বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় কারও হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, মামলার তদন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার এখতিয়ার। এ ধরনের হস্তক্ষেপ করার আইনগত সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, কোনো সংস্থা সেটা অ্যামনেস্টি হোক, বা হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন হোক, কারও এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না।
গতকাল রোববার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় শাপলা চত্বরের মামলায় সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে গ্রেফতার দেখানোয় অ্যামনেস্টিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।
শাপলা চত্বরের মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের তদন্ত চলমান। যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদেরই বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তবে আমরা অহেতুক কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানি করার জন্য বিচারের মুখোমুখি করবো না।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়ে প্রত্যক্ষ ধারণা নেই বলে উল্লেখ করেন আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো ধারণা নেই। কোনো তদন্ত চলছে কি না, তা তদন্ত সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলতে পারবেন। এ নিয়ে আমার প্রত্যক্ষ কোনো ধারণা নেই।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমাদের ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ২২টি মামলার বিচার চলমান রয়েছে। রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ আছে দুটি মামলা। আশা করি ঈদের পরই এসব মামলার রায় হয়ে যাবে। ৩১টি মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। এছাড়া অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমরা গুম-খুন এবং ক্রসফায়ারের ১৫০টি মামলার তদন্ত হাতে নিয়েছি। এরই মধ্যে এসব কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নরসিংদী, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, রাজশাহীসহ দেশের যেসব স্থানে সবচেয়ে বেশি হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে, সেসব মামলার তদন্ত আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। এক্ষেত্রে আমরা তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের প্রসিকিউশন টিমকে অন্তর্ভুক্ত করে বিশেষ তদন্তের ব্যবস্থা করেছি। আশা করি খুব দ্রুতই এসব প্রতিবেদন দিয়ে আমরা বিচারের পর্যায়ে নিতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
উল্লেখ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আট অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও রামপুরার একটি মামলার রায় যেকোনো দিন হবে। এর মধ্যে একটি ট্রাইব্যুনাল-১ ও আরেকটি ট্রাইব্যুনাল-২ এ অপেক্ষমাণ রয়েছে।
গুমের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো সাবেক আইজিপি বেনজীরের সহযোগী রিফাত নিলয় জোয়ার্দারকে
গুমের মামলায় সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সহযোগী রিফাত নিলয় জোয়ার্দারকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল রোববার এক আবেদনের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের একক বেঞ্চ তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। সেই সঙ্গে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৩ জুলাই দিন ধার্য করা হয়েছে।
এদিন রিফাত নিলয় জোয়ার্দারকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুমের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে প্রসিকিউশন। সেই সঙ্গে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য সময়ের আবেদন করা হয়। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। এছাড়াও শুনানিতে তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, ড. মোহাম্মদ অলি মিয়া, তারেক আবদুল্লাহ, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।
পরে শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের একক বেঞ্চ রিফাত নিলয় জোয়ার্দারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। সেই সঙ্গে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৩ জুলাই দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে গত ১৯ মে রিফাত নিলয় জোয়ার্দারের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চেয়ে আবেদন করে প্রসিকিউশন। পরবর্তীতে সেই আবেদন মঞ্জুর করে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের এই সহযোগীকে আদালতে হাজিরের জন্য রোববারের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সহযোগী রিফাত নিলয় জোয়ার্দারের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও প্রশ্রয়ে বলপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী মো. মশিউর রহমানসহ একাধিক ব্যক্তিকে বিভিন্ন গোপন বন্দিশালায় আটক রাখা হয়। সেই সঙ্গে আটককালীন সময়ে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ওপর বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। যার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
এছাড়াও রিফাত নিলয় জোয়ার্দারের বিরুদ্ধে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পদ্ধতিগতভাবে হওয়া গুম-খুনের অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে গত ১৯ মে তাকে গুমের মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চেয়ে আবেদন করে প্রসিকিউশন।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, রিফাত নিলয় জোয়ার্দার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দখলে থাকা রাজধানীর একাধিক ফ্ল্যাটের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তিনি ফ্ল্যাটগুলো থেকে প্রতি মাসে ভাড়ার টাকা সংগ্রহ করতেন। পরবর্তীতে সেই টাকা বেনজীর আহমেদের কাছে পৌঁছে দেয়া হতো। এছাড়াও তিনি সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসভাজন ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও দ-বিধির পৃথক দু’টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন রিফাত নিলয় জোয়ার্দার।