কুষ্টিয়ায় চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। দামও ভালো পাচ্ছে চাষীরা। মৌসুমের শুরুতেই ‘সোনালি আঁশ’ পাটের মূল্য গত বছরের চেয়ে বেশি পাচ্ছে। ভালো মূল্য পাওয়ায় এ জেলার ছয় উপজেলার কৃষকের মুখে এখন হাসির ঝিলিক। খুশিতে আত্মহারা পাট চাষিরা। এতে কৃষক পরিবারে বইছে আনন্দ। সব শঙ্কা কাটিয়ে এবার হাসি ফুটেছে পাট চাষির মুখে। জেলার মাঠগুলোতে কোথাও পাট কাটছেন কৃষক, কোথাও আঁটি বেঁধে চলছে জাগ দেওয়ার প্রস্তুতি। আবার কোথাও পানিতে দাঁড়িয়ে পাটের আঁশ ছাড়াতে ব্যস্ত কৃষক-শ্রমিক।

কুষ্টিয়ার গ্রামবাংলার মাঠজুড়ে এখন সোনালি আঁশকে ঘিরে কর্মচাঞ্চল্য। অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।

কুষ্টিয়ায় পাট আবাদের প্রধান এলাকা সদর, মিরপুর, দৌলতপুর, খোকসা উপজেলার কৃষকরা এ মৌসুমে উচ্চ ফলন ও ভালো দাম পেয়ে চাষীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

গত বছরের চেয়ে এ বছর পাটের দাম বেশি। গত বছর এ সময় প্রতি মণ পাটের দাম ছিল ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু এ বছর মৌসুমের শুরুতেই বাজারে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ টাকায়। প্রতি বিঘায় শুধু পাট বিক্রি করেই কৃষক লাভবান হচ্ছেন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে পাটখড়ির দাম যুক্ত করলে প্রতি বিঘায় এখন কৃষকের লাভ হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা।

কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জেলার ৬টি উপজেলায় এ বছর ১ লাখ ১ হাজার ২৮৪ একর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। যা গত বছরের থেকে ৩০ ভাগ বেশি জমিতে পাট চাষ করা হয়েছিল। জমিতে দেশি, রবি-১, মোস্তা, জেআরও এবং তোষা জাতের পাট চাষ করা হয়েছে। তবে উচ্চ ফলনশীল তোষা জাতের পাট চাষ হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানা যায়, চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়ায় ৪০ হাজার ৩১৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে কুষ্টিয়া সদরে ৪ হাজার ৫৮ হেক্টর, খোকসায় ৪ হাজার ৭৬৮ হেক্টর, কুমারখালীতে ৪ হাজার ৮৯৬ হেক্টর, মিরপুরে ৩ হাজার ৯৭৮ হেক্টর, ভেড়ামারায় ৪ হাজার ৩৬৫ হেক্টর এবং দৌলতপুরে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।

খোকসা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৬৩৩ হেক্টর বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে। উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ২৮টি কৃষি ব্লকেই পাটের ফলন আশাব্যঞ্জক।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বদরুদ্দোজা জানান, উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের নিবিড় তদারকির কারণে এবার রেকর্ড পরিমাণ জমিতে পাটের আবাদ সম্ভব হয়েছে।

দেখা গেছে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, পাটকাঠি থেকে পাট ছাড়ানো ও শুকানো নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কুষ্টিয়ার চাষিরা। বৃষ্টিতে নদী-নালা, খাল-বিল ও ডোবাতে পানি থাকায় পাট জাগ দেওয়ার কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি তাদের। গত বছরের তুলনায় আবহওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের চাষ বেড়েছে। গত বছরের চেয়ে এ বছর পাটের দাম ও ফলন বেশি হয়েছে। ফলে লাভবান হচ্ছেন পাট চাষিরা।

আরও জানা গেছে, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৪ মণ পাট উৎপাদিত হচ্ছে। গত বছরের এ সময় প্রতি মণ পাটের দাম ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৭ শত টাকা। এ বছর প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৯০০ টাকা। বাজার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার আইলচারা ইউনিয়নের বিস্তৃর্ণ এলাকায় পাটচাষিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ জমি থেকে পাট কাটছেন, কেউ পাটের বোঝা বাঁধছেন, কেউ কেউ মাথায় করে সেই বোঝা নিয়ে যাচ্ছে নদী-খাল কিংবা পুকুরে। আবার অনেক জায়গায় পাট জাগ দিচ্ছেন কৃষকরা।

অনেকে আঁশ ছাড়িয়ে, পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে বিক্রির জন্য বাজারে নিচ্ছেন। মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের কালিনাথপুর গ্রামের কৃষক আজব আলী বলেন, গত বছরের চেয়ে এ বছরের পাটের দাম বেশি। গত পাটের মণ ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা। এবার সাড়ে তিন হাজার টাকা মন হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া এবার পাটের ফলনও ভালো হয়েছে। এতে আমরাও খুব খুশি।

কুষ্টিয়ার কুমারখালী, খোকসা, মিরপুর, ভেড়ামারা, দৌলতপুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এবার পাটের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, মৌসুমের শুরু থেকে আবহাওয়া পাট চাষের জন্য অনুকূলে ছিল। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ছিল। পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যায় পাটগাছ হয়েছে লম্বা ও সতেজ।

কৃষকেরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার অনেক জমিতে পাটের ফলন ভালো হয়েছে। ফলে উৎপাদন নিয়ে তাদের মধ্যে স্বস্তি রয়েছে। তবে ফলন ভালো হলেও এখন তাদের প্রধান চিন্তা বাজারদর।

দৌলতপুর উপজেলার কৃষক জাহাঙ্গীর বলেন, এ বছর চার বিঘা পাটের চাষ করেছি। বিঘা প্রতি ১২ মণ পাট উৎপাদন হয়েছে। খরচ বাদে ডাবল লাভ হয়েছে। দাম ভালো পাওয়ায় আমরা লাভবান।

মিরপুর উপজেলার চাষি খাদেমুল ইসলাম বলেন, গত বছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলাম। তাতে ১২ মণ পাট উৎপাদন হয়েছিল। এবার দুই বিঘায় ২০ থেকে ২২ মণ পাট ঘরে তুলেছি। এবার লাভে ভালো হয়েছে। কারণ আগের বছরের চেয়ে দামও বেশি, ফলনও বেশি।

এলাকার কৃষকরা জানান, বিগত বছরের তুলনায় দাম ভালো পেয়েছেন তারা। ফলনও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। আবহাওয়াও উপযোগী ছিল। ভালো দাম পেলে আগামীতেও আগ্রহ বাড়বে। ফলে পাট চাষ বাড়বে। পাটের সঙ্গে সঙ্গে পাটখড়ির চাহিদাও বেশি। প্রতি বিঘায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকার পাটখড়ি পাওয়া যায়।

সব মিলে চাষিরা খুশি। জ্বালানির কাজ ও বেড়া দেওয়ার কাজে পাটখড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ জন্য দিন দিন পাটখড়ির দাম ও চাহিদা বাড়ছে।

কুষ্টিয়া জেলা পাট অধিদপ্তরের মুখ্য কর্মকর্তা সোহরাব উদ্দিন বিশ্বাস জানান, গত বছর কৃষকরা সর্বশেষ ৩৪০০-৩৫০০ টাকা পর্যন্ত মণ হিসেবে পাট বিক্রি করেছেন।

যখন পাট ওঠে তখনও ১৭০০-২৭০০ টাকা পর্যন্ত দাম পেয়েছেন। এবারে পাটের দাম শুরু থেকেই আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার ৯ শত টাকা মন হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। কয়েকদিন বাজার বেড়ে ৩ হাজার ৮ শত থেকে ৩ হাজার ৯ শত টাকা মন বিক্রি হচ্ছে।

এক কৃষক বলেন, “পাট এবার খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম যদি ভালো না থাকে, তাহলে এত কষ্ট করে লাভ কী? আমরা চাই সরকার পাটের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করুক।”

আরেক কৃষক জানান, পাটের দাম ভালো পেলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে পাট আবাদ করবেন। কারণ পাট একদিকে অর্থকরী ফসল, অন্যদিকে কৃষকের পরিবারের অনেক প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করে।

এছাড়াও আমরা নিয়মিত পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে থাকি। এছাড়াও কুষ্টিয়ার খাজানগরে বৃহত্তম চালের মোকাম থাকায় পাটের বস্তা ব্যবহার বাড়ার ফলে এ জেলায় পাটচাষও বাড়ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক জানান, গত বছরের চেয়ে উৎপাদন, চাষের পরিমাণ ও দাম এ বছর বেশি।

পাট চাষের উপযোগী আবহাওয়ার ফলে ফলন বেশি পেয়েছেন কৃষক। বাজারে পাটের দাম ভালো যাচ্ছে। আশা করি আগামী বছর কৃষকরা পাট চাষে উদ্বুদ্ধ হবেন। আগামীতে আবাদ আরও বাড়বে। তিনি আরও বলেন, পাট অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পাট চাষিদের প্রণোদনা প্রকল্পের মাধ্যমে পাট বীজ, রাসায়নিক সার দেয়া হয়েছে।

হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসার প্রত্যাশা :

এক সময় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পাটের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ‘সোনালি আঁশ’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত বাংলাদেশের পাট আজও দেশের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ায় বিশ্ববাজারেও পাটের সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, উৎপাদন খরচ কমানো এবং কৃষকের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এ ফসল আবারও কৃষকের জন্য লাভজনক হয়ে উঠতে পারে।

কুষ্টিয়ার মাঠে এবার পাটের ফলন যেন কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। কিন্তু সেই হাসি কতটা স্থায়ী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে বাজারদরের ওপর।

সবুজ পাটগাছের ভেতরে কৃষক দেখছেন সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের সার্থকতা তখনই আসবে, যখন মাঠের ঘাম ঝরানো কৃষক তার উৎপাদিত পাটের ন্যায্য দাম পাবেন। কুষ্টিয়ার মাঠজুড়ে তাই এখন একদিকে বাম্পার ফলনের আনন্দ, অন্যদিকে ন্যায্যমূল্যের অপেক্ষা।