- তিনি (তারেক রহমান) এমন একটি গর্ত খুঁড়েছেন, যেখান থেকে তার নিজের বেরিয়ে আসা মুশকিল হবে : কানওয়াল সিবাল
- সফর বাতিলে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের চ্যানেল দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে : ন-বিদ্যাভূষণ সোনি
- ভারত নাকি হাসিনাকে এখনও ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবেই বিবেচনা করে এবং তিনি পালিয়ে যান নি : রীভা গাঙ্গুলী দাস
- গত ছয় মাসে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নেয় নি ঢাকা : বীণা সিক্রি
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দণ্ডিত ফ্যাসিস্ট ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও দিল্লীর মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এর মাঝেই ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল, সাবেক রাষ্ট্রদূত বিদ্যাভূষণ সোনি, সাবেক রাষ্ট্রদূত বীণা সিক্রি, সাবেক রাষ্ট্রদূত রীভা গাঙ্গুলী দাসের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। ভারতীয় কূটনীতিকদের নজিরবিহীন প্রোভোকেটিভ স্টেটমেন্ট বা আক্রমণাত্মক বক্তব্য বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ভারতের সাবেক শীর্ষ আমলারা যেভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন এবং ‘গর্ত খুঁড়ছেন’ কিংবা ‘বাজে আচরণ’ (পেটুলেন্স) এবং প্রোভোকেটিভ স্টেটমেন্ট-এর মতো শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার-এর চরম লঙ্ঘন হিসেবে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেয়া পৃথক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত বীণা সিক্রি। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেন, ক্ষমতায় আসার পর গত ছয় মাসে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে নাকি ঢাকার পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনের আগে ভারত সফর বা অন্যান্য বিষয়ে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে যেসব কূটনৈতিক আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তুলনা করে ব্যক্তিগত আক্রমণমূলক মন্তব্য করেন এই সাবেক কূটনীতিক।
অপর সাবেক হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাস আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দণ্ডিত, গণহত্যাকারী ও ভারতে পলাতক সাবেক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তভাবে সমর্থন জানান। তিনি দাবি করেন, ভারত নাকি হাসিনাকে এখনও ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবেই বিবেচনা করে এবং তিনি পালিয়ে যান নি, বরং বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তাকে নিরাপত্তা দিয়ে দিল্লীতে রেখে এসেছে। একই সঙ্গে তারেক রহমানের বিগত বছরের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কটূক্তি করে বর্তমান সরকারের বৈধতা ও অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেন তিনি।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবেক এই দুই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের মন্তব্যকে কেবল তাদের ব্যক্তিগত মতামত বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভারতের সাউথ ব্লক (পররাষ্ট্র দপ্তর), গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং সাউথ এশিয়ান পলিসি থিংকট্যাংকগুলোতে সাবেক কূটনীতিকদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের একটি প্রভাবশালীগোষ্ঠী এখনো বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না।
ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক সচিব ও শীর্ষ কূটনীতিক কানওয়াল সিবাল সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এবং গণমাধ্যম বিশ্লেষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের তীব্র ও আক্রমণাত্মক সমালোচনা করেন। ফ্যাসিস্ট ও গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সাথে শীর্ষ সফরকে শর্তযুক্ত করার সিদ্ধান্তকে তিনি ‘কূটনৈতিক অপরিণামদর্শিতা’ হিসেবে অভিহিত করেন।
কানওয়াল সিবাল তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বলেন, “তিনি (তারেক রহমান) এমন একটি গর্ত খুঁড়েছেন, যেখান থেকে তার নিজের বেরিয়ে আসা মুশকিল হবে। ভারত সফরের সাথে হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি যুক্ত করাটা হার্ডবল খেলা বা কূটনীতি নয়, এটি এক ধরনের জেদ বা বাজে আচরণ। কূটনীতির একটি দরজা সব সময় খোলা রাখা উচিত ছিল। পাকিস্তানের ইমরান খান অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের পর যে ভুল করেছিলেন, তারেক রহমানও একই ভুল করছেন।” পারমাণবিক অস্ত্রধারী ও বিশাল অর্থনীতির প্রতিবেশীর সাথে ঢাকার এমন শক্ত অবস্থানকে ভারতের সাবেক এই আমলা ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ভারসাম্যহীন’ বলে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন।
কানওয়াল সিবালের কঠোর সুরের বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ভারতের সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বিদ্যাভূষণ সোনি। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রশংসা করার পাশাপাশি সফর বাতিলের সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেন। সোনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত বাস্তববাদী ও খোলামেলা মানসিকতার ব্যক্তিত্ব। তিনি ভারতবিরোধী নন এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে এমন কোনো মন্তব্য করেননি যা সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে যায়। বিদ্যাভূষণ সোনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি এই সফর হাতছাড়া করেন, তবে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের চ্যানেল দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি এবং রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের ওপর ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগাতে হলে দিল্লীর সাথে সংলাপের টেবিল বজায় রাখাকেই তিনি ঢাকার জন্য সঠিক কৌশল বলে মনে করেন।
দিল্লীর সাউথ ব্লকের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ ও গবেষকদের মত কার্নেগি এশিয়ার গবেষক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অবিনাশ পালিওয়ালসহ ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক পণ্ডিতরা মনে করছেন, মোদি সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া দ্বিতীয় আমন্ত্রণটি প্রত্যাখ্যান বা সফর পিছিয়ে দেয়া ঢাকার জন্য এক ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত বর্তমান ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার মিষ্টি আশ্বাস দিচ্ছেন; অন্যদিকে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে বীণা সিক্রি ও রীভা গাঙ্গুলী দাসের মতো অভিজ্ঞ মুখগুলোকে দিয়ে ঢাকার শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আপত্তিকর বক্তব্য দেয়ানো হচ্ছে; যা ভারতের দ্বিমুখী কূটনৈতিক কৌশলেরই ইঙ্গিত দেয়।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলামের অভিমত, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল যেভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেছেন, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় স্পষ্টতই ‘আন-ডিপ্লোম্যাটিক রিমার্কস’ (অকূটনৈতিক মন্তব্য) এবং ‘ইনফ্ল্যামেটরি রেটোরিক’ (উসকানিমূলক বক্তব্য)। একজন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি এমন ভাষা প্রয়োগ দুই দেশের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকে কেবল আরও বাড়িয়ে তুলবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর স্থগিতের সংকেত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দণ্ডিত ফ্যাসিস্ট ও গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও দিল্লীর কূটনৈতিক অঙ্গনে নজিরবিহীন উত্তাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সফরকে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ আসামীদের হস্তান্তরের শর্তের সঙ্গে যুক্ত করার পর সাউথ ব্লক (ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) এবং কূটনীতিক মহলে নানামুখী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এখন ভারতকেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের নীতি-নির্ধারণী মহলে প্রধানত তিনটি উদ্বেগ কাজ করছে। ১. চীনা ও আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা করছে নয়াদিল্লী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া এবং ভারতের সফর পেছানোর সিদ্ধান্তকে দিল্লী নিজের আঞ্চলিক প্রভাবে এক ধরনের চাপ হিসেবে দেখছে। ২. ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ফেরত দিতে চুক্তির আইনি ফাঁদ তৈরি করেছে দিল্লী। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি সরাসরি ভারতের বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হলে তা ভারতীয় রাজনীতিতেও অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। ৩. দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। সীমান্ত নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাণিজ্যের মতো ইস্যুগুলো থমকে যাওয়ার আশঙ্কা করছে ভারতীয় ব্যবসায়ী মহল।
সিনিয়র কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাকিব আলী বলেন, ভারতের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশটি সরকারিভাবে ঢাকার সাথে সংলাপে বসার দরজা খোলা রাখতে চাইছে এবং বিষয়টিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সাবেক শীর্ষ আমলাদের তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এটিই প্রমাণ করে যে, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অধীনে ঢাকা যেভাবে নিজস্ব বিচারিক দাবি ও জাতীয় মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তা ভারতীয় কূটনৈতিক মহলকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। এখন দেখার বিষয়, ভারতের আদালত ও সরকার বাংলাদেশের যুক্তিসংগত দাবিগুলোর প্রতি কতটা ইতিবাচক সাড়া দিয়ে শীর্ষ বৈঠকের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, ভারত সরকারকে বুঝতে হবে, বিগত আমলের মতো একপক্ষীয় আধিপত্যের কূটনীতি এখন আর বাংলাদেশে কার্যকর হবে না। হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যে সংবর্ধনা ও আলোচনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তাকে ফলপ্রসূ করতে হলে ভারতকেই আগে তাদের ভূরাজনৈতিক ও আইনি অবস্থান পরিষ্কার করে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এখন দেখার বিষয়, নয়াদিল্লী তাদের দণ্ডিত রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে বিচারিক চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করে এবং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সম্মান জানিয়ে শীর্ষ বৈঠকের কোনো দৃশ্যমান অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে কি না।