জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা যখন তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলি সরকার তখন স্বৈরাচার ফিরে আসবে বলে হুমকি দেয়। অথচ দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই সংকট সমাধানে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের নিয়ে গঠিত একটা টীম দিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার আমাদের প্রস্তাব গ্রহন করেনি। সংসদের ভেতরে বারবার বলেও কিছু করতে না পেরে আমরা রাজপথে নেমেছি।

তিনি বলেন, চব্বিশের বিপ্লবের পর জনগণ দেশের আমূল সংষ্কার চেয়েছিলেন। সেই সংস্কারের লক্ষে তারা গণভোটের হ্যাঁর পক্ষে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছিলেন। কিন্তু সরকার ক্ষমতা পাওয়ার সাথে সাথে সেই ওয়াদার বরখেলাপ করেছে। তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করলোনা। বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, যেখানেই অসংগতি দেখবো সেখানেই কথা বলবো। তাই বলে বগুড়ার জন্য আমাকে কথা বলতে হবে এটা ভাবিনি। বগুড়া সবসময় অবহেলিত, বঞ্চিত। বগুড়া তার পাওনা বুঝে পাক এটা আমি চাই।

তিনি শনিবার (১২সেপ্টেম্বর) সকালে বগুড়া সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আমরা ৫৫ বছর অতিক্রম করে এসেছি। একটা জাতির জন্য এই সময় নেহায়েত ছোট নয়। আমরা যদি মালয়েশিয়ার দিকে তাকাই তাদের স্বাধীনতার বয়স আমাদের থেকে খুব বড় নয়। কিন্তু মালয়েশিয়া বিশ্বে তার একটি জায়গা দখল করে নিয়েছে। আমরা যদি জাপানের দিকে তাকাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মাত্র দুই বছরের মাথায় তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইলেক্ট্রনিক্স ম্যাকানিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি সুইচওভার করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কোথায়?

তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানীরা শোষণ করেছে, ব্যবসা করেছে। স্বাধীনতার পর এই সমস্ত সম্পত্তি বাংলাদেশে নামক রাস্ট্রের মালিকানায় চলে এসেছে। আদমজী জুট মিলকে বলা হতো- বিশ্বের বৃহত্তম জুট ইন্ডাস্ট্রি, আজকে আদমজীর নাম নিশানা মুছে গেছে। স্বাধীনতার পরে সবকিছু হরিলুট হয়েছে। এখন একটা শিল্পপার্ক করা হয়েছে কিন্তু সেই আদমজীর গৌরব আর নেই। আমি এজন্য পাকিস্তানি বেনিয়া ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিচ্ছি না। আমি আমাদের মানসিকতা এবং বাস্তবতার উদাহরণ দিচ্ছি। তিনি বলেন, দেশে কিছু শিল্প স্থাপনা গড়ে উঠলেও তা যথেষ্ট নয়। শিল্পের মূল শক্তি হচ্ছে বিদ্যুৎ। ৩টি উৎস থেকে এই বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। তেল, গ্যাস এবং সোলার। বর্তমানে বিদ্যুৎ, গ্যাসের কারনে দেশ মারাত্বক সংকটে পড়েছে। শিল্পে মারাত্বক আঘাত এসেছে। সম্প্রতি তৈরি পোাষাক শিল্পের মালিকদের সংগঠনে বিজেএমইএ’র নেতৃবৃন্দ প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করে বলেছেন, চাহিদা মত বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় তাদের উৎপাদন ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ফলে তারা ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করতে পারবেন না। ঋণ খেলাপী হবেন। শ্রমিকদের ছাঁটাই করবেন। বায়ারদের সময়মত অর্ডার সরবরাহ করতে না পারলে বায়াররা অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। আমাদের বৃহত্তম রপ্তানী খাতের এই অবস্তা হলে বাঁকিগুলো এখান থেকেই বুঝা যায়।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই সংকট সমাধানে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের নিয়ে গঠিত একটা টীম দিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। তারা সরকারের এই বিষয়ে এক্সপার্টদের সাথে মিলে সংকট সমাধানের পথ তৈরি করবেন। আমরা দেশকে ভালোবাসি এজন্য এই অফার দিয়েছি। বাংলাদেশের সংসদের ইতিহাসে বিরোধী দল কখনো সরকারি দলকে এরকম অফার দেয়নি। এর আগে তেলের সংকট দেখা দিলে পাম্পে পাম্পে ঘুরেছি, মানুষের সাথে কথা বলেছি, সংসদে কথা বলেছি সরকার সংকট অস্বীকার করেছে। বিদ্যুতের সংকটও তারা অস্বীকার করেছে। আজগুবি কথা বলেছে। দায়িত্ব জ্ঞানহীন কথা বলেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সংসদে বিবৃতিতে বলেছেন, তার লম্বা হওয়ার কারনে কারেন্টের সাপ্লাই ঠিকমত দেওয়া যায়নি। সংসদের ভিতরে যখন আমরা দেখলাম কিছু করতে পারছিনা তখন এই দাবীর সাথে আরও ৫টি দাবী নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করছি। আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপে এখন লং মার্চ করছি।

তিনি বলেন, লংমার্চ নিয়ে অনেক কথা বলা হচ্ছে। বলা হয় তেল সংকটের মধ্যে আমরা এতো গাড়ী নিয়ে কেন লংমার্চ করছি? আমরা লং মার্চ না করলেও এসব গাড়ী বসে থাকতোনা। তারা চলাচল করতো। বরং আমরা লংমার্চের মাধ্যমে জনগণের দাবী আদায়ের আন্দোলন করছি। তিনি বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা জনগণকে অধিকার সচেতন করতে চাই। এভাবেই একদিন জনগণের দাবী পূরণ হবে। দাবী পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দল হিসেবে আমাদের কাজ হলো জনগণের অধিকারের পাহারাদারি, চৌকিদারি করা। ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করা। বিরোধী দলের হাতে কখনো স্বৈরশাসন কায়েম হয় না। শাসক সুশাসক হতে পারে, স্বৈরশাসক হতে পারে। আমরা স্বৈরশাসকের কবলে সাড়ে ১৫ বছর ছিলাম। আমাদের অনেক নেতাকে হারিয়েছি। অনেকে গুম হয়ে এখনো ফিরে আসেনি। সস্বজনরা জানেন না তাদের প্রিয়জনরা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে। আমিরে জামায়াত বলেন, চব্বিশের বিপ্লবের পর জনগণ দেশের আমূল সংষ্কার চেয়েছিলেন। আমরা সংস্কারের পক্ষে ছিলাম। দেশবাসীকে হ্যাঁর পক্ষে ভোট দিতে বলেছিলাম। জনগণ আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। প্রদত্ব ভোটের ৬৮ দশমিক ২ পারসেন্ট মানুষ হ্যাঁর পক্ষে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে। কিন্তু সরকার ক্ষমতা পাওয়ার সাথে সাথে তাদের দেওয়া ওয়াদার বরখেলাপ করলেন। তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করবেন না। তিনি ইতিহাস স্বরন করে দিয়ে বলেন, ৭০ সালে ভোটর রায় অমান্য করার কারনেই যুদ্ধ হয়েছিল। শেখ মুজিব দফায় দফায় ইয়াহিয়া খানের সাথে বৈঠক করেছেন শান্তিপূর্ন ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য। রায় মেনে নিয়ে সংসদ সদস্যদের শপথের ব্যবস্থা করা এবং সংসদ অধিবেশন ডাকার জন্য বলেছেন। সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকার রাজি হয়নি বলেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছি। কাজেই জনগণের ভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার শক্তি আমাদের কারোর নাই। জনগণ চায় তাদের রায়ের বাস্তবায়ন, আমরা সেই দাবীগুলো নিয়েই আন্দোলন করছি।

সাংবাদিকদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ; দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সবসময় আপনাদের থেকে সহযোগিতা পাই। কিন্তু মাঝে মাঝে উল্টাপাল্টা দু’একজন করেন। আমাদের বক্তব্য কাঁটছাট করে প্রচার করা হয়। তারপরেও আমরা মিডিয়ার ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল। কখনো মিডিয়াকে আঘাত করে কথা বলিনা। কারন এটা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে পাওয়ারফুল পিলার। এটা সততার উপরে থাকলে রাস্ট্রের অবশিষ্ট তিনটি স্তম্ভ সোজা পথে চলতে বাধ্য। তিনি একটি সুন্দর দেশ গঠনে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রত্যাশা করেন।

বগুড়ার উন্নয়নের বিষয়ে আমিরে জামায়াত বলেন, যেখানেই অসংগতি দেখবো সেখানেই কথা বলবো। তাই বলে বগুড়ার জন্য আমাকে কথা বলতে হবে এটা ভাবিনি। বগুড়া সবসময় অবহেলিত, বঞ্চিত। বগুড়া তার পাওনা বুঝে পাক এটা আমি চাই। মতবিনিময়কালে বগুড়া মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল, ইফসুর মহাসচিব ড. মোস্তফা ফয়সাল পারভেজসহ স্থানীয় জামায়াত নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিঢিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় শেষে আমিরে জামায়াত হোটেল মমইন কনভেনশন সেন্টারে বগুড়া জেলা ও মহানগর জামায়াতের রুকন সম্মেলনে যোগদান করেন। বিকেলে তিনি উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ কওমী মাদরাসা জামিল মাদরাসার শিক্ষা-ছাত্রদের সাথে কুশল বিনিময় করবেন।