শহীদ মো. সালাউদ্দিন সুমনের স্ত্রী ফাতেমা আক্তার তমা বলেছেন, জুলাই তার এবং তার সন্তানের কাছে শোকের মাস। কারণ এই জুলাইতে তিনি তার স্বামীকে হারিয়েছেন। একটি মেয়ের জন্য বাবার পর স্বামী হচ্ছে সবচেয়ে বড় বটের ছায়া। বেঁচে থাকার অবলম্বন। ওনি যখন আজ বেঁচে নাই; তখন এটা আমার কাছে শোকের মাস। জুলাই মাস এলে আমি সুস্থ থাকি না। আমার কাছে মনে হয় ১২ মাস থেকে একটা মাস মাইনাস করা যায় না ? জুলাই মাসটাকে আমি মানতে পারি না। শোকাতুর কণ্ঠে দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে শহীদ সালাউদ্দিনের স্ত্রী জানান, ১৯ জুলাই ২০২৪ ইং সালাউদ্দিন শহীদ হয়েছেন। সেদিন শুক্রবার ছিল। এই শুক্রবারকে তিনি মানতে পারেন না। সবাই বাসায় থাকে। ভাল মন্দ রান্না-বান্না হয়। সবাই মিলে খায়। এই দিনটাকে বলা হয় হজে¦র দিন। আর আমি সারাদিন সালাউদ্দিনের জন্য শোক করি। নামাযে বসে তার জন্য দোয়া করি। সবাই যখন নামায পড়ে বাসায় ফিরে তখন আমার ছোট সন্তান ছোট ঘরটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে; যেখানে তার বাবা চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে। জুলাইয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বিসর্জন দিয়েছি দেশের জন্য। খুনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে তাড়ানোর জন্য। দেশটাকে স্বাধীন করার জন্য। তারেক রহমানকে দেশে আনার জন্য। একটা সবুজ বাংলাদেশ গড়ার জন্য। এখন আমি মনে করি দেশটা আমার। এখন দেশে বাস করছি স্বাধীনভাবে। তার অংশীদার আমিও। এরপরও জুলাই আমার বড় শোকের মাস। জুলাই আমাকে যেমন কিছু ভাল দিয়েছে। তেমনি জুলাই আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়েও নিয়েছে।

জুলাইয়ের প্রত্যাশা-প্রাপ্তি নিয়ে ফাতেমা আক্তার তমা বলেন, আমার স্বামী বিএনপি করতেন। তিনি এক নম্বর ওয়ার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এখন আমাদের দল, আমাদের সরকার ক্ষমতায়। তারেক রহমান সুন্দর বাংলাদেশ গড়বেন এটাই প্রত্যাশা। স্বৈরাচার আমাদের সবকিছু শেষ করে দিয়ে গেছে। তাকে সময় দিতে হবে। নতুন করে দেশ গড়ার জন্য, তারেক রহমানকে সময় দিতে হবে। আগামী জুলাইয়ে একটা সাজানো গোছানো বাংলাদেশ পাবো বলেই প্রত্যাশা করি। আমাদের প্রত্যাশা তারেক রহমান সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাবেন। কোন অহংকার দাম্ভিকতা থাকবে না। আমরা সাধারণ মানুষ যেমন; আমাদের প্রধানমন্ত্রীও তেমন হবেন। আমরা চাই শহীদদের প্রতি যেন প্রধানমন্ত্রীর সব সময় খেয়াল থাকে। সব শহীদদের যেন তিনি মর্যাদা দেন।

শহীদ সালাউদ্দিনের স্ত্রী উল্লেখ করেন, ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী আমাদের নিয়ে চীন-মৈত্রীতে অনুষ্ঠান করেছেন। তিনি জুলাইযোদ্ধাদের নিয়ে অনেক আশা প্রত্যাশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি আমাদের বলেছেন, আপনাদের সব হবে। আপনারা সব পাবেন। কারণ আপনাদের বিনিময়েই এই দেশটা। আপনাদের ছেড়ে আমরা কোন কিছু আশা করি না। আমি প্রত্যাশা করি, আগামী এক বছরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুন্দর একটা দেশ উপহার দিবেন। আমরা জানি সেটা হবে এবং আমরা সেটা চাই।

জুলাইয়ের শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শহীদ সালাউদ্দিনের স্ত্রী আরও বলেন, জুলাইয়ের সংগ্রাম কিন্তু শুধু ছাত্রদের না। সবশ্রেণি পেশার মানুষ আন্দোলনে শরিক হয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন। দলমত নির্বিশেষে রিকশাওয়ালা ভ্যানওয়ালা, এমনকি ছোট ছোট বাচ্চারা; যারা আন্দোলন বুঝে না, মারামারি বুঝে না। তারাও নেমে গেছে। কারণ দেশটাকে স্বাধীন করতে হবে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কাছ থেকে দেশটাকে বাঁচাতে হবে। একটা ভাল কিছু করতে গেলে আসলে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে সকলের সহযোগিতা। আমরা সবাই একজোট হয়ে যদি প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করি; ওনার দেওয়া পরামর্শ মোতাবেক চলি, তহেলে দেশ সুন্দর হবে। তার প্রমাণ জুলাই। জুলাই প্রমাণ করে দিয়েছে যে আমরা দেশটাকে কত ভালবাসি।

আমার স্বামী জানতেন যে, ওই জায়গাটায় গেলে গুলি লাগলে আমার মৃত্যুটা নিশ্চিত। আন্দোলনে যাওয়ার সময় একবারও চিন্তা করেনি যে, তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী-সন্তানের কি হবে। তিনি তো জানতেন না তার মৃত্যুর পর সরকার আমাদের এতোগুলো টাকা দিবে ? ভাতা দিবে ? ওনি এগুলো চিন্তা করে আন্দোলনে যাননি। তিনি দেশটাকে স্বাধীন করতে সবার সাথে আন্দোলন করেছেন। শুক্রবার তিনি শহীদ হয়েছেন। অথচ পরের দিন আমাদের পরিবারের তিনজনের আন্দোলনে নামার কথা ছিল। তাহলে শক্তি দ্বিগণ হবে। সবাই মিলে আন্দোলনের কারণে ২৪ সালে জুলাই এসেছে তা একটা বড় প্রমাণ।

নিজের অবস্থান জানান দিয়ে জুলাই যোদ্ধার স্ত্রী বলেন, অনেকেই মনে করেন আমরা অনেকগুলো টাকা পেয়েছি। ভাল আছি। কিন্তু এটাকে ভাল বলে না। এটাকে বলে বেঁচে থাকা। আমরা ভাল নাই। আমরা বেঁচে আছি। জুলাই বার বার আসুক তা আমরা আর কখনো চাই না। এই জুলাইকে দেখে মানুষ শিক্ষা নিক। সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে নতুন কিছু, সন্দুর কিছু করা সম্ভব। আমরা আরেকটা জুলাই চাই না। সবাই চাইলে সুন্দর বাংলাদেশ গড়া কোন ব্যাপার না। আমরা পারবো।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে খিলগাঁওয়ের দক্ষিণ বনশ্রী ২ নম্বর জামে মসজিদের (কাজিবাড়ী রোড) সামনে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমর্থনে মিছিল চলাকালে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের এলোপাতাড়ি গুলীবর্ষণে সালাউদ্দিন সুমন গুলীবিদ্ধ হন এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান।