চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধান চাষে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণার উন্নয়ন (এলএসটিডি) প্রকল্পের অর্থায়নে আমন ২০২৬ মৌসুমে এই প্রথম রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের সাহায্যে কৃষকের জমিতে যান্ত্রিক উপায়ে ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে।

গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার চারিয়া ‘প্রযুক্তি গ্রামে’ আধুনিক এই যন্ত্র ব্যবহার করে একযোগে প্রায় ৫ একরের অধিক জমিতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ‘ব্রি ধান১১০’ জাতের চারা রোপণ করা হয়।

কৃষিক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা তীব্র শ্রমিক সংকট মোকাবিলা, রোপণ ব্যয় ও সময় হ্রাস করা এবং সর্বোপরি ধান উৎপাদনকে আরও দক্ষ ও লাভজনক করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এই যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে এলএসটিডি প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, চট্টগ্রামের প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় এই চারা রোপণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। রোপণের আগে ব্রি উদ্ভাবিত ‘সীড সোয়ার’ মেশিনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্লাস্টিক ট্রেতে নির্ধারিত বয়স ও সঠিক উচ্চতার মানসম্মত চারা তৈরি করা হয়। পরে সেই চারাগুলোই রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে জমিতে নির্দিষ্ট দূরত্বে ও সমান ঘনত্বে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে রোপণ করা হয়।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথাগত বা গতানুগতিক পদ্ধতির চেয়ে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে চারা রোপণ অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ও সময়সাশ্রয়ী। নিখুঁত সারিবদ্ধতা ও সঠিক দূরত্বের কারণে পরবর্তীতে জমিতে নিড়ানি দেওয়া, সুষম সার প্রয়োগ ও কীটনাশকসহ ফসলের অন্যান্য পরিচর্যা করা বেশ সহজ হয়ে যায়। ফলে একদিকে যেমন কৃষকের শ্রম ও সময় সাশ্রয় হয়, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমে এসে কৃষকের নিট লাভের পরিমাণ বেড়ে যায়।

পরিসংখ্যান ও খরচের তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সনাতন পদ্ধতিতে এক বিঘা জমিতে চারা রোপণ করতে ৩ থেকে ৪ জন শ্রমিকের সারাদিন পার হয়ে যায়, যার পেছনে কৃষকের ব্যয় হয় অন্তত তিন থেকে চার হাজার টাকা। কিন্তু আধুনিক রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহার করলে মাত্র দুজন জনবল দিয়ে মাত্র এক ঘণ্টাতেই পুরো এক বিঘা জমিতে চারা রোপণ করা সম্ভব। এতে বিঘাপ্রতি খরচ নেমে আসে মাত্র এক হাজার টাকায়, যা কৃষকের আর্থিক দিক দিয়ে এক বিরাট স্বস্তি।

বর্তমানে বাংলাদেশে কম্বাইন হারভেস্টার বা ধান কাটার যন্ত্রের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের প্রসার এখনো তুলনামূলক সীমিত, বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর ব্যবহার এতদিন প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ বাস্তবতা বিবেচনা করে প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের সরাসরি হাতে-কলমে ট্রেতে চারা উৎপাদন, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার পরিচালনা এবং আধুনিক ধান চাষের নানা কৌশল শেখাতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী অব্যাহত রাখা হয়েছে।

কৃষির এই আধুনিকায়ন ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এলএসটিডি প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষির ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণরূপে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। একদিকে শ্রমিক সংকট, অন্যদিকে উৎপাদন খরচের দ্রুত বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সময়মতো আবাদ নিশ্চিত করতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গবেষণালব্ধ এসব প্রযুক্তি দ্রুততম সময়ে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে তাদের লাভজনকতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এলএসটিডি প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মোট ১৫টি ‘প্রযুক্তি গ্রামে’ আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ও নতুন জাতের ধান প্রদর্শন ও জনপ্রিয়করণের কাজ চলছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, চট্টগ্রামের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোসা. আমিনা খাতুন যান্ত্রিকীকরণের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, কৃষির মোট খরচ কমাতে ও ফলন বাড়াতে যন্ত্রের ব্যবহার এখন অনিবার্য। তবে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে ট্রেতে সঠিক নিয়মে চারা উৎপাদন ও উপযুক্ত বয়সের চারা ব্যবহারের ওপর। তাই চারিয়া প্রযুক্তি গ্রামের কৃষকদের এসব কারিগরি বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা স্বাবলম্বী হয়ে যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পারেন।

অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর হাটহাজারীর কৃষি কর্মকর্তা মো. মেজবাহ উদ্দিন এবং অন্যান্য অতিথিরা এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে চারিয়া গ্রামের কৃষক মো. রফিকুল ইব্রাহিম তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে অল্প সময়ে খুব কম খরচে অনেক বেশি জমিতে চারা রোপণ করা সম্ভব হয়েছে। এই ধরনের কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে তৃণমূল পর্যায়ে আরও সহজলভ্য করা গেলে ধান চাষ থেকে কৃষকরা অবশেষে কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখতে পাবেন।

চারিয়া এলাকার স্থানীয় সাধারণ কৃষকরাও মনে করছেন, এ জাতীয় আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার অব্যাহত থাকলে কৃষির প্রধান বাধা শ্রমিক সংকট অনায়াসেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর আশাবাদ, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের বিস্তার চট্টগ্রাম অঞ্চলের সার্বিক ধান উৎপাদনের পরিধি ও দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে করবে আরও বেশি টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল।