ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কয়েকটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ঘিরে হামলা-সংঘর্ষের ঘটনায় অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশকে বিঘ্ন করে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে হঠাৎ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার বিকালে চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে বহিরাগতসহ ছাত্রদল নামধারী সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোটা দিয়ে পৈশাচিক ও বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মীকে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। এ ঘটনায় সিটি কলেজের শিক্ষার্থী আশরাফের পায়ের গোড়ালি ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এ ঘটনার দুই দিন পর বৃহস্পতিবার বিকেলে ডাকসুর দুই নেতাকে রাজধানীর শাহবাগ থানার মধ্যে পুলিশের সামনে হামলা করে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় রাতভর শিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলে শাহবাগ এলাকায়। ছাত্রদলের হামলায় ১০ সাংবাদিকসহ আহত হয় ১৫-২০ জন। একই দিন শাহবাগসহ দেশের তিন স্থানে এই দুই ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দুপুরে পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে, সন্ধ্যায় কুমিল্লা পলিটেকনিক ক্যাম্পাসে এবং রাত ৮টায় শাহবাগে সংঘর্ষ হয়। এরআগে গত ৩ মার্চ মধ্যরাতে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের লতিফ ছাত্রাবাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। লতিফ ছাত্রাবাসে সংঘটিত সংঘর্ষে চারজন গুরুতর আহতসহ মোট ১৬ জন আহত হন।

অভিযোগ রয়েছে-হঠাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ক্যাম্পাসকে ঘিরে হামলা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নেপথ্যে রয়েছে ছাত্রদল নামধারী উচ্ছঙ্খল কতিপয় ব্যক্তি। তারা তুচ্ছ ঘটনাকে ঘিরে ইসলামি ছাত্র শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে দূরত্ব তৈরি করা এর উদ্দেশ্যে হতে পারে। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু সংখ্যক ছাত্রের কারণে এসব ঘটনা ঘটছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তা না হলে কোনো কারণ ছাড়াই সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক দু’টি ঘটনা এতবড় রূপ নেয়ার কথা নয়।

রাজধানীর শাহবাগে বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের দুই নেতা এবি জুবায়ের ও মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদের ওপর হামলা করেছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মী। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শাহবাগ থানার সামনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে এক পর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে হামলার মুখে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ও সমাজসেবা সম্পাদক এবি যুবায়ের শাহবাগ থানার ভেতরে আশ্রয় নেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, সংঘর্ষের মধ্যে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা থানার ভেতরে ঢুকে মুসাদ্দিকের ওপর হামলা চালায়। এতে তিনি আহত হন। থানার ভেতরে ঢুকেও হামলা চালায় ছাত্রদল নামধারী নেতাকর্মীরা। হামলায় ১০ সাংবাদিকসহ ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। এদিন কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সন্ধ্যায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় উভয়পক্ষের ১০ জন আহত হয়েছে। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, ‘গুপ্ত শিবির’ বলাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার বিকেলে নাফিস আব্দুল্লাহ নামে একজন শিক্ষার্থীকে থাপ্পড় দেয় কয়েকজন শিক্ষার্থী। এ থাপ্পড়ের বিচারের জন্যই সন্ধ্যায় অধ্যক্ষের কক্ষে যায় ছাত্রশিবির। অধ্যক্ষ বিচারের জন্য ৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করে। কিন্তু তাৎক্ষণিক বিচার দাবি করে ছাত্রশিবির। এ সময় হঠাৎ করে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ হামলায় লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ নাকচ করে বলছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবে ছাত্রশিবির বলছে গুপ্ত লেখাকে কেন্দ্র করেই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছাত্রশিবিরের ওপর হামলা করেছে। এছাড়া পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে বৃহস্পতিবার দুপুরে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় পুরো ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ নাকচ করে বলছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবে ছাত্রশিবির বলছে গুপ্ত লেখাকে কেন্দ্র করেই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছাত্রশিবিরের ওপর হামলা করেছে। এর আগে গত মঙ্গলবার সকালে ‘গুপ্ত লেখা’ নিয়ে চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ২০ জন আহত হন। এ ঘটনার পর থেকে পরওয়ারের বিবৃতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

এদিকে, রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে ঢুকে ডাকসু নেতাদের ওপর ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলা এবং পাবনা ও কুমিল্লায় ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সিনিয়র প্রচার-সহকারী মুজিবুল আলমের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী এবং সমাজসেবা সম্পাদক এবি যুবায়ের ও ডাকসুর নারী নেত্রী জুমার ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বর্বরোচিত ও কাপুরুষোচিত হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত। হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রতিনিধিদের ওপর এই ন্যক্কারজনক হামলা গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের নামে একটি ভুয়া আইডি থেকে গুজব ছড়ানো হয়। তিনি তা অস্বীকার করে নিজের পেজে পোস্ট দেয়ার পরও তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। নিরাপত্তার জন্য তিনি শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে জিডি গ্রহণ না করে তাকে আটকে রাখা হয়। খবর পেয়ে বিষয়টি সমাধানের জন্য এবি যুবায়ের ও মোসাদ্দেক আলী থানায় গেলে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের মারাত্মকভাবে আহত করে।

তিনি পুলিশের ভূমিকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের যেখানে নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেখানে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। জালিম শাসকগোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে পুলিশের এ ভূমিকা অতীতের ফ্যাসিবাদী আচরণের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। পুলিশের এই ন্যক্কারজনক ভূমিকায় দেশবাসী খুবই উদ্বিগ্ন। এরআগে চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ওপর বহিরাগতসহ ছাত্রদল নামধারী সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২১ এপ্রিল বিকালে চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে বহিরাগতসহ ছাত্রদল নামধারী সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোটা দিয়ে পৈশাচিক ও বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মীকে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। আমি এই নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা শিক্ষাঙ্গনে যে বর্বরতা ও সহিংসতা চালালো, তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও উদ্বেগজনক। ছাত্রদল নামধারী সন্ত্রাসী কর্তৃক ইসলামী ছাত্রশিবিরের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা, গুরুতর জখম এবং একজনের পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন করার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা প্রমাণ করে যে, ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাঙ্গনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কখনোই সহিংসতা ও সন্ত্রাসের জায়গা হতে পারে না। মতভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু তার প্রকাশ কখনোই অস্ত্রের ভাষায় হতে পারে না। এ ধরনের জঘন্য কর্মকাণ্ড জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ঠেলে দিবে। আমি অবিলম্বে এ ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের দাবি জানাচ্ছি এবং হামলার সঙ্গে জড়িত ছাত্রদল নামধারী সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি আহত শিক্ষার্থীদের দ্রুত সুচিকিৎসা নিশ্চিত করারও জোর দাবি জানাচ্ছি।