মানুষের শরীরের জন্য আমিষের চাহিদা পূরণ করা অত্যন্ত জরুরী। জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে দিন দিন বেড়েই চলেছে মাছের চাহিদা। কিন্তু চাহিদা অনুসারে মাছ উৎপাদন হচ্ছেনা কুষ্টিয়ায়। মাছ উৎপাদনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কুষ্টিয়ায় মাছের উৎপাদন কম হচেছ। এ জেলায় বছরে চাহিদা ২৯ হাজার মেঃ টন, উৎপাদন হচ্ছে ১৫ হাজার মেট্টিক টন। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকছে ১৪ হাজার মেট্টিক টন। চাহিদার তুলনায় মাছের উৎপাদন কম হওয়ায় কুষ্টিয়ার হাট বাজারগুলোতে মাছের দাম বেড়েই চলেছে। মাছ কেনা নিম্নবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

“মাছে ভাতে ভাঙালী” এ বাক্যটি এখন শুধু প্রবাদ বাক্যেই পরিণত হয়েছে। মাছের চাহিদা থাকলেও নানান সমস্যার কারণে মাছের উৎপাদন কম হচ্ছে। ফলে প্রতি বছরই মাছের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে কয়েক হাজার টন।

জেলা মৎস্য অফিসসুত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় ২ হাজার খাল, বিল, হাওড়-বাওড়, পুকুর দীঘি, ডোবা-নালা, নদ-নদী। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৮,শ ৩১টি পুকুর, ৩৯ টি বিল, ৮টি দীঘি, ৩টি বাওড়, নদী ৮টি, বেসরকারী কার্প নার্সারীরর সংখ্যা ৮৯ টি, হ্যাচারীর সংখ্যা ২০টি, সরকারী মৎস্য বীজ উৎপাদনকারী খামারের সংখ্যা ৪টি। জেলার এ সকল জলাশয়ে মাছ চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও অনুকুল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পনা মাফিক মৎস্য চাষ না করায় কুষ্টিয়া জেলায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছেনা।

জেলায় দিন দিন মাছের চাহিদা বেড়েই চলেছে। এ জেলায় প্রায় সাড়ে ২১ লাখ মানুষের চাহিদা অনুসারে মাছের চাষ ও উৎপাদন একেবারেই কম। বাৎসরিক মাছের চাহিদা ২৯ হাজার মেঃ টন। সে তুলনায় চাহিদার তুলনায় প্রতি বছর উৎপাদন হচ্ছে ১৫ হাজার মেট্টিক টন। ঘাটতি থাকছে ১৪ হাজার মেঃ টন। মাছ চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কুষ্টিয়ার জলাশয়গুলোতে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছেনা।

এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য বিভাগ সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান না করায় ও মৎস্য চাষীদের উদ্বুদ্ধ না করায় মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে মৎস্য চাষীরা। জেলার বিভিন্ন উপজেলার মৎস্য খামার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পুকুর জলাশয়ে সনাতন পদ্ধতিতে মাছের চাষ করা হচ্ছে। তবে কিছু কিছু জলাশয়ে আধা নিবিড় পদ্ধতিতে মাছের চাষ করা হচ্ছে। যার কারণে মাছের চাষ সঠিকভাবে বাড়ছেনা। উৎপাদনও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

তাই এ জেলার মাছের বাড়তি চাহিদা পূরণ করতে বাইরে থেকে মাছ আমদানী করতে হচেছ। মাছের চাহিদা বেশি থাকায় জেলার সকল হাট বাজারে দাম বেড়েই চলেছে। কোনক্রমেই মাছের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নিম্নবিত্ত মানুষের মাছ কেনা ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ আমিষ জাতীয় খাবার মাছ নিয়মিত না খাওয়ায় পুষ্টিহীনতা দিনদিন বাড়ছে।

নিম্নবিত্ত পরিবারের কয়েকজন জানিয়েছে, যাদের নুন আনতে পানতা ফুরায়, তাদের মতো ব্যক্তির মাছের কথা ভাবাই অবান্তর। তার কারণ মাছের দাম অত্যান্ত চড়া। এক পোয়া দেশী মাছ কিনতে হলে ৬০ টাকার কমে নয়। তাই মাছ কেনা তাদের জন্য একেবারেই অসম্ভব।

এ জেলায় আছে অসংখ্য পুকুর-ডোবা, নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাওড় এবং বিস্তর প্লাবনভূমি। ষাটের দশকেও দেশে মোট মৎস্য উৎপাদনের ৯৫% আসতো প্লাবনভূমিসহ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে। এর মধ্যে ১০-১৫% আসতো চাষকৃত মাছ থেকে। কিন্তু বর্তমানে ফারাক্কার বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় বাধাগ্রস্থ হয়ে দাড়িয়েছে। পুকুর ডোবায় পানি না থাকায় মাছের উৎপাদন যেমন কম হচ্ছে। নদ-নদীগুলোতেও পানি না থাকায় প্রাকৃতিক মাছ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছেনা। ফলে জেলায় মাছের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে নদীনালা খাল-বিলে পানি থাকায় মৎস্য আবাদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মৎস্য খামারগুলো বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে। মাছের এ সমস্যা সমাধানে সর্বপ্রথম ফারাক্কার পানি সমস্যার সমাধান করা জরুরী দরকার বলেও পরিবেশবিদরা অভিমত ব্যক্ত করেন।

এছাড়াও জলাশয়ে অবাধে মাছ ধরা, জমিতে কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার,রাসায়নিক সারের ব্যবহারে মাছের বংশ ধবংস হচ্ছে। দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বলে জানালেন মৎস্য অফিসারবৃন্দ।

অতীতে বিলই ছিল মৎস্য উৎপাদনের প্রধান উৎস। প্লাবনভূমির ছোট ছোট মাছ বিশেষ করে খলিসা, মেনি, শিং, মাগুর, পুঁটি, টেংরা, কৈ, চিতল, পাবদা কতইনা সু-স্বাদু ছিল। কালের বিবর্তনে প্লাবনভূমিতে এসব মাছ এখন আশংকাজনকভাবে কমে গেছে। প্লাবনভূমির সঙ্গে নদ-নদীর সংযোগ খাল ভরাট বা সংকুচিত হওয়ায়, অপরিকল্পিতভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, শুকনা মৌসুমে নদীতে পানি প্রবাহ হ্রাস ইত্যাদি নানাবিধ কারণে প্রজননের জন্য নদী থেকে মাছ প্লাবনভূমিতে অনুপ্রবেশ করতে পারছে না। উপরন্তু, ধান ক্ষেতে সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে প্লাবনভূমিতে মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র বহুলাংশে বিনষ্ট হয়ে গেছে। ফলে প্লাবনভূমিতে মা মাছ এখন আর আগেরমত ডিম ছাড়তে পারছে না।

তিনি আরোও জানান “নিরাপদ মাছে ভরবো দেশ,বদলে দেব বাংলাদেশ” এ শ্লোগানকে সামনে রেখে কুষ্টিয়ায় মৎস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। প্রতি বছর হ্যাচারীতে উৎপাদিত একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক বড় আকারের পোনা প্লাবনভূমিতে অবমুক্ত করে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এজন্য হ্যাচারীতে ব্যাপক পোনা উৎপাদন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

কুষ্টিয়া চাহিদার তুলনায় মাছের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে হাওড়, বাওড়, নদী নালা খাল বিলে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যে পোনা অবমুক্ত করাসহ বিভিন্ন কমসুচী পালন করছে মৎস্য বিভাগ। এগুলো বাস্তবায়ন হলে কুষ্টিয়া জেলায় মাছের উৎপাদন দ্বিগুন বাড়বে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

কুষ্টিয়া জেলায় মৎস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে জলাশয়ের সুষ্ঠু ব্যবহার করতে হবে। জলাশয় মালিকদের মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করাসহ আধুনিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়ে মৎস্য জীবিদের প্রশিক্ষণ প্রদান করলে এ জেলায় ৩ গুন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে অভিজ্ঞ মৎস্যচাষীরা অভিমত প্রকাশ করেন। এতে একদিকে জেলার মাছের চাহিদা যেমন পূরণ হবে অপরদিকে কুষ্টিয়ার ৩০ হাজার মৎস্যজীবি তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিষয়টি জেলা মৎস্য বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এ দাবী জেলার সচেতন মহলের।