গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৭ জন। এই বছরে একদিনে হামে আক্রান্ত হয়ে এটি সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর সংখ্যা। এ নিয়ে গত ১৫ই মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হাম ও সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যা তিনশো ছাড়াল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা গতকাল পর্যন্ত ৩১১ জন।

গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিবৃতিতে জানানো হয়, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় আরও নিশ্চিত হামে দুইজন আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৫ জন। তবে এই তথ্যের মধ্যে আগেরদিন মারা যাওয়া দুজনের নাম রয়েছে, যাদের হাম উপসর্গে মৃত্যু হলেও সেদিন তথ্য পাওয়া যায়নি। বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১৫ই মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৫২ জন এবং সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যা ২৫৯ জন। এ পর্যন্ত সারাদেশে নিশ্চিত হাম আক্রান্ত সংখ্যা ৫,৪৬৭ এবং সন্দেহজনক হাম আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ হাজার ৪৮২ জন।

হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্যে টিকা সংকট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এবং তার আগের সরকারকে দোষারোপ করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, পূর্ববর্তী সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অবহেলার কারণে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা আনেনি, যার ফলে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম-রুবেলা টিকার ক্যাম্পেইন উদ্বোধনকালে তিনি আরও বলেন, কিছু মানুষের গাফিলতির কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যার প্রভাব শিশুস্বাস্থ্যে পড়েছে।

নতুন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনও একইভাবে আগের সরকারকে দায়ী করে বলেছেন, টিকা কেনা ও সংগ্রহে পূর্ববর্তী সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে টিকার মজুতে সংকট দেখা দিয়েছে। এতে হামের টিকাসহ আরও ছয় ধরনের টিকার অভাব দেখা দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, হামের এই প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে হাম নির্মূলে আগের অর্জিত সাফল্যকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর জানান, টিকার অভাবের পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ কর্মসূচি তিন দফা বাদ পড়ায় শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা আরো কমে গেছে। আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসাইন বলেন, ‘টিকাদান ঘাটতির বাইরেও বাংলাদেশের হামসংকট গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।

আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্সের প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে অল্প সময়ের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি আক্রান্ত হয়েছে এবং ২৫০ জনের বেশি মারা গেছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুর দিকে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে অসংখ্য শিশুকে চিকিৎসা দিতে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের অনেকে শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। বেড সংকট থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাম একসময় প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে বলে মনে করা হলেও এটি আবার ফিরে আসছে। কানাডা ও বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ এখন আর ‘হামমুক্ত’ নেই। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এ বছর এক হাজার ৭০০ জনের বেশি হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০ বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাতেও হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে টিকা কেনার ক্ষেত্রে অচলাবস্থা তৈরি হয়। সেখান থেকেই হাম মহামারির সূত্রপাত বলে উল্লেখ করেছে সায়েন্স জার্নাল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় দেশজুড়ে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং টিকাদানের হার কমে যায়। অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেড়েছে।

বাংলাদেশে ৯ ও ১৫ মাস বয়সের শিশুদের হাম-রুবেলা টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। সারা দেশের ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে প্রতি চার বছর পর পর দেশব্যাপী এই কর্মসূচি চালানো হয়। ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করত, যার অর্থায়ন আসত মূলত বিশ্বজুড়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতে পরিচালিত টিকার জোট ‘গ্যাভি’ ও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু টিকা সরবরাহ পদ্ধতিতে একটি ‘বিতর্কিত’ পরিবর্তন এনেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দিয়ে ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ পদ্ধতি চালু করে। ইউনিসেফ এই পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিল। সংস্থাটি বলেছিল, এই পদ্ধতি টিকাদানব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে এবং মহামারির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর জানায়, গাজীপুরে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের মৃত্যু হয়।

মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে রয়েছে গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার জাকির হোসেনের ৯ মাস বয়সী ছেলে রাইয়ান এবং শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকার খোকন মিয়ার ৫ মাস বয়সী ছেলে সিফাত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, কয়েকদিন আগে হামের উপসর্গ নিয়ে তাদের ভর্তি করা হয়েছিল এবং চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তাদের মৃত্যু ঘটে।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৫৬০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫১১ জন। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ জনে, যা সর্বশেষ এই দুই শিশুর মৃত্যু।

তিনি আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন, যার মধ্যে ১৭ জনই শিশু এবং ৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক। একই সময়ে ১৬ জন রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে মোট ৪৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে, তাই শিশুদের সময়মতো টিকার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। তারা দ্রুত কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে করে আর কোনো প্রাণহানি না ঘটে।