মাসুদ সাঈদী এমপি
(গতকালের পর)
নেতা এবং দা’ঈ ইলাল্লাাহ হিসেবে আল্লামা সাঈদী
নেতা এবং দা’ঈ ইলাল্লাহ। এই দুটি শব্দের ওজন এবং ব্যাপকতা এতটাই বেশী যে একজন ব্যক্তির পক্ষে এ দুটি শব্দের ওজন একসাথে বহন করা এবং হক্ব আদায় করা খুব কঠিন ব্যাপার। কিন্তু আল্লাহর বিশেষ দয়া ছিল হয়তো আব্বার প্রতি। তিনি একাধারে যেমন একজন যোগ্য নেতা হয়ে উঠেছিলেন, তেমনি একজন প্রাজ্ঞ দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবে আল্লাহ তাকে কবুল করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে একটা বিশেষ বিষয় আমরা লক্ষ্য করেছি। হযরত বায়েজীদ বোস্তামি (র.) বায়েজিদ বোস্তামি হয়ে উঠার পেছেনে যেমন মায়ের হৃদয় ভরা দোয়া ছিল, আব্বাকেও আল্লাহ এত সম্মানিত করার পেছনে আমার দাদা-দাদির দোয়া এক বিশাল নিয়ামক শক্তি ছিল। আব্বার নিজের আমল, ইখলাস, বিনয়ের পাশাপাশি প্রাণ ভরে আব্বা তার বাবা মায়ের দোয়া কামিয়েছেন। আমরা আব্বাকে দাদির প্রতি এতটাই যত্নবান দেখেছি যে, দাদি প্রতি মুনাজাতে তার সন্তান ‘সাঈদীর’ জন্য আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে দোয়া করতেন। আব্বা আল্লামা হয়ে উঠার পেছনে আমার দাদির চোখ ভেজানো দোয়াই যে এক বিশাল নিয়ামক ছিল এই গল্প হয়তো অনেকেরই অজানা। আব্বা বাহির থেকে ফিরেই প্রথমে দাদির রুমে ঢুকতেন। আব্বাকে কখনো দাদির মাথার কাছে বসতে দেখিনি। সবসময় আব্বা এসে দাদির পায়ের কাছে বসতেন। বসেই দাদির পা দুটোকে জাড়ায়ে ধরে কোলে নিয়ে চুমু খেতেন। বিনয়ের সাথে দাদির খোঁজ খবর নিতেন। দাদির প্রয়োজন পূরণ ছিল আব্বার কাছে সবকিছুর উর্ধ্বে। আব্বা কোন সমস্যা কিংবা বিপদের মুখোমুখি হলে শুধু ফোনে দাদিকে জানাতেন, মা আমার যে আপনার দোয়া লাগবে। ঐ অবস্থায় দাদি অযু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। আল্লাহর কাছে তার কলিজার টুকরা ছেলে ‘সাঈদীর’ জন্য কেঁদে কেঁদে দোয়া শুরু করে দিতেন আর বলতেন, ইনশাআল্লাহ আমার ‘সাঈদীর’ কিছুই হবেনা। আল্লাহ দাদির দোয়া এত দ্রুত কবুল করতেন যে, আব্বা নিজেই অবাক হয়ে যেতেন। বিরোধীদের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, ফাঁদ থেকে আব্বাকে আল্লাহ এভাবেই উদ্ধার করেছেন। আমার দাদা বেচে থাকাকালীন সময়ে আব্বা দাদার চোখের মণি ছিলেন। ছেলের জন্য দাদাকে আমরা যতটা পেরেশান দেখেছি, সেটা ছিল বিরল! আব্বাকেও তার পিতা মাতার প্রতি যতটুকু যত্নবান এবং সতর্ক দেখেছি আমাদের কাছে মনে হত আল্লাহর কুরআনে পিতা মাতার হক্বের ব্যাপারে সুরা বনী ইসরাঈলের ২২ এবং ২৩ নাম্বার আয়াতের নির্দেশনাগুলোর মাত্রই নাযিল হল আর আব্বা সেগুলো দেখে দেখে আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বাবা মায়ের সাথে আচরণ করছেন। আয়াতে বর্ণিত বাবা মায়ের হক্বের ব্যাপারে নির্দেশনাগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে আব্বা এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন। আব্বার একাধারে এত বিভাগে সফলভাবে পদচারণার মূলে যে আমার দাদা দাদির দোয়াটাই নিয়ামক শক্তি ছিল। আল্লাহ এই দোয়ার বরকতেই আব্বাকে একজন গ্রহনযোগ্য নেতা ও দা’ঈ ইলাল্লায় পরিণত করে দিয়েছেন।
একজন দা’ঈ ইলাল্লাহ। যিনি আল্লাহর পথের আহ্বান কারী। আল্লাহর পথে আহ্বান কারীদের বিশেষ কিছু গুণ থাকে। এ ময়দানে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি প্রয়োজন হয়, সেটি হচ্ছে ব্যক্তির কথা এবং আহ্বানের সাথে ব্যক্তির ব্যক্তিজীবনের সামঞ্জস্যতা। অর্থাৎ যিনি আল্লাহর পথে আহ্বান করছেন, দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছেন, দা’ঈ ইলাল্লাহর ভূমিকা পালন করছেন সেই দাওয়াত তার নিজের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনে কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে, একজন দা’ঈ ইলাল্লাহর জন্য এটি একটি ভাইটাল পয়েন্ট। যারা আল্লাহ পথের দা’ঈ হন তাদের ব্যাপারে কুরআন এবং হাদীসে বারবার সতর্কবানী এসেছে। যে বিষয় নিয়ে তারা দাওয়াতের ময়দানে জনসাধারণের উদ্দেশে কথা বলেন তার কতটুকু প্রতিফলন নিজের জীবন এবং পারিবারিক জীবনে ঘটাতে পেরেছেন এটি মৌলিক প্রশ্ন। যারা ময়দানে মানুষের উদ্দেশ্যে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত প্রদান করে থাকেন সর্বপ্রথম তাদেরকে সেই দাওয়াতের বাস্তব উদাহরণ হতে হয়। এটাকে বাস্তব সাক্ষ্যও বলা হয়। কেউ যদি দাওয়াতকৃত বিষয়ের উপর বাস্তব সাক্ষ্য না হতে পারেন তাকে মূলত দা’ঈ ইলাল্লাহ বলারও সুযোগ নেই। একজন দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবে আব্বার সবচেয়ে বড় গুণ যেটি আমরা লক্ষ্য করেছি সেটি হল, আব্বা দাওয়াতের ময়দানে যা পেশ করতেন আব্বার বাস্তব জীবনে তা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হত। এক কানাকড়িও তিনি মাহফিলের মঞ্চে বসে বেশী বলতেন না, যা তিনি নিজে করতে পারতেন না। আব্বার যখন মাহফিল থাকত আব্বা তার দীর্ঘ সময় পূর্ব থেকেই মাহফিলে আলোচনার বিষয়বস্তুর উপর বিষদ প্রস্তুতি নিতেন। আব্বা সবসময় ভয়ে থাকতেন যে তার মাহফিলে লক্ষ লক্ষ লোক হয়, এত লক্ষ মানুষের সামনে তিনি আল্লাহর দ্বীনকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন কিনা। কথার মধ্যে কোন ভুল হয়ে যায় কিনা, মুখ দিয়ে কোন শব্দ কুরআন ও হাদীসের বিপরীতে বের হয়ে যায় কিনা! আব্বা মাহফিলে যাওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে এ সকল বিষয়ে সাহায্য চাইতেন। আব্বা ব্যাপক অধ্যয়ন করতেন। মাহফিলে আলোচনার জন্য আব্বা যেভাবে প্রস্তুতি নিতেন মনে হত আব্বার খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন পরীক্ষা আছে। বহু মাহফিলে আব্বার সাথে সফরসঙ্গি হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আব্বার জন্য মাহফিল কতৃপক্ষ উত্তম মেহমানদারির ব্যবস্থা রাখতেন। এত পরিমাণ লোক আব্বার সাথে সাক্ষাতে আসত আব্বা দাঁড়িয়ে সবার সাথে মুসাফাহা মুয়ানাকা করতেন। কোন বিরক্তি কিংবা ক্লান্তিভাব আব্বার মধ্যে দেখতামনা। শুরু থেকে শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত আব্বার মুখে একই ধরনের হাসি ফুটে থাকত। স্টেজে উঠার আগে আব্বা আবারও দুই রাকাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর দরবারে সাহায্য চাইতেন। আব্বার বয়ানের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তিনি কখনো রাষ্ট্রশক্তিকে ভয় করে কথা বলতেন না। এ ব্যাপারে আব্বা এতটাই কঠোর ছিলেন যে ঠিক কুরআন শরীফের সুরা ফাতাহর ২৯ আয়াতের প্রতিচ্ছবিই মনে হত আব্বাকে যে, “মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তার সাথীরা কাফেরদের ব্যাপারে ছিলেন অত্যধিক কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে ছিলেন একেবারেই রহম দিল”। আব্বা নিজের পরিবেশে এতটাই নমনীয় থাকতেন যে বুঝাই যেতনা কাফের, মুশরিকদের ব্যাপারে এই কন্ঠই একটু পরে বজ্রকন্ঠ হয়ে প্রতিধ্বনিত হবে। আব্বার মাহফিলের ব্যাঘ্র কন্ঠ আর স্বাভাবিক অবস্থার নমনীয় কন্ঠ মিলানো কঠিন হত। আব্বার স্বাভাবিক নমনীয় কন্ঠ শুনে বুঝাই যেতনা যে এই কন্ঠেই ইসলাম বিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে আগুন ঝরে।
যে সকল আলেমগণ আব্বার মাহফিলে বক্তা হিসেবে আসতেন আব্বা তাদের প্রতি এতটাই সম্মান দেখাতেন আমরা মুগ্ধ হয়ে শুধু দেখতাম। আব্বাকে আমি মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতাম, ‘আব্বা আপনার জন্য মানুষ এত পেরেশান, আপনাকে এক নজর দেখার জন্য মানুষ এতটা ব্যাকুল থাকে, আপনি এত জনপ্রিয় এ বিষয়গুলো নিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?’ আব্বা চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলতেন, ‘আমি ভয় করি কেয়ামাতের দিন আল্লাহ যদি আমাকে ডেকে বলে হে সাঈদী, আমি যা দেয়ার তা তোমাকে দুনিয়াতেই দিয়ে দিয়েছি। ইজ্জত সম্মান সবইতো তোমাকে দুনিয়াতে দিয়ে দিয়েছি, আখেরাতে আর কি চাও তুমি আমার কাছে!’ এ কথা বলেই আব্বা অঝোর ধারায় কাঁদতেন আর বলতেন, ‘তোমরা আমার যে খ্যাতি, ইজ্জত সম্মান আর জনপ্রিয়তা দেখ আমি তার উল্টোদিকে রবের জবাবদিহীতা আর জিজ্ঞাসার ভয়ে তটস্থ থাকি।’ আল্লাহু আকবর! এত যশ খ্যাতি সম্মান কোন কিছুই আব্বাকে মোহিত করতনা। এসব কিছুই আব্বাকে অহংকারী করতনা। আব্বা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নিজ গৃহে ডুকে সেজদায় পড়ে যেতেন। এত যশ খ্যাতি আব্বার ভেতরে কখনো বিন্দু বিসর্গ পরিমাণ অহংকার ঢুকাতে পারেনি। আব্বার জীবন ধারণের মান ছিল একেবারেই সাধারণ। তিনি দুনিয়ার এই সময়গুলোকে একজন মুসাফিরের সফরকালীন সময়ের সাথে তুলনা করেই জীবন ধারণ করতেন। আব্বা সুযোগ পেলেই আলেমদের সেবা করতেন। আলেমদের দোয়া নেয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন।
আব্বা মাহফিলকে দাওয়াতের মিশন হিসেবে গ্রহন করেছিলেন পরিপূর্ণ ইখলাসের সাথে। তিনি নিজেকে একজন পরিপূর্ণ দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবে আল্লাহর দরবারে পেশ করতে চেয়েছিলেন। মাহফিলের জনসমুদ্রটাকে তিনি আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহন করেছিলেন। দা’ঈ ইলাল্লা যারা হন তাদের বিনিময় তাদের পুরস্কারতো একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আলামীনই দিয়ে থাকেন। আব্বাকে মাহফিল কতৃপক্ষ সামান্য যা কিছু হাদিয়া দিত- এমন অসংখ্য মাহফিলের হাদিয়া আব্বা ঐ এলাকার বঞ্চিত মানুষদের কল্যাণে দান করে এসেছেন। আব্বাকে কখনো মাহফিলের হাদিয়া নিয়ে কিঞ্চিৎ পরিমাণ উৎসাহিত হতে দেখিনি। মনে হত হাদিয়া মাহফিলের সাথে সম্পর্কিত কোন বিষয়ই না। আব্বা হাদিয়া গ্রহন করতেন এবং হাদিয়ার সে অর্থ আবার দ্বিনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মানে ব্যায় করতেন। হাদিয়ার অর্থ নিয়ে এ আব্বার মধ্যে কোন রকম উচ্ছাস কিংবা আগ্রহ ছিলনা। অনেক ক্ষেত্রেই আব্বা প্রদানকৃত হাদিয়া ঐ এলাকার সংগঠন কিংবা তাদের কাছ থেকে জেনে প্রয়োজনীয় সেই খাতে দান করে আসতেন। তাফসীর মাহফিল করা আব্বার পেশা ছিল না, বরং এটাকে তিনি মহান রবের পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া দ্বায়িত্ব মনে করতেন। আব্বা পরকালে আল্লাহর দেয়া পুরস্কারের আশায় তৃষ্ণার্ত থাকতেন। আর নবী রাসুলগণের দাওয়াত দেওয়া সময়কালীন দুর্দশা ও দরিদ্রগ্রস্থ অবস্থার কথা স্বরণ করতেন। নবিজী সারাদিন দাওয়াত দিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘরে এসে ক্ষুধার্ত অবস্থায় আয়েশা (রা:) এর কাছে কিছু খাবার চেয়েছিলেন। জবাবে আয়েশা (রা:) বলেছেন আমার ঘরে মশকের তলায় এক মগ পানি ছাড়া যে আর কিছু নেই। নবিজী এই দাওয়াতের ময়দানে কাজ করতে গিয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে পাথর পর্যন্ত বেধেছিলেন। একদিন সাহাবী ইবনে মাসউদ (রা:) সহ নবিজী হাটছিলেন। পথিমধ্যে একটি খেজুর বাগান পড়ল। বাগানের নিচে পরিত্যাক্ত অবস্থায় কিছু খেজুর পড়েছিল। খেজুরগুলো এমনভাবে ধুলোয় আচ্ছাদিত অবস্থায় ছিল যে, খেজুর বাগানের মালিক সেই খেজুরগুলো গ্রহন করেন না। নবিজী সেখান থেকে কিছু পঁচা খেজুর উঠিয়ে হাতের তালুতে রেখে ধুলা পরিস্কার করে একটি খেজুর মুখে দিলেন আর ইবনে মাসউদকে বললেন, মাসউদ তুমিও খেজুর নাও। ইবনে মাসউদ জাবাবে বললেন, আমার চাহিদা নেই ইয়া রাসুলুল্লাহ। প্রতিউত্তরে নবিজী বললেন আমার চাহিদা আছে মাসউদ। তুমি জাননা আজ থেকে গত ৪ দিন আমার পেটে কোন দানা পানি পড়ে নাই। আব্বা এই ইতিহাসগুলো স্বরণ করতেন আর কেঁদে কঁদে বলতেন, আমার নবিজী দাওয়াতের এই উত্তপ্ত ময়দানে এত কষ্ট করেছিলেন, আমরা সেই ময়দানে কি ভূমিকা রাখছি! নবিজীর রেখে যাওয়া দাওয়াতের এই মিশন মানেতো শুধু উষ্ণ আথিতেয়তা আর হাদিয়া নয়। দু:খ কষ্ট নির্যাতন ছাড়া এ দাওয়াতের হক্ব আদায় করা কিভাবে সম্ভব! আলহামদুলিল্লাহ এই ময়দানে হাদিয়া আব্বার কাছে একটা নগণ্য ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই ছিলনা।
আব্বা ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ, চট্টগ্রাম কর্তৃক আয়োজিত মাহফিলে তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘যারা ইসলামী শাসন চান, দ্বীনের বিজয় চান, তাদের অসংখ্য মানুষকে পোড়া ইঁটের মত জেলখানায় পুড়ে পুড়ে মরতে হবে। ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হবে। গায়ের রক্ত দিতে হবে। শহীদ হতে হবে। তারপরেই ইসলামের ইমারতটা কায়েম হয়ে যাবে।’ আব্বা মনের গভীর থেকেই দ্বীনের বিজয় আর ইসলামী শাসন চেয়েছিলেন বলেই আজ তিনি নিজেই নিজের বক্তব্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণে পরিণত হয়ে গেছেন। ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত অতিথি হিসেবে আব্বা তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আমি যে পথে এসেছি- সে পথতো সংবর্ধনা পাওয়ার পথ নয়। এ পথতো ফুল বিছানো নয়। এ পথ আরাম আয়েশের পথ নয়।’ সেদিন এ পথের যে ধরণ এবং প্রকৃতি আব্বা তার বক্তব্যে তুলে ধরেছিলেন আজ তিনি প্রাকটিক্যালি উদাহরণ হয়েই সে পথের পথিকদের বাস্তবিক অবস্থার নজির এঁকে দিয়ে গেছেন। একজন প্রকৃত দা’ঈ ইলাল্লাহ যে কথা মানুষকে শুনান সে কথার প্রতিফলন নিজের জীবনে ঘটাতে পারাই তো স্বার্থকতা। আল্লাহ তায়ালা আব্বাকে হয়তোবা তার কথা অনুযায়ী কবুলও করে নিয়েছেন।
একজন দায়ী ইলাল্লাহর পাশাপাশি আব্বা একাধারে সমাজ, সংসদীয় এলাকা, সংগঠন সহ বিভিন্ন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ জিম্মাদারী পালন করেছেন। আব্বার নেতৃত্ব দেয়ার ধরন আমাদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। হযরত যায়েদ (রা:) থেকে বর্ণিত এক বর্ণণায় তিনি বলেন, আমি দশ বছর নবিজীর খেদমত করার সুযোগ পেয়েছি। এই দশ বছরে নবিজী আমার সাথে কখনো মন খারাপ করে কথা বলেন নাই। অর্থাৎ নবিজীর খাদেম ছিলেন হযরত যায়েদ। তার খেদমতকালীন সময়ে নবিজী তাঁর সাথে কখনো ধমক দিয়ে কথা বলাতো দুরের কথা চেহারা খারাপ করে পর্যন্ত কথা বলেন নাই। আল্লাহর রাসুলের নেতৃত্বে অধিস্তনদের প্রতি কোমলতার যে নীতি ছিল আব্বা তার অধস্তনদের প্রতি একই নীতি অবলম্বন করার চেষ্টা করতেন। আব্বার গাড়ির ড্রাইভার যে হত, নিতান্ত তার পারিবারিক বা অন্য কোন সমস্য না হলে সে আর চাকুরী ছাড়তো না। ১৯৮৩ সালে আব্বা প্রথম গাড়ি কিনেছিলেন। সেই থেকে আব্বা গ্রেফতার হওয়া আগ পর্যন্ত এই দীর্ঘ ২৭ বছওে সব মিলিয়ে আব্বার গাড়ির ডাইভার হিসেবে কাজ করেছেন হয়তো ৪ বা ৫জন। যারা তাদের একান্ত ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে চাকরী ছেড়ে গেছেন তারা চোখে পানি ফেলে হাহাকার করতে করতে গেছেন। কোন উত্তম নেতৃত্বের মূল খুটিই হল অধিস্তনদের সাথে নেতার উত্তম ব্যবহার, কোমল আচরণ। যিনি নেতা হন কর্মীরা তার আনুগত্য করবে এটাই নীতি। কিন্তু নেতার ধরন ভেদে আনুগত্যের ধরনেরও ভিন্নতা থাকে। অন্তর থেকে ভালোবেসে আনুগত্য আর বাধ্য হয়ে গতানুগতিক আনুগত্য, নেতা ভেদে এই দুই ধরনের আনুগত্য করে থাকে অধিস্তনরা। নবিজী অধিস্তনদের সাথে ব্যবহারে কোমল না হলে তার পরিণতি কি হত সে ব্যাপারে মহান রব্বুল আলামীন কুরআন মাজীদের সুরা আল-ইমরানের ১৫৯ নাম্বার আয়াতে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, “হে নবী আপনি অধিস্তনদের প্রতি বড়ই কোমল। যদি অধস্তনদের প্রতি আপনি কোমল না হয়ে কঠোর হতেন তাহলে দেখতেন আপনার চারপাশ থেকে সবাই সরে যেত”। প্রকৃত নেতা বা দায়িত্বশীলের ধরন এবং আচরণ কেমন হওয়া দরকার সেটা কুরআন ও হাদীসে বহু জায়গায় নির্দেশনা এসেছে। আব্বা যখন একজন নেতা, নেতা হিসেবে আব্বার নেতৃত্বে কুরআন ও হাদীসের সেই নির্দেশনার যথাযথ প্রতিফলনটাই আমরা লক্ষ্য করেছি।
আব্বার যেমন অধস্তন আনুগত্যকারী ছিল, তেমনি আব্বার উর্ধ্বতনও দায়িত্বশীল এবং কতৃপক্ষও ছিল। দ্বীনি আন্দোলনে এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনে অধস্তনদের ব্যাপারে আব্বা যতটা কোমল ছিলেন উর্ধ্বতনদের ব্যাপারে আব্বা ততটাই আনুগত্যশীল ছিলেন। দ্বীনি আন্দোলনে আব্বা এমন কিছু জিন্দাদিল মুজাহিদদের অধস্তন এবং সহকর্মী ছিলেন যারা দ্বীনের ঝান্ডা আঁকড়ে ধরে শাহীদ হিসেবে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে গেছেন। আব্বা এমন কিছু সোনার মানুষের অধিনস্থ এবং সহকর্মী ছিলেন আব্বা এ ব্যাপারে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতেন। আব্বার প্রতি যেমন লক্ষ কোটি মানুষের নিখাদ ভালোবাসা আর শর্তহীন আনুগত্য ছিল, আব্বা তার দায়িত্বশীলদের প্রতিও এতটা শ্রদ্ধাশীল আর আনুগত্যশীল ছিলেন, সেই চিত্র বর্ণণা করার উপযুক্ত ভাষা আমার জানা নেই। সংগঠনের দায়িত্বশীলদের প্রতি আনুগত্য, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা আব্বার মধ্যে এত গভীর ছিল, যেমন ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং আনুগত্য ছিল প্রিয় নবিজী এবং সাহাবীদের মধ্যে। মাঝে মাঝে মনে হত মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বর্ণিত “বুনয়ানুম মারসুসের” উপযুক্ত উদাহরণ আব্বা এবং আব্বার দায়িত্বশীলদের মধ্যে প্রতিফলন ঘটেছে। নবিজী হাদীসে বলেছেন, কেয়ামতের দ্বীন এমন এক শ্রেণীর মানুষের মর্যাদা দেখে স্বয়ং নবীরা পর্যন্ত ইর্ষা করবে। অথচ তারা নবীও নয় শহীদও নয়। তারা এমন একদল মানুষ যারা শুধু দ্বীনের খাতিরে একে অপরকে নিখাদ ভালোবাসায় আবদ্ধ করেছিল। অথচ তারা মায়ের পেটের ভাইও নয়, পরস্পর কোন আত্মীয়-স্বজনও নয়। তাদের ভালোবাসা এবং বন্ধনের মূলে ছিল শুধু আল্লাহর দ্বীন। আল্লাহর এই দ্বীনের খাতিরে আব্বা এবং তার শহীদ দায়িত্বশীলরা এমন এক অনন্য বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন তার নজির আমাদের সামনে আর আসবে কিনা আমরা জানিনা। আব্বা সহ আমাদের সকল শহীদ নেতৃবৃন্দের এক মোহনীয় হৃদয়কাড়া বন্ধন আজও চোখের কোণে পানি এনে দেয়। নিরবে নিভৃতে সেই স্মৃতিগুলো এখনো কাঁদিয়ে যায়।
আমীরে জামায়াত, সেক্রেটারী জেনারেলসহ দ্বায়িত্বশীল সহকর্মীবৃন্দের প্রতি আব্বা খুব উঁচুমানের আনুগত্যের মানসিকতা পোষণ করতেন। আল্লাহ এবং রাসুল (সা:) এর পরে উলিল আমর হিসেবে সংগঠন এবং দায়িত্বশীলদের প্রতি আব্বা নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সঁপে দিয়েছিলেন। আব্বার মাহফিলের ময়দান এবং জনপ্রিয়তার আলাদা বিশ্বজোড়া এক বিশাল জগত থাকলেও আব্বা কখনো এ অর্জনকে নিজের ভাবতেন না। কিংবা এত বিশাল জগতজোড়া খ্যাতির অধিকারী হয়েও নিজেকে কখনো আলাদা করে ভাবতেন না। তিনি সবসময় বলতেন সংগঠন বাদ দিলে আমারতো আর কিছুই থাকেনা। এত উঁচু মাপের একজন বিশ্বনন্দিত ব্যক্তি হয়েও তিনি সর্বাবস্থায় নিজেকে দ্বীনী আন্দোলনের একজন ক্ষুদ্র কর্মীই ভাবতেন। আব্বা সংগঠনের আনুগত্যের বাহিরে নিজের সিদ্ধান্তে বিন্দুবিসর্গ কিছু করেছেন এমন কিছু আমাদের দৃষ্টিতে নাই। আব্বার সুযোগ ছিল নিজের তৈরীকৃত ময়দান এবং অবস্থান দিয়ে নিজ থেকে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার কিংবা নিজের ইচ্ছায় পরিচালিত হওয়ার। আব্বার সামনে এমন লোভনীয় অফারও কম ছিলনা। আব্বাকে ঘিরে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গড়ার বহু চাকচিক্যময় আয়োজনও হয়েছিল। আব্বাকে নিজেদের করে পাওয়ার জন্য বহু দিক থেকে বহু আয়োজনও হয়েছিল। আব্বার জন্য বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন ঘরানা থেকে এই আগ্রহে সবার প্রতি বিনয়ের সাথে আব্বা কৃতজ্ঞতা পোষণ করতেন। কিন্তু আব্বা সংগঠন এবং দায়িত্বশীলদের সিদ্ধান্তের বাহিরে নিজের মত করে একটি সিদ্ধান্তও গ্রহন করেন নি। আব্বা দ্বীনী আন্দোলনের একজন নেতা হিসেবে নিজেকে সংগঠনের এতটাই আনুগত্যের জালে আবদ্ধ করে দিয়েছিলেন যে, আব্বার নিজের বলতে কিছুই ছিলনা। আব্বা নিজেকে পুরোটাই সংগঠনের কাছে সোপর্দ করে দিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে বাইয়্যাত গ্রহনের পর থেকে সুরা তাওবার ১১১ নাম্বার আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা অনুযায়ী আব্বা জান-মাল কোন কিছুই আর নিজের মনে করেন নি। সবকিছুই তিনি দ্বীনী সংগঠনের মাধ্যমে দয়াময় আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আব্বার শাহাদাতের গভীর তামান্নার মূল উৎস এ ছিল জায়গাটাই।
সাবেক আমীরে জামায়াত শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম, আব্বাস আলী খান, শহীদ মতিউর রহমান নিজামী, শহীদ সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, শহীদ কামারুজ্জামান, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা, শহীদ মীর কাশেম আলীসহ শহীদ নেতৃবৃন্দ, এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে আমাদের শহীদবাগের বাসায় বহু সংখ্যকবার মেহমানদারি করার সুযোগ হয়েছে আমাদের। কোন দায়িত্বশীল যেদিন বাসায় আসতেন আব্বা দায়িত্বশীলদের উত্তম মেহমানদারির জন্য পেরেশান থাকতেন। আব্বা নিজে ৫তলা থেকে ১ম তলায় নেমে দায়িত্বশীলদেরকে রিসিভ করে আনতেন। নিজের বসা চেয়ারটা ছেড়ে দিতেন দায়িত্বশীলদের জন্য। যতক্ষণ দায়িত্বশীলগণ থাকতেন আব্বা ততক্ষণ দায়িত্বশীলদের একজন খাদেমের মতই থাকতেন। দায়িত্বশীলগণ আব্বাকে বলতেন, ‘আপনি আমাদের জন্য যে পেরেশান হয়ে যান মর্যাদার দিক থেকে আল্লাহতো আপনাকে আমাদের চেয়ে অনেক উর্ধ্বে রেখেছেন।’ আব্বা জবাবে বলতেন, ‘নবী রাসুলগণের পরে আমি আমার দায়িত্বশীলদের প্রতি আনুগত্যের ব্যাপারে নির্দেশিত হয়েছি। আমি ভয় করি আমার দায়িত্বশীলদের আনুগত্য কিংবা শ্রদ্ধা সম্মানের কোন বরখেলাফ আমার দ্বারা হয়ে যায় কিনা।’ এমনই এক মধুর, কোমল এবং শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল আব্বার সাথে দায়িত্বশীলদের। সংগঠনের কোন সিদ্ধান্ত বা আদেশ আব্বা নিজের জন্য শিরোধার্য করে নিতেন। জালিম সরকার আব্বাকে গ্রেফতার করার পর সরাসরি প্রস্তাব করেছিল জামায়াতকে অস্বীকার করে তিনি তার লাখো কোটি ভক্তকুল নিয়ে আলাদা আরেকটি ইসলামী দল গঠন করার জন্য। বিনিময়ে আব্বাকে মুক্ত করে দেয়া হবে, যুদ্ধাপরাধ মামলা হবেনা এবং তার ইচ্ছামত পুরো বিশ্বে বিচরণের সুযোগ করে দেয়া হবে, আর প্রস্তাব মেনে না দিলে জেল, জুলুম, জরিমানা, কারাদন্ড এমনকি ফাসিও হতে পারে। সরকরের এসব প্রস্তাব মেনে নিলে আব্বা হয়তো জেল জীবন থেকে মুক্ত হয়ে দুনিয়ার আয়েশী জীবন পেতেন। কিন্তু সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে হুজায়ফা (রা:) কে রোম সম্রাট সম্রাজ্যের ভাগ দেয়ার লোভ দেখিয়ে কি দ্বীন থেকে এক চুল পরিমাণ দূরে সরাতে পেরেছিল? খাদ্য পানিয় না দিয়ে উপোস অবস্থায় দিনে পর দিন কারাগারে আটকে রেখেও কি হুজায়ফা (রা:) কে টলানো সম্ভব হয়েছিল? টগবগে ফুটন্ত তেলের উপর নিক্ষেপের ভয়ও হুজায়ফা (রা:) কে দ্বীন থেকে এক চুল পরিমাণ সরাতে পারেনি। আল্লামা সাঈদীরা তো সেই হুজায়ফাদেরই উত্তরসূরী। সেই একই দ্বীনের ঝান্ডাবাহী। আল্লামা সাঈদীকে কিভাবে চাকচিক্যময় প্রস্তাব দিয়ে টলানো যাবে!? আমার সম্মানিত পিতা কোরআনের পাখি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সেদিন বলেছিলেন, ‘আমাকে ভয় দেখাও! আমি তো নমরুদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত ইব্রাহীমের সাহসী সন্তান। ছুড়ির নিচে শায়িত আল্লাহর প্রেমের নজরানা ইসমাইলের উততরসূরী। আমাকে ভয় দেখিয়ে কি লাভ? সেদিন তিনি ব্যাঘ্র কন্ঠে তাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, তোমাদের প্রস্তাব মেনে নেয়ার চেয়ে কারাগারের ছোট আয়তনের চার দেয়ালের জীবন আমার জন্য অনেক শ্রেয়। আমি আমার সংগঠন এবং দায়িত্বশীলদের সাথে গাদ্দারী করে মুনাফিক হয়ে দুনিয়ার আয়েশী জীবন বেছে নিয়ে মহামূল্যবান আখেরাত হারাতে চাইনা। একজন নেতা হিসেবে আব্বা সেদিন সংগঠনের প্রতি তার সর্বশেষ হক্বটাও সম্ভবত আদায় করে গিয়েছিলেন। আব্বা দ্বীনী আন্দোলনের একজন নেতা ছিলেন। একই সাথে তিনি দুই দুইবারের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যও ছিলেন। বিশাল এলাকার জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার সার্বিক মান উন্নয়নসহ লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধি ছিলেন আব্বা। আব্বার মুখে সবসময় একটি কথা আমরা শুনতাম। সবসময় তিনি বলতেন, ‘আমার এ এলাকার প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাপারে কাল কেয়ামাতে আল্লাহর দরবারে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।’ সরকার কতৃক প্রদত্ত সংসদীয় এলাকার নাগরিকদের প্রতি আব্বার দায়বোধ ছিল অনেক বেশী। আব্বাকে এলাকার আপামর জনসাধারণ শুধু তাদের এমপি-ই মনে করতেন না। আব্বাকে তারা তাদের আধ্যাত্মিক নেতাও মনে করতেন। আব্বা এলাকায় গেলে সাধারণ মানুষ পঙ্গপালের ছুটে আসত আব্বার দোয়া নেয়ার জন্য। কারো অসুস্থতায় আব্বার দোয়া ছিল আরোগ্য লাভের বিরাট উসিলা। এলাকার আপামর জনসাধারণের নিকট এটা প্রসিদ্ধ ছিল যে, ‘হুজুর কারো সুস্থতার জন্য দোয়া করলে আল্লাহ দয়া কওে তাকে সুস্থ করে দেবেন।’ আব্বা নবিজীর শেখানো পদ্ধতিতে রুকিয়া করতেন। আল্লাহর নামে দোয়া করে দিতেন। আল্লাহ সুস্থ করে দিতেন রোগীকে। এটা আব্বার প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিরাট এক দয়া ছিল। আব্বার প্রতি মানুষের এই গভীর বিশ্বাস এবং ভালোবাসা ছিল এক অনন্য মাত্রার। আব্বা এলাকায় গেলে রাত দিন মানুষের সাথে কাটাতেন। সবার সমস্যা শুনতেন। এক এক করে সবার কথা শুনতেন। সমাধান করার চেষ্টা করতেন। আব্বা যতদিন এলাকায় থাকতেন হেটে হেটে এলাকার একেবারে খেটে খাওয়া মানুষদের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করতেন। মানুষজন কি অবস্থায় জীবন পার করছে আব্বা তা স্বচক্ষে দেখার জন্য বের হয়ে যেতেন এবং সমাধানের চেষ্টা করতেন। আমি প্রায়শই আব্বার সঙ্গি হতাম। নদীর চরের মানুষদের অবস্থা দেখার জন্য আব্বা ছোট নোকায় করে নদী পার হতেন আর অপর পাড়ে চরের হাজার হাজার মানুষ আব্বাকে রিসিভ করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকত। সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করে পিরোজপুরের একটি চর উদ্ধার করে আব্বা সেখানে প্রায় ৩ হাজার লোকের আবাসন গড়ে দিয়েছিলেন। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে আব্বা অবিরত পরিশ্রম করে গেছেন। চরের কাদামাটি মেশানো বাতাসে এখনো আব্বার ঘ্রাণ খুঁজে বেড়ায় চরের লোকজন। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের নিরাপদ এক আশার জায়গা ছিল ‘আল্লামা সাঈদী।’
আব্বা তার নির্বাচনী এলাকায় গেলে এলাকার প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভালো খাবারের আয়োজন করতেন। যাদের জীবন যাত্রায় সচরাচর ভালো আহার জুটতো না, আব্বা তাদের জন্য উত্তম মেহমানদারির ব্যবস্থা করতেন। আমাদের বাড়ির উঠোনে এ আয়োজন হত। সারিবদ্ধভাবে বসে মানুষগুলো তৃপ্তি সহকারে খাবার খেত আর আব্বা হেটে হেটে মানুষগুলোর তৃপ্তির ঢেকুর দেখে দেখে আনন্দে চোখের পানি ফেলতেন। আব্বা বাড়িতে থাকাকালীন সময় পুরো এলাকা জুড়ে একটা উৎসবের আমেজ বয়ে যেত। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন সকলেই একসাথ হয়ে আব্বার সাথে এই আনন্দগুলো উপভোগ করত। আহা কি মধুর সময় আল্লাহ তায়ালা আমাদের দিয়েছিলেন!
আব্বা এলাকায় সফরকালীন সময়ে সরকারী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ আব্বার জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় উন্নতমানের সব আয়োজন করতে চাইতেন। কিন্তু আব্বা কখনো তাদের এ আপ্যায়ন গ্রহন করতে চাইতেন না। তাদেরকে আব্বা নিষেধ করতেন এ ধরনের আয়োজন করে যেন সরকারি কোষাগারের অপচয় না করেন। আব্বা সরকারী ভিআইপি আয়োজন প্রত্যাখ্যান করে তার নিজ এলাকার মাটি মানুষদের সাথে কাঁচা ঘরে থাকতে পছন্দ করতেন। আব্বার সিকিউরিটির কাজে নিয়োজিত পুলিশ এবং আনসার সদস্যদের আব্বা কখনো সাথে সাথে নিয়ে ঘুরতেন না। তাদেরকে রিলাক্স করে দিতেন। তারা কাচারি (গ্রামের ড্রইং রুম) ঘরে গিয়ে রিলাক্স করত, ঘুমাত। আব্বা আত্মীয়-স্বজনদের হক্বের ব্যাপারে ছিলেন খুব সচেতন। আব্বার চিন্তা কোনদিন আমাদের পারিবারিক ধন সম্পদ অর্জন কিংবা জীবনে জৌলুস কেন্দ্রিক ছিলনা। তিনি বলতেন, ‘আমি যতটুকু এলাকা, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য করতে পেরেছি মূলত ঐটুকুই আমার নিজের জন্য করা।’
একজন নেতা হিসেবে সংগঠন, সমাজ, এলাকা ও সংসদীয় আসনের প্রতি আব্বার মধ্যে আমরা যে দায়িত্ববোধ এবং জবাবদিহীতার গভীর চেতনা দেখেছি, মনে হত খেলাফতে রাশেদার শাসনামলের সেই সময়ের কিছুটা আমেজ আমরা উপভোগ করছি। একজন শাসক হিসেবে দরিদ্র মহিলার প্রতি হযরত ওমর (রা:) যে দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহর দরবারের জবাবদিহীতার যে ভয় মনে লালন করতেন, একজন নেতা হিসেবে আব্বার মধ্যে আমরা তার কিছুটা হলেও প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছি। খেলাফতে রাশেদার শাসনামলকে নবিজী সবচেয়ে উত্তম যুগ হিসেবে ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। খেলাফতে রাশেদার আমলের মত সেই মানের শাসক দুনিয়াতে আর তৈরী হবেনা। কিন্তু নবিজীর প্রকৃত ওয়ারিশদের মধ্য থেকে আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে কিছু ন্যায়পরায়ণ নেতা তৈরী করে দিয়ে এ দুনিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখবেন। সেই ন্যায়পরায়ণ নেতাদেরকে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামাতের দিন কঠিন তাপদাহের মধ্যে নিজ অনুগ্রহে তার আরশের ছায়ার নিচে জায়গা করে দিবেন বলে নবিজী (সা:) হাদীসে ঘোষণা করেছেন। একজন নেতা হিসেবে আমার পরম শ্রদ্ধেয় আব্বা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রাহিমাহুল্লাহর জন্য আমরা আল্লাহর কাছে সেই কামনাই করি।
আব্বা আজ আর দুনিয়াতে নেই। তিনি রাষ্ট্রীয় ভাবে এক জঘণ্য জুলুমের শিকার হয়ে মজলুম অবস্থায় দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করে গত ১৪ আগষ্ট ২০২৩ শহীদ হিসেবে পরকালীন সফরে যাত্রা শুরু করেছেন। একজন বাবা, নেতা ও দা’ঈ ইলাল্লাহ হিসেবে সকল ক্ষেত্রেই তিনি আমাদের জন্য যে আদর্শ তৈরী করে গিয়েছেন তা যুগ যুগ ধরে অনুকরনীয়, অনুসরণীয় হয়েই থাকবে ইনশাআল্লাহ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম এবং নবিজীর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে আল্লাহর জমিনে তার রুবুবিয়াত উলুহিয়াত প্রতিষ্ঠার যে বজ্রধ্বনি তিনি উঠিয়েছিলেন যুগ যুগ ধরে দ্বীনের ঝান্ডাবাহীদের কন্ঠে এবং কাজে সে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতেই থাকবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লামা সাঈদী (র.)! ইতিহাসের ক্ষণজন্মা এক মহান ব্যক্তিত্ব। আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা। আমার পরম শ্রদ্ধেয় নেতা। দ্বীনের যুগশ্রেষ্ঠ একজন দা’ঈ। আপনি আল্লাহর ক্ষমা লাভ করুন। আল্লাহ আপনাকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন। কোটি কোটি মানুষ এই কামনায় আপনার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে প্রতিনিয়তই অশ্রু ঝরাচ্ছে। আর সন্তান হিসেবে আমি আমার হৃদয়ের সকল আকুতি দিয়ে মহান রবের কাছে আর্তনাদ করছি, ‘হে আরশের মালিক! তুমি আমার সম্মানিত পিতা আল্লামা সাঈদীকে এই দুনিয়ায় কোরআনের পাখি বানিয়েছিলে, এবার তুমি তাকে দয়া করে জান্নাতের পাখি বানিয়ে নাও। আমিন, আমিন ইয়া রব।