আবু সাইদ বিশ্বাস: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী ও উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা দেশের অন্যতম গ্রামপ্রধান জেলা। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। জেলার অর্থনীতি এখনো কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ২২ লাখের কাছাকাছি, যার প্রায় ৮০ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। জেলার সাতটি উপজেলার অধিকাংশ পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ধান, পাট, তিল, ডাল, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, আম, পেয়ারা, লিচু ও অন্যান্য ফল উৎপাদনের পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি, কাঁকড়া ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ স্থানীয় অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। হাঁস-মুরগি, গরু, ছাগল ও দুগ্ধ খামারও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, মৌসুমি আয়, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, নিরাপদ সুপেয় পানির সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখনও গ্রামীণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ।
সূত্রমতে ৩ হাজার ৮১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট জেলার বহু ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়ক এখনও ভাঙাচোরা। বর্ষা মৌসুমে কাঁচা রাস্তা কাদায় ডুবে যায়, অনেক পাকা সড়কও দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে চলাচলের অনুপযোগী। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় উপজেলা সড়ক রয়েছে প্রায় ৭১৫ কিলোমিটার, ইউনিয়ন সড়ক ৫৭৪ কিলোমিটার, গ্রাম সড়ক (ক্যাটাগরি-এ) ২ হাজার ৮৮ কিলোমিটার এবং গ্রাম সড়ক (ক্যাটাগরি-বি) ২ হাজার ২২৪ কিলোমিটার। অর্থাৎ জেলার মোট গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ হাজার ৬০১ কিলোমিটার। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে বাড়তি ব্যয় গুনতে হয় কৃষকদের। দুর্গম এলাকায় রোগী পরিবহন এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতেও দুর্ভোগ নিত্যদিনের ঘটনা। মৎস্য খাত সাতক্ষীরার অর্থনীতির অন্যতম শক্তি হলেও এখানেও রয়েছে নানা সংকট। চিংড়িতে ভাইরাসজনিত রোগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি অনেক খামারিকে ক্ষতির মুখে ফেলছে। একইভাবে প্রাণিসম্পদ খাতে উন্নত জাত, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসা সেবার ঘাটতি এখনও রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের সংকটের কারণে অধিকাংশ রোগীকেই জেলা সদর যেতে হয়। জেলায় একটি জেলা সদর হাসপাতাল, একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হলে ও তা অপ্রতুল্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পল্লী উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এটি মানুষের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তার সমন্বিত উন্নয়ন। শক্তিশালী গ্রাম গড়ে উঠলে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তিও আরও মজবুত হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, টেকসই পল্লী উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ সড়ক ও সেতুর উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপন, সহজ কৃষিঋণ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সহায়তা জরুরি।
গেল ৬ জুলাই বিশ্ব পল্লী উন্নয়ন দিবসে সাতক্ষীরার মানুষের প্রত্যাশা উপকূলীয় এই জেলার গ্রামীণ জনপদের বাস্তব সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও মানবসম্পদের সমন্বয়ে সাতক্ষীরা শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নয়, দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ গ্রামীণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনসংলগ্ন ভৌগোলিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর ভোমরা, চিংড়ি ও কাঁকড়া রপ্তানি, আধুনিক কৃষি, ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প, গ্রামীণ পর্যটন, সৌরবিদ্যুৎ এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে সাতক্ষীরার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে চলেছে। অধিকাংশ ইউনিয়নে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে অনেক সরকারি সেবা এখন গ্রামেই পাওয়া যাচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও গ্রামীণ জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
সাতক্ষীরা সদর ২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক বলেন, সাতক্ষীরার টেকসই পল্লী উন্নয়নের জন্য কাঁচা গ্রামীণ সড়ক দ্রুত পাকা করা, নির্মিত সড়কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি শিক্ষা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপন এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরিতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাঁর মতে, শক্তিশালী গ্রামই একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাই বিশ্ব পল্লী উন্নয়ন দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় জেলার বাস্তব সমস্যা ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।