নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে নিত্যপণ্য হিসেবে ব্যবহৃত এলপি গ্যাসের দাম। দিন দিন এলপি গ্যাসের দাম যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে আগামী দিনগুলোতে জ¦ালানি নিয়ে শংকায় রয়েছে মানুষ। অহরহ দাম বৃদ্ধির কারণে জীবন যাত্রার ব্যায়ের হিসেব মিলাতে হিমশিম খাচ্ছে অনেকে। বিশেষ করে এলপি গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় চিড়ে চ্যাপ্টা নিন্ম ও মধ্যবিত্ত জনজীবন। ভুক্তভোগীরা বলছেন, কোথায় গিয়ে থামবে এলাপি গ্যাসের দাম ?

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বলছে, এলপিজি’র দাম সহসা কমার সম্ভাবনা নেই। বরং, আরও বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিকল্প পথে আমদানি করতে সময় ও খরচ বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে বিমা ও নিরাপত্তা ব্যয়। এ কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রতি মেট্রিকটনে ২৫০ ডলার অতিরিক্ত খরচ ধরে সাময়িকভাবে বেসরকারি এলপিজি ও অটোগ্যাসের ভোক্তা পর্যায়ের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৫৬ টাকায়। এপ্রিলের শুরুতে এক লাফে দাম চলে যায় ১ হাজার ৭২৮ টাকায়। ২ সপ্তাহ পর আরও ২শ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৯৪০ টাকা। যদিও অভিযোগ রয়েছে , সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। এদিকে এভাবে দফায় দফায় এলপিজির দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম জানান, রান্নায় এলপিজি’র অবস্থান স্যাচুরেশনে চলে গেছে। ইতোমধ্যে অনেক মানুষ এলপিজি ব্যবহার করছে। পরিবহনে, শিল্পেও এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে ।

এক মাসে দুইবার দাম বাড়ার বিষয়টা ভয়াবহ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবে দাম বাড়লে ভোক্তারা দীর্ঘমেয়াদে সামাল দিতে পারবে না এবং নির্দিষ্ট কোনো পণ্য বা সেবার দাম এভাবে বাড়লে ভোক্তা তখন অন্য সেবা বা পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে ।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের যুগ্মসচিব নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, এলপিজির মূল্য নির্ধারণ একটা রেগুলার প্রসেস। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে প্রতি মাসে কমিশন এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে। সুতরাং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যেমন পরিস্থিতি থাকবে (কম-বেশি), সে অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা হবে।’

জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজির বাজার এখন কোন পর্যায়ে আছে তা পরিসংখ্যানগত বলা না গেলেও এটি স্পষ্ট যে অন্য যেকোনো জ্বালানির তুলনায় এলপিজির বাজার ব্যাপক। গ্যাসের ক্ষেত্রে এটি সিএনজি’র বিকল্প হয়ে উঠেছে। পরিবহনে পেট্রোল-ডিজেলের বিকল্প হয়েছে। এখন এলপিজি যদি নিয়ন্ত্রিত দামে থাকে, তাহলে বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ হতে পারে এবং অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের যে ভূমিকা, সেখানে এলপিজি চলে আসতে পারে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘স্পট মার্কেট থেকে এলপিজি আমদানির প্রিমিয়ামটা সব সময় একরকম থাকে না। বর্তমানে জ্বালানি পণ্যের দাম জিওপলিটিকসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিইআরসি যেটা এখন করেছে সেটা হলো মন্দের ভালো। এখন আমদানি জাহাজের ইনস্যুরেন্স কস্ট তিনগুণ হয়ে গেছে। এই চ্যালেঞ্জের কারণে বিইআরসি মূল্যটা সমন্বয় করেছে। তবে যুদ্ধ থেমে গেলে দাম কমে আসবে।’

এদিকে সরকারিভাবে এলপিজির মূল্য যাই নির্ধারণ করা হোক না কেন বাজারে সেই দামে কখনোই বিক্রি করা হয় না। সরকারি মূল্যের চেয়ে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রি করা হয়। বর্তমানে অধিকাংশ কোম্পানির ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০ টাকার ওপরে। কেউ কেউ ২২০০ টাকাও বিক্রি করছে। অথচ সরকার-নির্ধারিত দাম এখন ১৯৪০ টাকা।

সূত্র জানায়, বাজারে ১৯ শতাংশ অংশীদারত্ব নিয়ে এলপিজি বিক্রয়ে বর্তমানে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ওমেরা গ্যাস। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে তাদের প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডার এখন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকায়। বিএম, সানগ্যাসও বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০ টাকার মধ্যে। তবে বসুন্ধরা কোম্পানির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকায়। যদিও বর্তমানে বাজারে তাদের সরবরাহ কম।

রাজধানীর সেগুনবাগিচার বাসিন্দা মান্নান শেখ জানান , ‘যার বাসায় সরকারি গ্যাসের পাইপলাইন আছে, গ্যাস না থাকলেও মাসে মাসে বিল দিতে হয়। আবার এলপিজিও ব্যবহার করতে হয়। শুধু গ্যাসেই চলে যাচ্ছে কয়েক হাজার টাকা। জনগণের ওপর চাপ শুধু বাড়েই, কখনো কমে না।

যাত্রাবাড়ি মিরহাজারীবাগের বাসিন্দা নাবিল জানান , যেভাবে দাম বাড়ছে, তাতে মনে হয় আপাতত গ্যাসের সিলিন্ডারের খরচ আমি কুলায়ে (সামলে) উঠতে পারবো না ।

রায়েরবাগের বাসিন্দা এস এম মিজান জানান, বাসায় এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস শেষ হয়ে যায়। উপায় না দেখে গ্যাস কিনতে দোকানে বের হই। কয়েকটি দোকান ঘুরে শেষ পর্যন্ত তাকে ২ হাজার ২০০ টাকায় এক সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে হয়েছে। অথচ ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার-নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকা। প্রয়োজনের তাগিদে অতিরিক্ত ২৬০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনে বাড়ি ফিরতে হয় তাকে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি বড় এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি করছে বিক্রেতারা।

নতুনবাজার এলাকার এলপি গ্যাস বিক্রেতা আবুবকর বলেন, আমরা ইচ্ছা করে বাড়তি দামে বিক্রি করছি না। পরিবেশকের কাছ থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। নইলে সরকারি দামে বিক্রি করতে আমাদের আপত্তি কোথায়?

মাদনী গ্যাস এন্টারপ্রাইজের এই স্বত্বাধিকারী জানান, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এলপিজি সিলিন্ডার ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওমেরা ২ হাজার ২০০ টাকা, বেক্সিমকো ২ হাজার ১৫০ টাকা, ইউনিগ্যাস ২ হাজার ১০০ টাকা এবং বিএম ২ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন তিনি।

এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্যমতে, দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি বিক্রি হয়ে থাকে। দেশের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই পূরণ করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। বর্তমানে ২৭টি কোম্পানি প্রায় সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার বাজারজাত করছে, যা মূলত রিফিল (পুনরায় গ্যাস ভরা) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়।