মহিব্বুল আরেফিন, রাজশাহী
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের শেষ দুই দিন ৪ ও ৫ আগস্ট রাজশাহীর ইতিহাসে রক্তাক্ত ও স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে। একদফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে অসহযোগ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এই দুই দিনে রাজশাহী কার্যত আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। নগরজুড়ে মিছিল, ব্যারিকেড, সড়ক অবরোধ ও গণসমাবেশের মধ্যেই পুলিশ এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। বিশেষ করে ৫ আগস্ট শাহ মখদুম কলেজের সামনে, শেখের চক, আলুপট্টি মোড় প্রভৃতি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে সাকিব আনজুম ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং মাথায় গুলীবিদ্ধ আলী রায়হান চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ৮ আগস্ট হাসপাতালে মারা যান। এদিনের সংঘর্ষে আহত হন শতাধিক মানুষ।
আগের দিন ৪ আগস্ট সকাল থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে রাজশাহীতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে সমবেত হয়। নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে ব্যারিকেড দেয়া হয় এবং যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। দিনভর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলীবর্ষণের ঘটনা ঘটে। বিকেলের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার সামনে অবস্থান নেন এবং একদফা দাবিতে স্লোগানে মুখরিত হয় পুরো নগরী। জাতীয়ভাবে সেদিন সহিংসতায় বহু প্রাণহানির খবর রাজশাহীর আন্দোলনকারীদের আরো বিক্ষুব্ধ করে তোলে। একই সাথে রাজশাহী মহানগরী এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয় সশস্ত্র বাহিনী ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীহসহ দলীয় ক্যাডার বাহিনী। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও গুলীবর্ষণের ঘটনা ঘটে। পুরো শহরে এক ধরনের থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করলেও সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা দমে না গিয়ে রাজপথ দখলে নেয়ার চেষ্টা করেন।
রক্তাক্ত ৫ আগস্ট: চব্বিশের ৫ আগস্ট সকাল থেকেই রাজশাহীতে ছাত্র-জনতার ঢল নামে। ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে হাজারো মানুষ নগরীর বিভিন্ন সড়কে নেমে আসেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে আলুপট্টি-শেখের চক এলাকায়। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ও রুয়েটের শিক্ষার্থীরাসহ অসংখ্য মানুষ তালাইমারী থেকে সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টের দিকে অগ্রসর হলে বিপরীত দিক থেকে সরকারি বাহিনীর ব্যাক-আপ নিয়ে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা জনতার উপর চড়াও হয়। বেঁধে যায় তুমুল সংঘর্ষ।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুলীবর্ষণ শুরু হলে আন্দোলনকারীরা চারদিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। এ সময় রানীনগর এলাকার বাসিন্দা সাকিব আনজুম (২৭) গুলীবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তাঁর লাশ দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলেই পড়ে ছিল। তিনি রানীনগর এলাকার মইনুল হকের পুত্র। একই ঘটনায় মাথায় গুলীবিদ্ধ হন আলী রায়হান (২৮)। তাঁকে গুরুতর অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চারদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৮ আগস্ট তিনি মারা যান। পরবর্তী সময়ে তাঁকে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এদিন কমপক্ষে ৩৫ জন গুলীবিদ্ধ অবস্থায় রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়। এদিকে সংঘর্ষ চলাকালে আলুপট্টি, সাহেববাজার ও আশপাশের এলাকায় কয়েকজন আন্দোলনকারীকে ধরে মারধরের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করে পিটিয়ে আহত করেন।
যুবলীগ নেতার একশন: ৫ আগস্ট রাজশাহীর আলুপট্টি ও বোয়ালিয়া এলাকায় সংঘর্ষের সময় যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম রুবেলকে দুই হাতে দুটি পিস্তল নিয়ে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার দিকে গুলী ছুঁড়তে দেখা যায়। সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকা থেকে রুবেলকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনের একাধিক মামলা রয়েছে।
সরকার পতনের খবর: এদিন দুপুরের পর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও মহানগরীর সাহেববাজারসহ বিভিন্ন প্রধান সড়কে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ নেমে এসে বিজয় মিছিল ও উল্লাস প্রকাশ করেন। রাজশাহীর রাজপথে আনন্দ-উল্লাস শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা বিজয় মিছিল বের করেন। একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটে। প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে এবং সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে।
হুকুমদাতা লিটন-ডাবলু: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার হুকুমদাতা ও নেতৃত্বদানকারী হিসেবে সাবেক মেয়র লিটন ও ডাবলু সরকারের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তবে সরকার পরিবর্তনের পর ডাবলু সরকারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আর ৫ আগস্ট পরিবার নিয়ে পালিয়ে যান সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। রাসিকের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের বিরুদ্ধে হত্যা, হামলার একাধিক মামলা করা হয়েছে।
রাজশাহীর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য: রাজশাহীতে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের শুরু থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ৪ ও ৫ আগস্টের সংঘর্ষ সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে বিবেচিত হয়। সাকিব আনজুম ও আলী রায়হানের মৃত্যু রাজশাহীর আন্দোলনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে এবং তাঁদের স্মরণে পরবর্তীতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজশাহীর সংঘর্ষে আহতের মোট সংখ্যা ৮০ থেকে ১২১ জন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে সব আহতের পূর্ণাঙ্গ সরকারি নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।