যায়। এসব অনিয়ম দ্রুত সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকেও জানানো হয়েছে।

হাসপাতালের ওপর অবস্থিত বেকারি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, অভিযানকালে বেকারিটি বন্ধ পাওয়া যায় এবং হাসপাতাল ভবন থেকেই সেটিতে প্রবেশ করা সম্ভব হয়। একই ভবনের অংশ হিসেবেই সেটি দেখা গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে নোটিশ

দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জরুরি চিকিৎসা সেবার মান যাচাই, অনিয়ম প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সংঘটিত ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, আইজিপি, র‌্যাবের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের এ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গতকাল রোববার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস. এম. জুলফিকার আলী জুনু এ নোটিশ পাঠান।

নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকের জীবন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃত। রাষ্ট্রের কর্তব্য জনগণের জন্য নিরাপদ, মানসম্পন্ন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতায় দেশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাসেবার মান, বৈধ লাইসেন্স, প্রশিক্ষিত জনবল, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ, এনআইসিইউ এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়ম, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সম্প্রতি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দেশব্যাপী গভীর উদ্বেগ, শোক ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। ওই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা সময়ের দাবি। নোটিশে জনস্বার্থে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে :

১। দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ তদারকি ও অভিযান পরিচালনা করা। ২। ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোর লাইসেন্স, অনুমোদন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, অগ্নিনিরাপত্তা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং রোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই করা। ৩। আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ, এনআইসিইউসহ সব ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ও সার্বিক কার্যকারিতা পরীক্ষা করা। ৪। চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বৈধ নিবন্ধন, পেশাগত যোগ্যতা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি যাচাই করা। ৫। অনুমোদনবিহীন, মানহীন অথবা প্রতারণামূলক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৬। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সংঘটিত ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় একজন হাইকোর্ট ডিভিশন-এর বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা। ৭। তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৮। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।

নোটিশ প্রাপ্তির ১৫ (পনেরো) দিনের মধ্যে উপরোক্ত বিষয়ে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যথায় জনস্বার্থে দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের আলোকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত প্রতিকার, জনস্বার্থে রিটআবেদনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।