কূটনীতি হলো সূক্ষ্ম প্রতীকের খেলা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে কোনো উপহারই কেবল একটি জড়বস্তু নয়; প্রতিটি বস্তু, পুস্তক বা স্মারকের পেছনে লুকিয়ে থাকে গভীর কোনো রাজনৈতিক দর্শন, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান কিংবা কৌশলগত বার্তা। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে একটি বিশেষ গ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। বইটি আর কিছুই নয়; প্রাচীন ভারতীয় কূটনীতিবিদ কৌটিল্য (যিনি চাণক্য নামেও অধিক পরিচিত) রচিত কুখ্যাত ও বহুল আলোচিত রাজ্য পরিচালনা বিষয়ক গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’। এই উপহার প্রদানের একটি ছবি ভারতীয় হাইকমিশনের অফিসিয়াল পেজে প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিশেষ করে শাফকাত রাব্বি অনিক ও তাঁর পরিচালিত প্ল্যাটফর্ম ‘সেন্ট্রিস্ট নেশন’ দাবি করে বসে যে, অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া বইটির প্রচ্ছদে কৌটিল্যের বহুল প্রচারিত কূটনীতি সূত্র লিখিত ছিল; ‘‘ ÔÔEvery neighbouring state is an enemy and the enemy’s enemy is a friend ” (প্রতিটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই মূলত শত্রু, আর শত্রুর শত্রু হলো বন্ধু)। এই দাবির পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক এবং কূটনৈতি বিশ্লেষকদের নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এদিকে ঘটনার পানি গড়ায় আরও দূরে, যখন ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক ও এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট দিয়ে শাফকাত রাব্বির ওই দাবিকে ‘ফেক নিউজ’ বা অসত্য বলে দাবি করে। গতকাল শুক্রবার ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক ও এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে এই বিষয়ে প্রতিবাদ জানায়। হাইকমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা যে সংস্করণটি উপহার দিয়েছে, সেটির প্রচ্ছদে প্রবাদটি ছিল: “ Education is the best friend. An educated person is respected everywhere ” (শিক্ষাই শ্রেষ্ঠ বন্ধু। একজন শিক্ষিত মানুষ সর্বত্র শ্রদ্ধেয়)।
সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে ‘অর্থশাস্ত্র’-এর পেঙ্গুইন, অক্সফোর্ড ও অ্যামাজন সহ একাধিক সংস্করণ রয়েছে। কোনো কোনো সংস্করণের পেছনের প্রচ্ছদে বা ভূমিকায় কৌটিল্যের সেই কট্টর প্রতিবেশী-নীতি বা ‘মণ্ডল তত্ত্ব’ উদ্ধৃত করা রয়েছে, আবার কোনোটিতে শিক্ষাবিষয়ক সাধারণ নীতিবাক্য লেখা। ভারতীয় হাইকমিশন যে সংস্করণটি উপহার দিয়েছে, তাতে হয়তো দ্বিতীয় উক্তিটিই ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো; একটি প্রতিষ্ঠিত হাইকমিশন যখন খোদ একটি ফেসবুক পোস্ট বা মিডিয়া ইনফরমেশন ডিবাঙ্ক করতে মাঠে নামে, তখন তাদের বোঝা উচিত যে বিষয়টিকে স্রেফ ‘ফেক নিউজ’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ বইটির মূল নির্যাস তো একই! তারা বলছেন, ভারতে অবস্থিত আমাদের বাংলাদেশ হাইকমিশন ও উপহাইকমিশন যদি কেবল ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশ, আমাদের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং আমাদের সার্বভৌমত্ব ঘিরে প্রতিদিন প্রচারিত হাজারও অসত্য, ভুয়া ও প্রোপাগান্ডামূলক সংবাদ ডিবাঙ্ক করতে বসে, তবে ঢাকা থেকে অতিরিক্ত জনবল পাঠাতে পাঠাতে হবে। ফলে একটি বইয়ের প্রচ্ছদের লেখা নিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত প্রমাণ করার আগে ভারতীয় কূটনীতিকদের ভাবা উচিত ছিল; বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীকে এই বইটি উপহার দেওয়ার “আক্কেল” বা কৌশলগত যৌক্তিকতাটা ঠিক কী ছিল?
কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র বইয়ে কী আছে: কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে যা আছে যেকোনো সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এবং অনার্য/অধীনস্থ জনগোষ্ঠীর স্বাধীন সত্তার বিরুদ্ধে। কৌটিল্য রাজ্য সম্প্রসারণের জন্য ছদ্মবেশী যুদ্ধ, বিষপ্রযোগ, গুপ্ত হত্যা, প্রতারণা এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির (ভেদ নীতি) স্পষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থশাস্ত্রের দ্বাদশ অধিকরণে ( Book XII: Concerning a Powerful Enemy ) এবং ত্রয়োদশ অধিকরণে ( Book XIII: Means to Capture a Fort ) কৌশলে দুর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে গ্রাস করার বা পঙ্গু করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, বইটির অন্তর্নিহিত দর্শন আধুনিক যেকোনো স্বাধীন-সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অখণ্ডতা এবং অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত হুমকিপ্রদ।
ভারত কি আজও চাণক্য বা কৌটিল্য নীতি অনুসরণ করে: এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি মতাদর্শিক ও কৌশলগত স্তম্ভকে আমাদের বুঝতে হবে। চাণক্য নীতি হলো রাষ্ট্র ও রাজনীতি পরিচালনার এমন এক ব্যবস্থা যা চার নীতি হলো; সাম (আলোচনা), দাম (অর্থ বা প্রলোভন), দণ্ড (শাস্তি বা সামরিক শক্তি) এবং ভেদ (অভ্যন্তরীণ ফাটল সৃষ্টি)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত। এতে সততা বা মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে পরম উদ্দেশ্য (সাম্রাজ্য বিস্তার বা প্রভাব বজায় রাখা) হাসিলই মুখ্য। ভারত কি আজ চাণক্য নীতিতে চলে? উত্তর হলো; হ্যাঁ, শতভাগ। স্বাধীন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর নীতি পর্যন্ত কৌশলগত সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে এই চাণক্য নীতি ও নেহেরু ডকট্রিনের মেলবন্ধন। ভারতের আধুনিক কূটনীতির জনক বলে পরিচিত কে. এম. পানিক্কর থেকে শুরু করে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর সবাই ভারতীয় কূটনৈতিক ঐতিহ্যের মূল শেকড় হিসেবে চাণক্যের অর্থশাস্ত্রকেই স্বীকার করেন।
নেহেরু ডকট্রিন কী: স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বাহ্যিকভাবে ‘পঞ্চশীলা নীতি’ ও নিরপেক্ষতার কথা বললেও, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের যে পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলেন, তা ‘নেহেরু ডকট্রিন’ নামে পরিচিত। এই নীতির সারকথা হলো; দক্ষিণ এশিয়াকে ভারতের নিজস্ব প্রভাব বলয় ( Sphere of Influence ) হিসেবে দেখা হবে। এই অঞ্চলের যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বহিরাগত শক্তির প্রবেশ ভারত সহ্য করবে না এবং প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা নীতি নির্ধারিত হবে দিল্লির অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। এটি চাণক্যের ‘মণ্ডল তত্ত্বের’ই আধুনিক কূটনৈতিক সংস্করণ। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতা প্রতিবেশীকে সমকক্ষ মনে না করে ‘ছোট ভাই’ বা ‘অধীনস্থ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি করে।
ভারতীয় হাইকমিশনের উপহার কী বার্তা বা ইঙ্গিত দিচ্ছে দিল্লি? এই প্রশ্নে বিষয়ে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে যখন এক বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হলো, যখন বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদেহের একপেশে ও নতজানু কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘সার্বভৌম সমতা’ ও ‘মর্যাদাশীল সম্পর্কের’ দাবি তুলল ঠিক সেই মুহূর্তে ভারতীয় হাইকমিশনার কর্তৃক বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ‘অর্থশাস্ত্র’ উপহার দেওয়াকে স্রেফ একটি সৌজন্যমূলক উপহার ভাবাটা হবে চূড়ান্ত রাজনৈতিক মূর্খতা। তিনি বলেন, ভারতীয় হাইকমিশন এই উপহারের মাধ্যমে ঢাকার নতুন নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের জনগণকে ঠিক কী ইঙ্গিত দিতে চাইছে? বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তা হলো: অর্থমন্ত্রীর হাতে বইটি তুলে দিয়ে দিল্লি যেন অনুচ্চারিতভাবে বার্তা দিতে চাইল” আমরা তোমাদের প্রতিবেশীর রাজনীতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার চাণক্যীয় সূত্রগুলো ভালো করেই জানি। আমরা এখনো সেই শাস্ত্র দিয়েই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করি।” এটি একধরনের প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক হুমকি।