রাজধানীতে প্রথমবারের মতো দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স’ শুরু হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, পর্তুগালসহ ১০ দেশের প্রায় ৫৫০ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ অংশ নিয়েছেন। এতে অংশ নেয় মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা বলেছেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মধ্যেই দেশের ভবিষ্যৎ নিহিত । তথ্যনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক সাংবাদিকতা চর্চা শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং একে এগিয়ে নিতে হলে শক্তিশালী সম্পাদকীয় কাঠামো তৈরি করা এবং সব ধরনের আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিহত করা একান্ত প্রয়োজন।

গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে রাজধানীর রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে এ সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়। মিডিয়া রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) ২৫ বছরপূর্তি উপলক্ষে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। সম্মেলনে ১২ সেশনে দেশি-বিদেশি ২০ জন বিশেষজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাসহ গণমাধ্যমের সমস্যা ও তা উত্তরণ এবং জবাবদিহি বিষয়ে আলোচনা করবেন।

উদ্বোধন পর্বে বক্তব্য দেন ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলস উইক, জিআইজেনের নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া ডিয়াজ স্ট্রাক ও মিডিয়া রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান।

বক্তারা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় গণমাধ্যমের ভূমিকা, জবাবদিহি, সুশাসন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ঝুঁকি এবং নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন। সম্মেলনে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে পেশাগত উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, ‘উদ্বোধনপর্বের পর বিভিন্ন সেশন অনুষ্ঠিত হবে। সেশনগুলোতে গণমাধ্যমের জবাবদিহি, অভিযোগ নিষ্পত্তি, স্বাধীন গণমাধ্যমের পরিবেশ, ডিজিটাল সংবাদকক্ষ রূপান্তর, তথ্যের ব্যবহার, লিঙ্গসমতা, অন্তর্ভুক্তি, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও নাগরিক সমাজের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা হবে। এছাড়া, সম্মেলনে ৬১ জন সাংবাদিক ফেলোশিপ অর্জন করেছেন। তারা তাদের সংবাদের ধারণাগুলোও সম্মেলনে তুলে ধরবেন বলেও জানান তিনি। এদিকে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য অধিকার, তথ্য যাচাই এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তায় সম্মেলনস্থলে চারটি সহায়তা ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। শনিবার এ সম্মেলন শেষ হবে।

তথ্যনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক সাংবাদিকতা চর্চা শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ- এমআরডিআই-এর রজতজয়ন্তীতে দু’দিনের বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স এর শুরুর দিন বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মধ্যেই দেশের ভবিষ্যৎ নিহিত

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে যেভাবে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ হলেও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের যথাযথ ভূমিকা দেখা যায়নি উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সেসময় হঠাৎ করেই যে হামলা হয়েছিল, তা কিন্তু নয়। অনেকটা ঘোষণা দিয়েই আক্রমণ করা হয়। মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল, এমনকি সেনাসদস্যরাও ছিলেন; তারা কার্যকর পদক্ষেপ নেননি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এসব ঘটনা আমাদের নেতিবাচক বার্তা দেয়।

কিছু গণমাধ্যমও হামলার ঘটনা উপভোগ করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এসব হামলার পর পরিচিত আইনজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট, এমনকি কিছু গণমাধ্যমের ব্যক্তিও তখন রিজয়েস (উপভোগ বা উৎফুল্ল) করেছে। সেজন্য আজকের এ সম্মেলনে আমাদের গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ক্ষেত্রের সমস্যাগুলো নিয়েও আলাপ-আলোচনা করতে হবে।

টিআইবির নির্বাহী প্রধান বলেন, সারা বিশ্বে এক দশকে পাঁচ শতাধিক সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলায় ৬০ জন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে ৩০ জন, পাকিস্তানে ৫০ জনের মতো, বাংলাদেশ ২৬ জন গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। সাংবাদিকদের এ ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়েও আমাদের কাজ করতে হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তথ্য উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন।

লেখক ইউভাল নোয়া হারারিকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, সত্য অনুসন্ধান করা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ, কিন্তু আধুনিক নিউজরুমগুলো প্রায়ই সত্য খবরের চেয়ে দ্রুততাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক তথ্যে ডুবিয়ে দেওয়াকে তিনি সেন্সরশিপের একটি আধুনিক কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেন।

তিনি বলেন, সেন্সরশিপের সূত্র বদলে গেছে। তারা এখন আর আপনাকে হুমকি দেয় না, অপহরণ করে না। পরিবর্তে, তারা নিশ্চিত করে যে যখন আপনার অনুসন্ধানটি প্রকাশিত হবে, তখন তথ্য এবং অপতথ্যের বন্যায় সেটি যেন চাপা পড়ে যায় এবং গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।

গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থার সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করে তৌহিদুল আরও বলেন, কতটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা নয়, বরং কতটি সংবাদ আটকে দেওয়া হয়েছে, তা গণনা করুন।

পাকিস্তানের দৈনিক ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস জোর দিয়ে বলেন, একটি সংবাদপত্রের টিকে থাকা সম্পূর্ণভাবে এর সম্পাদকীয় টিমের স্বায়ত্তশাসন এবং সততার ওপর নির্ভর করে।‘এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং প্রকাশকদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরও যোগ করেন, ভালো সাংবাদিকতা করার জন্য আপনি যদি আপনার সম্পাদক ও তার সহকর্মীদের বিশ্বাস করতে না পারেন, তবে একটি মিডিয়া হাউস কখনোই সফল হতে পারবে না।

বেসরকারি বা রাষ্ট্রীয় খাতের দুর্নীতি উন্মোচনকে ‘এক ধরনের জনসেবা’Ñ আখ্যা দিয়ে আব্বাস সতর্ক করেন, সরাসরি সেন্সরশিপের চেয়ে সেলফ-সেন্সরশিপ প্রায়শই বেশি ক্ষতিকর; কারণ গণমাধ্যমগুলো জনসমক্ষে এটি স্বীকার করতে পারে না।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পূর্বশর্ত একটি শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান । তিনি বলেন, একজন সম্পাদকের কখনোই মালিকের পিআরও (জনসংযোগ কর্মকর্তা) হওয়া উচিত নয়। মালিকদের একটি ভূমিকা থাকলেও, মালিক ও সম্পাদকের ভূমিকার মধ্যে অবশ্যই একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে। দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা প্রায়ই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে থাকেন এবং প্রধান বিজ্ঞাপনগুলো তাদের মাধ্যমেই আসে। তিনি বলেন, ‘সেই চাপ যিনি সামলাবেন, তিনি হলেন সম্পাদক।’

তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণে ফলে দেশে শক্তিশালী সম্পাদকীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।’সংবাদমাধ্যম খাতে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা আনতে সম্পাদক পরিষদ সম্পাদক ও মালিকপক্ষের জন্য দুটি আলাদা আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট) তৈরি করছে বলে তিনি জানান।

টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক উল্লেখ করেন যে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই একমাত্র উপাদান, যা একটি সংবাদ সংস্থাকে অন্যটি থেকে আলাদা করে।

সাংবাদিকদের হয়রানি থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থাপক ও মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের রক্ষক প্রয়োজন, আর আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক এবং সম্পাদকরা সেই লড়াইয়ের সম্মুখসারিতে বীরত্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।’

যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ বলেন, আমরা বিজ্ঞাপন-নির্ভর গণমাধ্যম এবং এটি এক ধরনের দুর্বলতা। আমাদের আলাদা কোনো তহবিল নেই... এবং সামান্য বিজ্ঞাপনের আয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি সংবাদমাধ্যমের পক্ষে পুরো এক বছর একটিমাত্র অনুসন্ধানের পেছনে বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব।