মুঃ শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : নীল আকাশের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে এক টুকরো রঙিন কাগজ—সেই ঘুড়িই একসময় গ্রামবাংলার শিশু-কিশোরদের স্বপ্ন, আনন্দ আর প্রতিযোগিতার প্রতীক ছিল। বিকেলের হালকা হাওয়া উঠলেই মাঠে, ছাদে কিংবা খোলা প্রান্তরে জমে উঠত ঘুড়ির লড়াই। হাতে মাঞ্জা দেওয়া সুতো, চোখ আকাশে স্থির—আর ঠোঁটে লেগে থাকত এক অদ্ভুত উত্তেজনা। কিন্তু সময়ের পালাবদলে সেই রঙিন শৈশব আজ যেন ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে।

একটা সময় ছিল, যখন ঋতুর সঙ্গে সঙ্গে ঘুড়ির উৎসবও বদলে যেত। পৌষের মিঠে রোদ, ফাল্গুনের দোলা হাওয়া কিংবা বৈশাখের ঝড়ো বাতাস—সবই ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর উপযুক্ত সময়। গ্রামের প্রতিটি পাড়া যেন হয়ে উঠত একেকটি প্রতিযোগিতার মঞ্চ। কার ঘুড়ি আকাশে বেশি উঁচুতে উঠবে, কার সুতো বেশি ধারালো—এসব নিয়ে চলত দিনভর লড়াই। “ভোঁ কাট্টা” ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে উঠত, আর কাটা ঘুড়ির পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে শিশুরা খুঁজে পেত এক নির্মল আনন্দ।

ঘুড়ি উড়ানো কেবল একটি খেলা ছিল না; এটি ছিল সৃজনশীলতা ও কৌশলের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। নিজ হাতে ঘুড়ি বানানো, বাঁশ কেটে কাঠামো তৈরি, রঙিন কাগজ লাগানো, সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া—প্রতিটি ধাপে ছিল শিল্পের ছোঁয়া। এই খেলায় যেমন ছিল প্রতিযোগিতা, তেমনি ছিল বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা আর একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অনন্য সুযোগ।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই চিত্র বদলে গেছে। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা শিশু-কিশোরদের জীবনধারাকে আমূল পরিবর্তন করেছে। স্মার্টফোন, ভিডিও গেম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মোহে তারা এখন বন্দী ভার্চুয়াল জগতে। আকাশের দিকে তাকানোর সময় নেই, হাতে ধরা সুতোও যেন হারিয়ে গেছে টাচস্ক্রিনের স্পর্শে।

অন্যদিকে, গ্রামবাংলার খোলা মাঠও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বসতবাড়ি, ইটভাটা, কারখানা কিংবা বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে ওঠায় খেলাধুলার জায়গা কমে এসেছে। যে প্রান্তরে একসময় ঘুড়ির মেলা বসত, সেখানে এখন কংক্রিটের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। ফলে প্রকৃতির সঙ্গে শিশুদের সম্পর্কও ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।

শুধু তাই নয়, পড়াশোনা ও প্রতিযোগিতার চাপও শিশুদের শৈশবকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে। কোচিং, পরীক্ষা আর ফলাফলের দৌড়ে তারা হারিয়ে ফেলছে অবসর সময়ের সহজ আনন্দগুলো। অনেক অভিভাবকও এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিক মনে করে শিশুদের বাইরে খেলাধুলার চেয়ে ঘরের ভেতরেই বেশি সময় কাটাতে উৎসাহিত করছেন।

তবে সবকিছুর মাঝেও আশার আলো নিভে যায়নি। এখনো কিছু গ্রামে, কিছু উৎসবে কিংবা বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে ঘুড়ি উড়ানোর ঐতিহ্য টিকে আছে। কোথাও কোথাও ঘুড়ি উৎসব আয়োজন করে নতুন প্রজন্মকে এই আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আকাশে আবারও উড়ছে রঙিন ঘুড়ি, শোনা যাচ্ছে হারিয়ে যাওয়া উল্লাসের ধ্বনি।

ঘুড়ি উড়ানো আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশÑ যেখানে আছে স্বাধীনতার স্বাদ, সৃজনশীলতার বিকাশ এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। একটি ছোট্ট ঘুড়ি যখন আকাশে ভেসে ওঠে, তখন তা শুধু কাগজের ডানা নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, কল্পনা আর মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঘুড়ি উড়ানোর আয়োজন করা যেতে পারে। গ্রাম পর্যায়ে মেলা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিশুদের আকৃষ্ট করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অভিভাবকদের সচেতনতা, যারা সন্তানদের প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যেতে পারেন।

কারণ, ঘুড়ির সুতো ছিঁড়ে গেলে যেমন ঘুড়ি হারিয়ে যায় আকাশের অজানায়, তেমনি আমাদের অবহেলায় হারিয়ে যেতে পারে একটি প্রজন্মের রঙিন শৈশব। তাই এখনই সময়Ñ আবারও আকাশের দিকে তাকানোর, আবারও হাতে সুতো ধরার, আবারও ফিরিয়ে আনার সেই হারিয়ে যাওয়া আনন্দের দিন।