কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলাগুলোতে ইতিমধ্যেই বোরো ধান কাটার উৎসব চলছে।বিশেষ করে হাওর উপজেলা নামে খ্যাত ,নিকলী, ইটনা, মিঠামইন,অষ্টগ্রাম, এছাড়াও বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, ভৈরব, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, কটিয়াদী,কিশোরগঞ্জ সদরের কিছু কিছু এলাকায় বোরো ধান কাটা চলছে।
এদিকে উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে এবং সাম্প্রতিক ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে কিশোরগঞ্জ হাওড় অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অতি নিচু জমির বোরো ধান ক্ষেত তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। তবে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমির বোর ধান এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তেমন কোন ক্ষতি হয়নি।
তবে বৃষ্টির পানি জমেছে অনেক বোরো ক্ষেতেই। ক্ষতির আশঙ্কায় হাওড় অঞ্চলের কৃষকেরা হাওরের কিছু কিছু জায়গায় অপরিপক্ক ধান পর্যন্ত কাটতে শুরু করেছেন। স্থানীয়রা দাবি করেন নদী ভরাট এবং অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণসহ খাল বিলের দখল দারিত্বের জন্যে অকাল বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় বলে যুক্তি দাঁড় করান। বর্তমান সময়ে বোরো ধান বিক্রির ক্ষেত্রেও মিলছেনা সঠিক মূল্য।বাংলাদেশ সরকার এলএসডি গোডাউনে মজুদের জন্যে প্রতি মন ধান ১৪৪০ টাকা দরে কিনার অনুমতির তথ্য থাকলেও কি পরিমাণ বোরো ধান কিনা হবে এখনো চুড়ান্ত হয়নি।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, জেলায় বাম্পার ফলন হলেও শ্রমিক সংকট এবং কোনো ধরণের বড় অভিযোগের চিত্র তাদের দৃষ্টিতে দেখা যায়নি জেলার কোনো হাওরে। চলতি বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
হাওরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার কিশোরগঞ্জের নিকলী, বাজিতপুর,করিমগঞ্জ সহ আশেপাশের হাওরের বিভিন্ন স্থানে তুলনামূলক নিচু জমিতে পানি বাড়ার কারণে কৃষকরা অপরিপক্ক ধান কাটতে শুরু করেছেন। পাশাপাশি, ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকেরা ধান কাটার শ্রমিক এবং হার্ভেস্টার মেশিনের সংকটে ভুগছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে জ্বালানিরও সংকট রয়েছে। চলতি মৌসুমের শুরুতে শ্রমিকদের মজুরি প্রতি দিন ১ হাজার থেকে ১২ শত টাকার মধ্যে হলেও, হাওরের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। জমিতে পানি থাকার কারণে ধান কাটায় বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি, চাহিদা অনুযায়ী তেলের সরবরাহ না থাকায় অনেক কৃষক মেশিন নিয়েও বিপাকে পড়েছেন।
নিকলী উপজেলার বড় হাওরের কৃষক আবু তাহের জানান, মেশিনের ডিজেল (জ্বালানি) প্রতি ব্যারেল ৩০০০ টাকা অতিরিক্ত দিয়েও পাচ্ছেন না। ২৩০০০ টাকার ব্যারেল এখন ২৬০০০ টাকায়ও অনেক সময় মিলছে না।
নিকলীর বিভিন্ন হাওরের রাস্তা সংস্কারের অভাবে উৎপাদিত ধান এবং মালামাল আনা নেওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। খরচ বাড়ার পাশাপাশি পানি বাড়ার শঙ্কায় তারা দুশ্চিন্তায় আছেন। নিকলী উপজেলা সদরের শ্রমিক কামাল হোসেন বলেন, পানি বাড়ার কারণে শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও, কৃষকরা তুলনামূলক কম পাকা ধান দ্রুত কাটছেন। এতে হাওর খালি হতে শুরু করেছে। হার্ভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটার কারণে গরু-মহিষের খাদ্য সংকটও দেখা দিতে পারে বলে তার মতো অসংখ্য শ্রমিকের অভিমত।
নিকলী উপজেলা সদরের কৃষক মোহাম্মদ কিতাব আলী জানান, চলতি বছরে ধানের মূল্য তুলনামূলক কম। পরিপক্ক ধান মন প্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। সার্বিক খরচ হিসাব করে এ দামে কৃষকরা লাভবান হতে পারছেন না। কৃষকদের উৎপাদন খরচ প্রতি মন এ অনেক বেশি হয়েছে বলে প্রতিবেদকে জানান। ভবিষ্যতে তারা ধান উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন বলেও আশঙ্কা করছেন। এত কম দামে ধান বিক্রি করলে মধ্যস্বত্বভোগীরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে ও জানান। জমিতে ধান লাগানো থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত মন প্রতি প্রায় এক হাজার টাকা করে খরচ পড়েছে। ধানের উপযুক্ত মূল্য না পেলে ভবিষ্যতে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বো। তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ সহজ শর্তে সরকার নির্ধারিত মূল্যে অতি দ্রুত বোরো ধান কেনা শুরু করুক। তাহলে কৃষকরা যদি কিছু বাঁচতে পারে।
কৃষি বিভাগের জেলা উচ্চমান সহকারী বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ১৪৪০ টাকা দরে এলএসডি গোডাউনের জন্যে ধান কেনার কথা জানা গেলেও কিশোরগঞ্জ জেলায় কি পরিমান কেনা হবে তা এখনো জানা যায়নি। এছাড়াও উপযুক্ত সময়ে কৃষকরা সরকারের নিকট ধান বিক্রি করতে না পারলে মাঠ পর্যায়ের কৃষকেরা সুবিধাবঞ্চিত হবেন। এমন জবাবে এটা জাতীয় সিদ্ধান্তের বিষয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি অফিসার ড. মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এখন পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে কোনো ধরণের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে তিনি কৃষকদের উপযুক্ত মূল্য পাওয়ার জন্য তার বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে চান। চলতি বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ সেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩০ শতাংশ ধান কর্তন করা হয়েছে । জেলায় চলতি বছরে প্রায় ১১ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন বোরো উৎপাদনের আশা জেলা কৃষি বিভাগ।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিস্তর হাওড় অঞ্চলে কৃষি বিপ্লব ঘটানোর লক্ষ্যে প্রচুর পরিমাণে ডুবু সড়ক বা সাব মারজিবুল রোড করা প্রয়োজন। যে সকল সড়ক ৬ মাস পানির নিচে থাকে। বর্তমানে যে রোডগুলি আছে এগুলো হাওর অঞ্চলের জন্য যথেষ্ট নয়। এ ব্যাপারে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে সচেতন মহল মনে করেন।