বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘সুরক্ষা শুন্যতা’

টীকা নেওয়ার পরও দেশে হামে শিশু মৃত্যু কমছে না। প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে শিশু মৃত্যুর খবর আসছে শোকের বার্তা নিয়ে। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল শুক্রবারও ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, এ সময়ে দেশে ৯৭২ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে।

১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৭৯৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৯৯ শিশু। এই পর্যন্ত মোট মারা গেছে ৮৯৪ শিশু। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৮ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৯৪ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪০ শিশু বাড়ি ফিরেছে। ১৫ মার্চ থেকে দেশে ১৭ হাজার ৭৩০ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এদিকে সরকার এরই মধ্যে টিকাদানের বয়স সীমা কমিয়ে ৬ মাস করা বা বিশেষ ক্যাম্পেইনের মতো উদ্যোগ নিয়েছে। তবু সাধারণ মানুষের মনে একটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, টিকা দেওয়া সত্ত্বেও শিশুরা কেন হামে আক্রান্ত হচ্ছে ? গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তনের কারণে টিকা অকার্যকর হচ্ছে না; বরং আসল সংকট লুকিয়ে রয়েছে শিশুর শরীরের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা সুরক্ষার শূন্যতা, চরম অপুষ্টি, চিকিৎসায় বিলম্ব, করোনা কালের ধাক্কা এবং সবচেয়ে ভয়াবহÑঅ্যাডিনো ভাইরাসের দ্বৈত সংক্রমণের মধ্যে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা দেওয়ার পরও রোগে আক্রান্ত হওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ব্রেকথ্রু ইনফেকশন’ বা টিকা ব্যর্থতা বলা হয়। প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পর প্রায় ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। তবে মূল বৈজ্ঞানিক সংকটটি লুকিয়ে আছে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা সুরক্ষার শূন্যতায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার খসরু পারভেজ মনে করেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা ও মৃত্যুর হার বাড়ার পেছনে বড় কারণ ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া’ বা রোগপ্রতিরোধ স্মৃতির অবলুপ্তি। হামের ভাইরাস শিশুর প্রতিরোধব্যবস্থার স্মৃতিকোষের (মেমোরি সেল) প্রায় ৭৩ শতাংশ ধ্বংস করে দেয়। ফলে শিশুটি হাম থেকে সাময়িক সুস্থ হলেও তার ইমিউন সিস্টেম এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে পরবর্তী কয়েক মাস যেকোনো সাধারণ সংক্রমণেও শিশুটির প্রাণহানি ঘটতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশুদের অপুষ্টি। অপুষ্ট শিশুদের শরীরে টিকা দিলেও পর্যাপ্ত প্রতিরোধ সাড়া তৈরি হয় না। এ ছাড়া হাম শরীরের সঞ্চিত ভিটামিন ‘এ’ দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়। এতে কেবল দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিই তৈরি হয় না, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়। লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও হাসপাতালে না এনে বাড়িতে চিকিৎসায় দেরি করাও অকালমৃত্যুর বড় কারণ।

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিকটি হলো অ্যাডিনো ভাইরাসের দ্বৈত সংক্রমণ (কো-ইনফেকশন)। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সংকটাপন্ন হাম রোগীদের একটি বড় অংশে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। হামের কারণে যখন শিশুর প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সেই সুযোগে অ্যাডিনো ভাইরাস ফুসফুসে ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। সাধারণ অবস্থায় অ্যাডিনো ভাইরাস মৃদু সর্দি-জ্বর তৈরি করলেও হামের সঙ্গে যৌথ আক্রমণে তা ফুসফুসের অক্সিজেন শোষণের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এক্স-রে রিপোর্টে ফুসফুস তখন তুষারশুভ্র বা ‘হোয়াইট লাংক’ রূপ ধারণ করে এবং দ্রুত শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়ে যায়।

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ছয় বা সাত মাস বয়সে প্রথম ডোজ টিকা কতটুকু কার্যকর হচ্ছে এবং অপুষ্ট শিশুদের বাড়তি কোনো বুস্টার ডোজ লাগবে কি না, সে বিষয়ে নিজস্ব ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। তবে তিনি নিশ্চিত করেন, হাম সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। কেবল ভাইরাসের ওপর দায় না চাপিয়ে অনাক্রম্যতার শূন্যতা পূরণ, অপুষ্টি দূরীকরণ, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাই রোধ করতে পারে শিশুদের অকাল মৃত্যু।