‘বাংলাদেশ জেল’-এর নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করা হচ্ছে ‘কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস বাংলাদেশ’। কারাগারকে শুধু বন্দিদের আটক রাখার স্থান নয়, বরং নিরাপত্তা, সংশোধন, মানবিকতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পুনর্বাসনের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।

সংবাদ সম্মেলনে কারা মহাপরিদর্শক কারাগারের নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগের পাশাপাশি গত দুই বছরে বন্দি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যসেবা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণ, প্রশিক্ষণ এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গৃহিত বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

তিনি জানান, বর্তমান সময়ের প্রয়োজন ও আধুনিক কারা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারা বিভাগের আইন ও বিধিবিধানকে যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারকে ‘ক্যাশলেস’ বা নগদ লেনদেনমুক্ত কারাগার হিসেবে কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যা কারা ব্যবস্থাপনায় অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে।

দীর্ঘদিনের জনবল সংকট দূর করতে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৮৯৯টি নতুন পদ অনুমোদন করা হয়েছে এবং আরও ১ হাজার ৫০০টি পদের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি পদোন্নতির দীর্ঘদিনের জটিলতা ও স্থবিরতা নিরসন করা হয়েছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, ইতোমধ্যে দুটি কেন্দ্রীয় কারাগার ও চারটি জেলা কারাগার চালু করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়াতে ঢাকা বিভাগকে পুনর্বিন্যাস করে দুটি বিভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট ৭৫টি কারাগার রয়েছে, যার মধ্যে ২১টি কারাগারের সংস্কার প্রয়োজন। ঢাকা জেলে রুটি তৈরির কার্যক্রম আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করতে ‘রুটি মেকার’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া কারাগারগুলোকে পরিবেশবান্ধব করতে বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি সিলেট-১, কিশোরগঞ্জ-১ ও খুলনা নতুন কারাগারে প্রায় ১৮ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে।

ডিজিটালাইজেশন ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশব্যাপী কারাগারগুলোকে নিজস্ব ফাইবার নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। বন্দিদের টেলিফোন কল, সাক্ষাৎ এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে ভিডিও কলের মাধ্যমে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এআই-নির্ভর প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব কার্যক্রমে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স পদায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। এছাড়া কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ সাবান উৎপাদনসহ বন্দিদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনমুখী কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ওই সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে ২ হাজার ২৪৭ জন কারাবন্দি পালালেও এর মধ্যে ১ হাজার ১৫৭ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো বন্দিসহ এখনও ৬৯০ জন পলাতক রয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

কারা মহাপরিদর্শক আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই সংস্কার ও নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে কারাগারগুলো প্রকৃত অর্থেই সংশোধনাগারে পরিণত হবে এবং দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।